হরমুজ থেকে ঢাকা: জ্বালানি সংকটে সরকার-বিরোধী দলের দায়িত্ব

আসিফ বিন আলী
৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটাকে কেবল সরকারবিরোধী ক্ষোভের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়েও লাভ নেই। কারণ এই সংকটের বড় অংশের উৎস দেশের ভেতরে না, দেশের বাইরে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার পর যে আঞ্চলিক যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে— তা দ্রুত হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দেয়। যুদ্ধের এই বিস্তার শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি, খুব দ্রুত তা তেল, এলএনজি, শিপিং, সার, খাদ্য ও পরিবহন খাতকে নাড়া দেয়।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আগে বুঝতে হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে— প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল, অর্থাৎ বিশ্ব সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ, এই সরু প্রণালি দিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও বলছে, বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম লিকুইডসের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। তার সঙ্গে আছে এলএনজি, যার বড় অংশ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এশিয়ায় যায়। ফলে হরমুজে চাপ মানে শুধু তেলের দামের চাপ না, পুরো এশীয় জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ। আর এশিয়াই এই রুটের সবচেয়ে বড় ভোক্তা।

মার্চজুড়ে আমরা দেখেছি, যুদ্ধের কারণে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মার্চের শেষ দিকে ১১২ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়, যদিও কূটনৈতিক সংকেত এলে পরে কিছুটা নেমেও আসে। অর্থাৎ বাজারে শুধু সরবরাহ সংকটই কাজ করছে না, ভয়, জল্পনা, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি, বিমা খরচ, রুট ডাইভারশন, সব একসঙ্গে কাজ করছে। এই বাজারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশ খুব সহজেই চাপে পড়ে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। রয়টার্স ৬ মার্চ জানায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর আতঙ্কজনিত কেনাকাটা ঠেকাতে বাংলাদেশ দৈনিক জ্বালানি বিক্রিতে সীমা টানে। পরে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে, কিছু চালানও এসেছে, কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর রিপোর্ট বলছে— বাজারে চাপ কমেনি, বরং অনেক জায়গায় লাইনে দাঁড়ানো, সরবরাহ ঘাটতি, আর আতঙ্কের মনস্তত্ত্ব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। ডেইলি স্টার ২৮ মার্চ লিখেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে মজুত তখন আনুমানিক ৯ থেকে ১৪ দিনের মতো চাপে ছিল। প্রথম আলো লিখেছে, সরকার বলছে “আসল সংকট” এখনও তৈরি হয়নি, কিন্তু প্যানিক বায়িং সিস্টেমকে চাপের মুখে ফেলেছে। আর প্রথম আলোর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়তি দামে জ্বালানি আনতে গিয়ে এ মাসে অতিরিক্ত হাজার কোটি টাকার মতো চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সংকট শুধু স্টক বা জাহাজের প্রশ্ন না, অর্থনীতির প্রশ্নও।

এখানে একটা রাজনৈতিক সততা দরকার। এই সংকটের পুরো দায় বর্তমান সরকারের ঘাড়ে চাপানো সহজ, কিন্তু তা পুরো সত্য না। মাত্র ৩৫ দিন আগে দায়িত্ব নেওয়া একটি সরকারের পক্ষে বসেই তিন মাসের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাস্তবে কঠিন। আবার এটাও সত্য, রাষ্ট্র তো শূন্যে চলে না। আগের ব্যবস্থাপনা, আমদানি চুক্তি, রিজার্ভ পলিসি, শিপমেন্ট টাইমিং, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সবকিছুর ওপর বর্তমান সরকার দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে এই না যে, কাউকে দায়মুক্তি দিতে হবে। বরং এর মানে হলো— এই সংকটকে দলীয় শ্লোগানের সরল অঙ্কে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। কারণ বৈশ্বিক যুদ্ধ, হরমুজে চাপ, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, তেলের দাম বাড়া, এলএনজি বাজারে অস্থিরতা, এগুলোর কোনোটাই ঢাকার হাতে ছিল না।

তাই এখন আসল প্রশ্ন দায়ী কে, সেটা না। আসল প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে কে কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করছে। সরকারদলের দায়িত্ব প্রথমত জনতার সঙ্গে সৎ থাকা। যদি চাপ থাকে, সেটা বলতে হবে। যদি মজুত সীমিত হয়, সেটাও বলতে হবে। যদি দাম না বাড়িয়ে আমদানি টিকিয়ে রাখতে অতিরিক্ত ভর্তুকি বা বাজেটারি চাপ নিতে হয়, সেটাও বলতে হবে। মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে হবে যাতে তারা মনে না করে, সরকার তাদের ভোগান্তিকে তুচ্ছ করে দেখছে। এখন পর্যন্ত মিডিয়ায় সরকারপক্ষের কিছু বক্তব্যে যে একধরনের প্রশাসনিক আশ্বাস আছে, সেটা ভালো, কিন্তু মানুষের কষ্টের প্রতি দৃশ্যমান কৃতজ্ঞতা এবং সহমর্মিতা খুব জোরালোভাবে দেখা যায়নি। অথচ এই সময়ে সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষ ভয়াবহ ভোগান্তি সত্ত্বেও এখনো রায়টের পথে যায়নি। এটাকে সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কারণ সামাজিক সংযমও এক ধরনের নাগরিক অবদান।

একইভাবে বিরোধী দলের দায়িত্বও কম না। এই জায়গায় শুধু “সরকার ব্যর্থ” বললে রাজনৈতিক বক্তৃতা হয়, সমাধান হয় না। কারণ আজ সরকার বদলালেও আগামীকাল হরমুজ খুলে যাবে না, তেলের আন্তর্জাতিক দাম রাতারাতি নেমে যাবে না, শিপিং ইন্স্যুরেন্স খরচ কমে যাবে না। ফলে বিরোধী দলের দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণকে উসকানি না দেওয়া, পাম্পভিত্তিক আতঙ্ক না বাড়ানো, গুজব ছড়ানো বন্ধ করা, এবং যেখানে সম্ভব সেখানে সাশ্রয়, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবহার, জরুরি সেবাকে আগে রাখা, এই ধরনের জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখা। রাজনীতি অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সবকিছুকে অগ্নিমুখী করে তুললেই বিরোধী রাজনীতি সফল হয় না। কিছু কিছু সময় আসে, যখন বিরোধিতার মধ্যেও রাষ্ট্রবোধ দেখাতে হয়।

এই সংকটে সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা হলো আইনশৃঙ্খলা। জ্বালানি তেল কেবল গাড়ির বিষয় না। এর সঙ্গে জড়িত অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল, কোল্ড চেইন, খাদ্য পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ, শিল্প, এমনকি দৈনন্দিন নগরজীবন। এই জায়গায় যদি পাম্পে হামলা, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, কালোবাজারি, বা রাজনৈতিক মবিলাইজেশনের নামে ভাঙচুর শুরু হয়, তাহলে ক্ষতি বহুগুণ বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা বাংলাদেশে এসে রাস্তায় আরেকটা অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে তার মাশুল দেবে সাধারণ মানুষই। তাই সরকারকে কঠোর হতে হবে কালোবাজারি, মজুতদারি আর গুজবের বিরুদ্ধে, কিন্তু সেই কঠোরতা যেন নাগরিক অবমাননার রূপ না নেয়। আর বিরোধী দলকেও স্পষ্ট করে বলতে হবে, তারা কোনও ধরনের রায়ট, পাম্পভাঙচুর বা জ্বালানিকে কেন্দ্র করে অরাজকতার পক্ষে না।

আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন তিনটা জিনিস। এক. সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিদিনের স্বচ্ছ ব্রিফিং। কোথায় কত মজুত, কোন চালান কবে আসবে, কোন খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, মানুষকে জানাতে হবে। দুই. রাজনৈতিক ঐকমত্যের ন্যূনতম ভাষা। সরকার ও বিরোধীদল অন্তত এটুকু বলুক যে জরুরি সেবা, কৃষি, খাদ্য ও পরিবহনকে বাঁচাতে সবাই দায়িত্বশীল থাকবে। তিন. জনগণের সঙ্গে সম্মানের সম্পর্ক। মানুষকে কেবল “প্যানিক বায়ার” বলে দাগিয়ে দিলে চলবে না, আবার মানুষকেও বুঝতে হবে যে আতঙ্কে বাড়তি কেনাকাটা করলে সংকট আরও বাড়ে।

বাংলাদেশের এই জ্বালানি চাপ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের এক প্রান্তে যুদ্ধ লাগলে আরেক প্রান্তের সমাজে তার কী গভীর প্রতিক্রিয়া পড়ে। হরমুজ প্রণালিতে চাপ, তেলের দাম বাড়া, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দুশ্চিন্তা, এগুলো এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা। তাই এই মুহূর্তে আমাদের দরকার দোষারোপের রাজনীতি না, দায়িত্বশীলতার রাজনীতি। সরকারকে আরও মানবিক, আরও স্বচ্ছ, আরও দক্ষ হতে হবে। বিরোধীদলকে আরও সংযত, আরও গঠনমূলক, আরও রাষ্ট্রসচেতন হতে হবে। আর সবাইকে মনে রাখতে হবে, জাতীয় সমস্যা আর দলীয় ইস্যু এক জিনিস না। কিছু কিছু সময় আসে, যখন রাজনীতিকে পুরো বাদ দেওয়া যায় না, কিন্তু তাকে একটু পেছনে সরিয়ে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবতেই হয়। এখন সেই সময়।

লেখক: ডক্টোরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বশেষসর্বাধিক