চীন দেশে গিয়েছিলাম হুনান সিটি ইউনিভার্সিটির এক সম্মেলনে অংশ নিতে। এটা চীনের দক্ষিণে হুনান প্রদেশের ইইয়ং শহরে। সংগঠক মার্কসসিজম বিভাগের অধ্যাপক তু জিয়ানহুয়া। অসম্ভব আমুদে লোক। বেইজিং আর সাংহাই থেকে কিছু মার্কসিস্ট এবং মুক্তচিন্তককে ডেকেছিলেন তু। সেমিনার শেষ হওয়ার পরদিন অতিথিদের তিনি ঝাংজিয়াজি শহরের তিয়ানমেন পাহাড় আর হুয়াংলং গুহা দেখাতে নিয়ে যান। তিয়ানমেন পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম ‘কেবল কার’ দিয়ে। অসাধারণ সুন্দর সেই দৃশ্য। অনেক পাহাড়ে গিয়েছি, কিন্তু এমন চোখ জুড়ানো দৃশ্য আগে দেখিনি। একবার তো ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম ‘কেবল কার’ যখন প্রায় খাড়া পাহাড়ে উঠছিল। তার ছিঁড়ে গাড়িটা আবার পড়ে যাবে না তো! ডেভিড সিলভারম্যান বললেন, ‘আরে না, মিলিয়নস অব ডলারের বাণিজ্য। অ্যাকসিডেন্ট হওয়া মানে বাণিজ্য নষ্ট হওয়া। এটি ওরা হতে দেবে না’। ডেভিড আমেরিকান। সবকিছুই তিনি টাকা পয়সার হিসাব দিয়ে দেখেন। কিন্তু আমি বললাম, ‘কেবল কার তো মেইড ইন চায়না। মেইড ইন চায়নার সবকিছুই তো ভেঙে যায়, ছিঁড়ে যায়, খুলে যায়, নষ্ট হয়ে যায়!’
হুয়াংলং গুহা আর তিয়ানমেন পাহাড়ে হাজারো পর্যটক। সবাই কিন্তু চৈনিক নারী-পুরুষ। আমি আর ডেভিডই ছিলাম শুধু অচৈনিক। আমার জন্য, সম্ভবত আমি কালচে বাদামি বলেই, কারও তেমন কৌতূহল ছিল না। কিন্তু ডেভিডের জন্য প্রচণ্ড কৌতূহল। আমরা যখন পাহাড়ে ওঠার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন কত যে চৈনিক সুন্দরী ডেভিডের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলো! ডেভিড হাসি মুখেই ছবি তুলতে দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, যে বাড়িতে মাও সেতুংয়ের জন্ম, সে বাড়িতে তিনি গিয়েছিলেন। ওখানে তাকে বিস্ফারিত বিস্মিত চোখে লোকজন এমনভাবে দেখছিল যেন এর আগে কখনও ওরা ইউরোপ-আমেরিকার কাউকে দেখেনি। তবে আধুনিক চীনের অনেক এলাকার মানুষ এখনও পৃথিবীর অনেক কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন।
চীনে চলাফেরার সময় অনেক সময় ভুলে গেছি এ দেশ ইউরোপ বা আমেরিকার অংশ নয়। অর্থনৈতিক উন্নতি চীনকে উন্নত বিশ্বের যে কোনও দেশের পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন আর চীনের খুব ভাবনা নেই। নেক্সট সুপারপাওয়ার হিসেবে চীনকে ভেবে নেওয়াটা অসম্ভব বা অবাস্তব কিছু নয়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিই সরকার চালাচ্ছে। কমিউনিজমের অনেক থিওরিই বাদ দিয়ে পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছেন চীনের কমিউনিস্ট নেতারা। অর্থনৈতিক উন্নয়নে পৃথিবীর সেরা এখন চীন। যদি কেউ বাক স্বাধীনতা না চায়, শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি চায়, তার জন্য বা তাদের জন্য চীন এক নম্বরের খাঁটি দেশ।
