বেশ কিছু দিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। এর মূল কারণ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকার গঠনের একমাত্র উপায় হলো নির্বাচনে জয়লাভ করা। এই প্রক্রিয়া মেনেই প্রতিটি রাজনৈতিক দল প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনে জেতার জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে থাকে। তবে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন কারণ দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন ইস্যুতে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে বিধায় দেশে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার কৃতিত্ব রয়েছে তাদের। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নয়নের অগ্রভাগে নিয়ে গেছেন এবং দেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অতএব, ক্ষমতাসীন দল বর্তমান সাংবিধানিক বিধানের আওতায় একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছে, কারণ ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত দুটি নির্বাচন একই সাংবিধানিক বিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাই তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে চায় না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গত পনের বছর ক্ষমতা থেকে দূরে থাকায় সাংগঠনিকভাবে তুলনামূলক বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই তারা ক্ষমতাসীন দলকে বিশ্বাস করে না এবং বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে অনেক দিন ধরে।
কয়েক বছর ধরে তাদের দাবির পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে, যদিও সফলভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করতে পারেনি, যা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আমরা যদি বর্তমান সাংবিধানিক বিধানের দিকে মনোযোগ দেই, তাহলে পরবর্তী সংসদ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কোনও সুযোগ নেই। এই বিধানকে পুঁজি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে আসছে ক্ষমতাসীন দল।
সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি কয়েক বছর ধরে তাদের দাবির পক্ষে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক কিছু 'অভিনেতা' সোচ্চার রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক দেশ স্পষ্ট করেছে যে তারা বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন চায়।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির সঙ্গে কোনও দেশ একাত্মতা প্রকাশ করেনি। তবে, কয়েকটি শক্তিশালী দেশের কয়েকজন কূটনীতিক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ডোমেনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করছেন। তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে অনেকেই তাদের বিরোধী দলের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ ধরনের সক্রিয় ভূমিকা কূটনৈতিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল।
তাই কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন ডেটলাইনকে কেন্দ্র করে। সর্বশেষ ডেটলাইনটি ছিল ২৮ অক্টোবর, কারণ এই দিনে বিএনপি নয়া পল্টন কার্যালয়ের সামনে "মহাসমাবেশ" আয়োজন করার ঘোষণা দিয়েছিল। একই দিনে, জামায়াতে ইসলামী, যারা আদালতের আদেশে নিবন্ধন হারিয়েছে, তারাও ঢাকা মেট্রোপলিটিন পুলিশের অনুমতি ছাড়াই শালপা চত্বরে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। বিরোধী নেতারা তাদের অনুসারীদেরসহ দেশবাসীকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে তারা ২৮ তারিখ থেকে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলও ঢাকায় তাদের রাজনৈতিক সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিল রাজপথ দখলে রাখার জন্য। ফলে, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটতে পারে মর্মে দেশবাসীর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
অনেকের ধারণা সত্য হয়েছে, কারণ এই দিনে বিরোধী সমর্থকরা ঢাকার রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর করেছে, বিভিন্ন কাঠামোতে আগুন দিয়েছে এবং রাস্তায় একজন পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার শর্তে পুলিশ উভয় পক্ষকে তাদের রাজনৈতিক সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছিল। তবে শনিবার (২৮ অক্টোবর) সমাবেশ শুরুর আগেই বিরোধীরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। হঠাৎ হামলা শুরু করে বিএনপি কর্মীরা। বেলা ১টার দিকে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা চালায় তারা। সেখান থেকে ধীরে ধীরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর কাকরাইল, পল্টন, শান্তিনগর, আরামবাগ হয়ে বিভিন্ন এলাকায়।
প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে বিএনপি নেতাকর্মীরা গাছের ডাল ভেঙে প্রধান বিচারপতির নামফলক ও গেটে লাঠি দিয়ে হামলা চালায়। তারা ভেতরে ইট ছুড়তে থাকে। এ সময় কাকরাইল ট্রাফিক পুলিশ বক্সে আগুন দেয় বিএনপি সমর্থকরা। পুলিশ বাধা দিতে গেলে তাদের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এরপর পুলিশ বল প্রয়োগ করে বিএনপি অনুসারীদের সরিয়ে দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্ব তাদের মহাসমাবেশ স্থগিত করতে বাধ্য হয়। পরে রবিবার (২৯-১০-২০২৩) দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করে বিএনপি নেতৃত্ব। বাংলাদেশের মানুষ কয়েক বছর হরতালের মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি। আবার ২৯ তারিখ তারা নতুন কর্মসূচি হিসেবে ৩১ অক্টোবর, ১ ও ২ নভেম্বর অবরোধ ঘোষণা করে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে একটানা হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। তারপর থেকে, হরতাল সরকারকে চাপ দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে তার সম্ভাবনা হারিয়েছে (বাংলা ট্রিবিউন, ২৮-১০-২০২৩)। ফলে, দেশের জনগণ আবারও হরতালের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির মুখোমুখি হবে, যা কারও জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।
এখন একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ থেকে বিএনপির অর্জন কী? আমার মতে বিএনপি আবার জনগণের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কারণ, গাড়ি ভাংচুর, হত্যা ও আগুন দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় তাদের কর্মকাণ্ড দেশবাসী ইতোমধ্যে জেনে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রধান বিচারপতির বাড়িতে হামলা কেউ সমর্থন করতে পারে না। এমনকি, তারা যেভাবে একজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে তাও মানা যায় না। বিএনপির এ ধরনের কর্মকাণ্ড দলের আন্তর্জাতিক মিত্রদেরও, যারা তাদের সমর্থন করে বলে মনে হচ্ছে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলবে। এ ধরনের ঘটনার পর বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে যে আন্তর্জাতিক অভিনেতারা কথা বলছেন তাদের অবস্থান কী হবে? এ ধরনের ঘটনা শুধু সংলাপের ক্ষেত্রেই বাধা সৃষ্টি করবে না, দেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি করবে।
২৮ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে বিএনপি যে রাজনৈতিক হাইপ তৈরি করেছিল এবং সরকার উৎখাত করার যে প্রতিশ্রুতি জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল তা একটি বড় শূন্যে পরিণত হয়েছে। আগের ডেটলাইনগুলোর মতো এবারও তারা ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন তারা দেখছে তা অন্তঃসারশূন্য অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।




