আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি এখন দ্রুত বদলে যাওয়া সমীকরণের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তাতে অনেকেই ভেবেছিলেন– এই নির্বাচন হবে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার মঞ্চ– বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কিন্তু বাস্তবতা সেই ধারণাকে খুব দ্রুত ভেঙে দিয়েছে। নানান নাটকীয়তার পর এনসিপির জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়া শুধু নির্বাচনি অঙ্কই পাল্টায়নি, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে স্পষ্ট। এনসিপি যুক্ত হওয়ার পর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াতের জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে এনসিপির ভেতরেও বড় ধরনের ভাঙন দেখা গেছে। শীর্ষ নেতা ও সংগঠকদের দলত্যাগ, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের হতাশা ও বিভ্রান্তি এখন আর গোপন নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দলটির জনসমর্থনের ওপর।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো একটি সংগঠিত শক্তি জোটছাড়া হওয়ায় জামায়াতনির্ভর জোট ভোটের হিসাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট মানে কেবল আসন সমঝোতা নয়; জোট মানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঘোষণা। কে কার সঙ্গে দাঁড়াচ্ছে, তার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়– ক্ষমতায় গেলে কোন ধরনের বাংলাদেশ কল্পনা করা হচ্ছে। সে বিচারে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোট নিছক কৌশলগত নয়; এটি একটি স্পষ্ট আদর্শিক সিদ্ধান্ত, যার মূল্য শুধু এই নির্বাচনে নয়, আগামী এক দশকেও পরিশোধ করতে হতে পারে।
আত্মপ্রকাশের পর এনসিপি নিজেকে ‘পুরোনো বন্দোবস্তের বাইরে’ একটি নাগরিক, তরুণ ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। দুর্নীতি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, দলীয় সন্ত্রাস ও আদর্শিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অবস্থানই ছিল তাদের মূল রাজনৈতিক পুঁজি।
শহুরে শিক্ষিত তরুণ, প্রথমবারের ভোটার, পরিবর্তনকামী মধ্যবিত্ত এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশ- এই শ্রেণিগুলোই ছিল এনসিপির প্রধান সমর্থনভিত্তি। কিন্তু অতীত-ভারাক্রান্ত ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত একটি শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধার পর সেই ‘নতুন রাজনীতি’র দাবি আজ বড় ধরনের আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়েছে।
নির্বাচনি বাস্তবতায় জামায়াতের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ভোটব্যাংক রয়েছে, যা উত্তরাঞ্চল ও কিছু শহরতলিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু রাজনীতি কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি ভোটারের মনস্তত্ত্বের সমীকরণও। এনসিপিকে যারা নতুন রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখেছিল, তাদের বড় একটি অংশ এই জোটকে বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবেই দেখছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু ভোট যোগ হলেও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
এই পুনর্বিন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ছে বিএনপির ওপর। একদিকে এনসিপি-জামায়াত জোট বিএনপির জন্য কৌশলগত স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির গায়ে যে ‘জামায়াতঘেঁষা’ তকমা লেগে ছিল, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও শহুরে ভোটারদের কাছে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে, তা কিছুটা হলেও মুছে ফেলার সুযোগ এসেছে।
বিএনপি চাইলে নিজেকে তুলনামূলক মধ্যপন্থি, দায়িত্বশীল ও রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য প্রস্তুত শক্তি হিসেবে নতুন করে উপস্থাপন করতে পারে।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, আওয়ামীবিরোধী মনোভাব প্রবল হলেও বিএনপিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর সংশয় কাজ করছে। এই সংশয়ের কেন্দ্রে রয়েছে পরিচিত কয়েকটি শব্দ- চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব ও দলীয় সন্ত্রাস। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে এসব কারণে যে পাহাড়সম জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার স্মৃতি এখনও মানুষের মনে তাজা। সমস্যা হলো, অনেক ভোটার এই বাস্তবতার সঙ্গে বিএনপির অতীত শাসনামলের অস্বস্তিকর মিল খুঁজে পান।
আজকের ভোটার আর শুধু জানতে চান না কে ক্ষমতায় আসবে। তাদের মূল প্রশ্ন, ‘ক্ষমতায় এলে আবার কী শুরু হবে?’ এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে না পারলে যেকোনও ক্ষমতা প্রত্যাশী দলের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য। বিএনপির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নেই। অতীতে দলীয় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির দায় যে বিএনপির রাজনীতিতেও ছিল তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফলে আবেগী ভাষণ, অতীতের নির্যাতনের স্মৃতি বা সরকারবিরোধী ক্ষোভের কোনোটিই এককভাবে এবার ভোটারকে আশ্বস্ত করবে না।
বিএনপির সামনে এখন একমাত্র কার্যকর পথ হলো স্পষ্ট, দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমান যদি সত্যিই বিএনপিকে নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ে নিতে চান, তবে তাঁকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দিতে হবে– চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দলীয় সন্ত্রাস বিএনপির রাজনীতিতে আর কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এই ঘোষণা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রকাশ্য সাংগঠনিক শাস্তি ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তা প্রমাণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি বিএনপি প্রার্থীকে জনসম্মুখে অঙ্গীকার করতে হবে– নির্বাচিত হলে তাঁর এলাকা হবে চাঁদামুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাঠামো স্পষ্ট না হলে জনসংশয় ভাঙবে না।
সবশেষে বলা যায়, এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে হয়তো কিছু ভোট পাবে, কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় মূল্য দিতে হবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো একটি সংগঠনকে হারিয়ে জামায়াতের যে কী ক্ষতি হলো তা সময়ই বলে দেবে। আর বিএনপি যদি এই মুহূর্তে নিজেকে সত্যিকারের সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়, তবে এনসিপির দুর্বলতা কিংবা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জোট ত্যাগ থেকেও তারা খুব একটা লাভবান হতে পারবে না। তখন লাভবান হবে সেই শক্তি, যারা ভোট বিভাজনের সুযোগ নেবে। বাংলাদেশ আবারও ঢুকে পড়বে অনিশ্চিত রাজনৈতিক বৃত্তে।
এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের নয়; এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি সত্যিই পুরোনো রাজনীতির বৃত্ত ভাঙতে পারবে, নাকি নতুন মুখে পুরোনো অভ্যাসই ফিরে আসবে। বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি জোটসহ সব ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলের জন্য এটাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক




