‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’
কবে থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো? কবি নির্মলেন্দু গুণ এর জবাব দিয়েছেন ঐতিহাসিক কবিতায়। সেদিন ছিল ৭ই মার্চ ১৯৭১। পূর্ব বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে একজন কবির মুখে কবিতা শুনতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিল। কানায় কানায় পূর্ণ সেদিনের রেসকোর্স ময়দানে অমর কবিতা উচ্চারিত হয়েছিল, দুনিয়া কাঁপিয়ে— ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, সামরিক-অসামরিক সবাই যোদ্ধা হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধটা হয়েছিল অস্ত্রের, কথার, বিশ্বাসের ও গর্জনের।
কী বার্তা দেওয়া হয়েছিল মুক্তিকামী মানুষকে সেদিন? জবাব দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের মহান বীর জেড ফোর্সের কমান্ডার তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় তিনি ‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে ৭ই মার্চের পরম্পরা বর্ণনা করলেন এইভাবে—‘৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্তরূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনও ব্যক্তিকে তা জানালাম না।’। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান একই লেখায় শেখ মুজিবকে জাতির পিতা সম্বোধন করলেন বহুবার। স্পষ্ট হয়ে গেলো, এই ৭ই মার্চ শুধু একটি বক্তৃতা নয়, বাঙালি সৈনিকদের যুদ্ধে যাওয়ারও নির্দেশনা। যে নির্দেশনার কারণে বাঙালি জনতা আর সামরিক বাহিনী একাকার হয়ে যায়। যুদ্ধকে অপরিহার্য মনে করে এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আল শামস ও শান্তিকমিটির বিরুদ্ধে।
তার পরের ইতিহাসও সবার জানা। সে কেমন ভাষণ? ভাবা যায়! একটা আঙ্গুলের ইশারায় একটা যোদ্ধা জাতির জন্ম হয়। যোদ্ধাদের ৩০ লাখ মানুষ নিজের জীবন দিয়ে একটি দেশের জন্ম দিতে গিয়ে, রক্তভূমিতে লাল-সবুজের পতাকা উড়ে সগর্বে। আর এই বক্তৃতাটি এক পর্যায়ে শুধু বাঙালির মুক্তিবার্তা হিসেবে ইতিহাসে স্থানই পায়নি— আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায় সর্বাধিক প্রচারিত কোনও বক্তৃতা হিসেবে। বাংলাদেশের এই গৌরবকে জাতিসংঘের ইউনেস্কো স্বীকৃতি দেয় বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নেয় – আব্রাহাম লিংকনের ভাষণের মতো। ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্লড’ এ স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক প্রভাবের বিষয়টি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে এই ভাষণ যে প্রভাব ফেলেছে, তারই স্বীকৃতি পেলো এই ভাষণ।
দীর্ঘদিন পর ২০২২ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিটের সূত্রে ওই ভাষণের কারণে ৭ই মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক এই ভাষণটিকে পাঠ্যপুস্তকে নিয়ে আসার জন্য। এক পর্যায়ে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ৭ই মার্চের ভাষণটি স্কুলপাঠ্য বইয়ে স্থান পায় এবং সরকার ৭ই মার্চকে ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং সেই তারিখটিকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।
কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওই বছরের অক্টোবর মাসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শাহাদত দিবস ও ৭ই মার্চ জাতীয় দিবস হিসেবে বাতিলের ঘোষণা দেন— যা পরবর্তী সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশ বলে সরকারি সিদ্ধান্ত আকারে প্রকাশ পায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তখন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের দলীয় দিবসগুলো জাতীয় দিবস হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ শুধু তাই নয় বলেছেন, ‘‘যেসব দিবস জাতীয় দিবস হওয়ার মতো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ নয় সেগুলোকে সরকার বাতিল করেছে।’’ তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘‘একটি ফ্যাসিস্ট আদর্শ এবং সেই আদর্শকে ধারণ ও চর্চার জন্য দিবসগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।’’ একইসময় নাহিদ ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে মানেন কিনা প্রশ্নের জবাবে জোরালোভাবে বলেছেন, অবশ্যই না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা নন, ৭ই মার্চ এর ঐতিহাসিক ভাষণ কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় বলে যে রাজনৈতিক ভাষ্য পাওয়া গেছে, তখনই প্রশ্ন আসে— আসলে মুক্তিযুদ্ধকে কি বিতর্কিত করার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কিনা। কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার কোনও উদ্দেশ্য আছে কিনা। তৎকালীন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আরও বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সম্পর্কিত কিছু দিবস ৭ই মার্চের পরিবর্তে যুক্ত হতে পারে। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়— ৭ই মার্চকে ঠেলে দিয়ে সেখানে জুলাই অভ্যুত্থানকে ঢুকিয়ে দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।
আদালতের রায়ের ভিত্তিতে একসময় ৭ই মার্চের ভাষণটি পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিকের ইংরেজি বই থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের লেসনটি বাদ দিয়েছে। সেখানে জুলাই আন্দোলন সম্পর্কিত নতুন একটি পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য কণিকা বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ পাঠ্য ছিল, সেটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। যেসব বই থেকে এখনও ভাষণটি বাদ দেওয়া হয়নি, সেখানে বঙ্গবন্ধু বিশেষণটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের বিষয় পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজন আছে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানকে স্থান দিতে গিয়ে ৭ মার্চের ভাষণকে বাদ দিতে হবে কেন?
অন্তর্বর্তী সরকারের এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরুর দিকে সামান্য প্রতিবাদ করতে গেলে কবি সৌমিত্র দেবকে লাঠিপেটার শিকার হতে হয়েছিল। সভা-সমাবেশ দূরের কথা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিবাদের জবাবে শোনা গেছে— প্রতিবাদকারী আওয়ামী লীগের দোসর-দালাল। অথচ ৭ মার্চের ভাষণ, জাতির পিতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কিছু বিষয় এককভাবে আওয়ামী লীগের বিষয় নয়, গোটা জাতির অর্জন ও ইতিহাসের অংশ। সেখানে বঙ্গবন্ধু জড়িত কিংবা তার নেতৃত্বে হয়েছিল বলে কি মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযুদ্ধের কোনও অধ্যায়কে বাদ দিতে হবে? আর একই কারণে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গেলে তাকে ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দিতে হবে এর যুক্তি কী?
কোনও একটি রাজনৈতিক দল কিছু একটা চাইলো—আর তাতেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বদলে দিতে হবে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেড ফোর্স কমান্ডার জিয়াউর রহমান যিনি ৭ মার্চের ভাষণকে তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশনা হিসেবে মনে করেছেন, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে বিশ্বাস করেছেন, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি গত সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করা যায় মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলনের অবহেলিত ইতিহাসকে আবার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করবে। দলগত বিবেচনায়ও এই ৭ মার্চ বিএনপিরও বিশ্বাস ও সম্মানের জায়গা—এটা দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিজে লিখিতভাবে জানিয়ে গেছেন।
লেখক: সাংবাদিক, শিশু সাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক




