হামের টিকা সংকট ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা

খায়ের মাহমুদ
৩১ মার্চ ২০২৬, ১৯:২৮আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:১৬

বাংলাদেশে ২০২৫-২৬ সালে হামের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তা কোনও প্রাকৃতিক সংকট নয়—এটি সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক পরিণতি। একটি দেশে যেখানে বছরের পর বছর ৯৫ শতাংশের ওপরে টিকাদান কাভারেজ ধরে রাখা হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে কাভারেজ নেমে দাঁড়ায় ৫৬-৫৭ শতাংশে। এটা নিছক পতন নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার স্পষ্ট চিহ্ন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী এমএমআর/এমআর-এর প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ২০১৭-২৪ পর্যন্ত ছিল ৮৬ থেকে ১০০ শতাংশ, অথচ ২০২৫ সালে তা ধসে গিয়ে দাঁড়ায় ৫৯.৬ শতাংশে। এই ভয়াবহ বিপর্যয়কে আপনি  কোনও স্বাভাবিক প্রশাসনিক ত্রুটি বলে পার পেতে পারেন না।

অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা অব্যবস্থাপনার ফলে এই পতনের পরিণতি অনুমান করা কঠিন ছিল না। শিশুমৃত্যু বাড়বে, হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়বে, আর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে—এগুলোই ছিল প্রত্যাশিত ফল। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৮ থেকে বেড়ে ৬৭৬-এ পৌঁছানোর চিত্র থেকে বোঝা যায়—এই সংকট পূর্বাভাসযোগ্য ছিল, প্রতিরোধযোগ্য ছিল, তবু প্রতিরোধ করা হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হামের এই প্রাদুর্ভাবের বিস্তার শুধু একটি সাধারণ ঘটনা নয়। এটি আমাদের দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, নীতি-অস্থিরতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। বহু বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী টিকাদান সাফল্যের একটি মডেল হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ২০১৯-২০২৪ সময়ে ডব্লিউএইচও-ইউনিসেফের যৌথ অনুমান অনুযায়ী হামের প্রথম ডোজ এমসিভি১-এর কাভারেজ দাঁড়িয়েছিল ৯৬-৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ এমসিভি২-এর কাভারেজ ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ। এই উচ্চমানের ধারাবাহিক কাভারেজের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ ভ্যাকসিন-প্রিভেন্টেবল রোগ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী একটি কাঠামো গড়ে তোলে। কিন্তু ২০২৫ সালে এই সাফল্যের ভিত্তিটিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পত্রিকার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার কাভারেজ নেমে আসে যথাক্রমে প্রথম ডোজে ৫৬.৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে ৫৭.১ শতাংশে, যা দেশের টিকাদান ইতিহাসে নজিরবিহীন পতন।

টিকাদানের এই বিপর্যয় ঘটার পর তার ফলাফল খুব দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছে। গত বছরের প্রথম তিন মাসে মাত্র ৬৮ জন আক্রান্ত হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭৬-এ, যা প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি। অপরদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়কালে কমপক্ষে ৩৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম-সম্পর্কিত জটিলতায়। এই শিশুরা যেসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, সেগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে ভর্তিব্যবস্থা, আইসিইউ সুবিধা, আলাদা আইসোলেশন ইউনিট—সব কিছুর ওপর চাপ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো—২০২৫ সালে প্রায় এক বছর ধরে ইপিআই কর্মসূচি কাঠামোগতভাবে ব্যাহত ছিল, টিকা ঘাটতি, লজিস্টিক সমস্যাসহ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ৩০-৩৫ শতাংশ পদ শূন্য ছিল—যা টিকাদান ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা ভেঙে দিয়েছে। এই পুরো সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি-ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীনতা। তারা হঠাৎ করে বহু বছর ধরে সফলভাবে পরিচালিত অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) বদলে একটি ‘আমব্রেলা অ্যাপ্রোচে’ স্বাস্থ্য খাতকে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন, যা স্বল্পমেয়াদে প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। ওপি বাতিল হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাজেট ছাড়, ক্রয় অনুমোদন ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন, সব কিছুতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জাতীয় টিকাদান কার্যক্রমে। এই রূপান্তরের ফলে স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোতে তহবিলপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়, যার কারণে বহু ক্যাম্পেইন বন্ধ হয়ে যায় এবং জাতীয় টিকাদান সূচি ক্রমশ ব্যাহত হতে শুরু করে।

একইসঙ্গে ডব্লিউএইচও প্রদত্ত টিকা দেশে পৌঁছালেও ফান্ডিং অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ায় সেগুলো ব্যবহার না করে ইপিআই সদর দফতরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। অর্থাৎ টিকা সরবরাহ শৃঙ্খলায় ডিস্ট্রিবিউশন চেইন ভেঙে যায়, কেন্দ্রে টিকা থাকলেও তা পৌঁছায়নি ইউনিয়ন, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের টিকাদান কেন্দ্রে। সময়মতো  নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় তা শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও মানুষের জীবনরক্ষার ওপর কত বড় প্রভাব ফেলে, তার সব চেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে এই ঘটনাটি। অপরদিকে ২০২৪ সালের শেষ দিকে যে জাতীয় ‘ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ হওয়ার কথা ছিল, সেটিও অনুষ্ঠিত হয়নি বলে একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টে উঠে এসেছে।  এর মানে, যেসব শিশু মহামারি, লকডাউন বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যাঘাতের কারণে নিয়মিত টিকা মিস করেছে, তাদের পুনরায় কাভার করার কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে।

এই টিকাদান কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ৯ মাসের নিচের শিশুদের ওপর—যারা বয়সগত কারণে টিকা নেওয়ার যোগ্য না হলেও সাধারণত হার্ড ইমিউনিটি দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। এই বয়সের শিশুরাই এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। যেহেতু আশপাশের বড়দের মধ্যে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি না থাকলে শিশুরা সহজেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এই ইনফ্যান্ট ভালনারেবিলিটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো প্রিভেন্টেবল রোগ সাধারণত প্রথমেই ফিরে আসে যখন টিকাদান ব্যবস্থা দুর্বল হয়। আমরা এটিকে ‘সিস্টেমিক ফেইলিউর’ হিসেবে বর্ণনা করতে পারি, কারণ এই পুনরুত্থান কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত ব্যর্থতার চেইন রিঅ্যাকশন।

এই মহামারি পরিস্থিতিতে এখন প্রয়োজন বর্তমান সরকারের সক্রিয়, সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ, কারণ শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, একটি দ্রুত জাতীয় ‘ক্যাচ-আপ ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন’ চালু করতে হবে। এই ক্যাম্পেইন ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সের শিশুদের পাশাপাশি যেসব বড় শিশুরা নিয়মিত ডোজ মিস করেছে, তাদের পুনরায় টিকাদানের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, টিকাদান সরবরাহ চেইনকে পুনর্গঠন করতে হবে। কেবল টিকা দেশে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়, বরং ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। এজন্য ডিজিটাল স্টক মনিটরিং, জেলা পর্যায়ের কোল্ডচেইন সম্প্রসারণ, পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি এবং জরুরি বাজেট ম্যানেজমেন্ট—এসব অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ের ৩০-৩৫ শতাংশ শূন্যপদ পূরণ করা ছাড়া টিকাদান কার্যক্রম স্থায়ীভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। ইপিআই কর্মীরা বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থার মূল ভিত্তি, তাদের অভাব মানেই গ্রাম ও উপশহর পর্যায়ে কার্যক্রম ভেঙে পড়া।

চতুর্থত, স্বাস্থ্যখাতে নীতি–স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। অপারেশনাল প্ল্যান বহু বছর ধরে একটি সুশৃঙ্খল ও পরীক্ষিত পদ্ধতি ছিল, যা বাতিল করে স্বল্পমেয়াদি ও অপ্রস্তুত পর্যায়ের রিব্যাম্পিং পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বর্তমান সরকার যদি আবার একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কাঠামো নিশ্চিত করে, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

সব শেষে বাস্তবতা হলো—এই সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি টিকাদান কর্মসূচি কেবল টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি দেশের প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতি-স্থিতিশীলতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ পরিচালনার সমন্বিত ফল। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্য প্রমাণ করে—সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে বাংলাদেশ আবারও এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম। তবে সেই যাত্রা শুরু করতে হবে অবিলম্বে। কারণ প্রতিটি দিন মানে আরও শিশু সংক্রমিত হওয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়া। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার দায় এখনই পালন করতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জয়পুরহাটে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারালেন ২ জন
জয়পুরহাটে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারালেন ২ জন
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, জানা যাবে রায়ের তারিখ
শিশু রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক আজ, জানা যাবে রায়ের তারিখ
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সর্বশেষসর্বাধিক