বেইজিং দেখার ইচ্ছা ছিল খুব। চীনেই যখন যাচ্ছি, ভেবেছিলাম দক্ষিণ চীন থেকে বেইজিং চলে যাবো। বেইজিংয়ে দু’তিনদিন নিজ খরচে ঘুরে বেড়াবো। ও মা, সংগঠক তা হতে দেবেন না। তিনি আমাকে বেইজিং পাঠালেন উড়োজাহাজে, রাখলেন পাঁচতারা হোটেলে, মার্কসসিজমের একজন চৈনিক শিক্ষিকাকে আমার সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা থাকার জন্য যোগাড় করলেন। বেইজিং ভ্রমণের সব খরচ তিনিই বহন করলেন। তু জিয়ানহুয়ার উদারতা এবং অতিথিপরায়ণতা অবিশ্বাস্য। প্রতিদিনই তার প্রমাণ পেয়েছি। তিন বেলা তিনি যে খাবার দাবারের আয়োজন করতেন, তা একেবারে এলাহিকাণ্ড। অতিথিকে সুখী এবং তৃপ্ত করার জন্য সবসময় কিছু না কিছু করতেন। চীনের সকলে তু জিয়ানহুয়ার মতো উদার নয়, তার মতো সরল সহজ নয়। তু হয়তো অনেকের চেয়ে আলাদা। আবার তু অনেকের মতোও। তাকে গ্রাম-বাংলার সৎ এবং সহজ সরল মানুষের মতো মনে হয়েছে। অনেকটা আমার মায়ের মতো। মার এরকম আবেগ ছিল। অন্যের জন্য সব ঢেলে দেওয়াতেই ছিল তার সুখ।
তু জিয়ানহুয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দালাই লামা সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন। তু বললেন, ‘দালাই লামার মতো আপদ বিদেয় হয়েছে বেশ হয়েছে ও আমাদের চীনকে দু’টুকরো করে ফেলতে চেয়েছিল।’ তিয়ানানমেন স্কোয়ার ম্যাসাকারের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম, তু বলেছেন, ‘আমেরিকা কিছু ধর্মবাদীদের লেলিয়ে দিয়েছিল বিশঙ্খলা সৃষ্টির জন্য। ওরা চীনের ভালো চায় না। তিয়ানানমেনের রেবেল নেতাকে আশ্রয় আমেরিকাই দিয়েছে’। তুর সব কিছু আমার খুব ভালো লাগলেও তার এই দুটো মত আমি মানতে পারি না। সম্ভবত বাক স্বাধীনতায় একশ’ ভাগ বিশ্বাস করি বলেই পারি না। তিয়ানানমেন স্কোয়ারে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছিল ১৯৮৯ সালে, তার দায় এবং দোষ ভিকটিমদের দেওয়া অন্যায়। এই অন্যায় কাজটিই সরকার সমর্থকরা নির্দ্বিধায় করে যাচ্ছেন।
চীনে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে হামেশাই, এরকম কথা শুনে আসছি বহু বছর। দক্ষিণ চীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনও আভাস না দেখলেও রাজধানী বেইজিংয়ের পুলিশ স্টেশনের পাশে আমি দেখেছি কিছু ডিসটার্বিং দৃশ্য। অন্যায় আর অবিচারের প্রতিবাদ জানাতে আসা জনতার উপস্থিতি বাড়তে দেখলেই পুলিশ তটস্থ হয়ে পড়ে। এক নারীর হাত থেকে প্রতিবাদের কাগজ ছিনিয়ে নিয়েছে পরশু, কাল তো আরেক প্রতিবাদী নারীকে ভর দুপুরে পিটিয়ে ভ্যানে তুললো। সরকার এমনই ভয়ে থাকে যে শহরময় অকারণে শত শত পুলিশ নামায়, তিয়ানানমেন স্কোয়ারের ল্যাম্পপোস্টে অনেকগুলো ক্যামেরা বসিয়েছে। একসময় আমি বলতাম, ‘সেকুলার ডিকটেটরই ভালো, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বড়ই ঝুঁকির, এটি ব্যবহার করে মৌলবাদীরা ক্ষমতায় চলে আসে’। এখন আর বলি না, বিশেষ করে চীন দেখার পর। আমার কাছে বাক স্বাধীনতার মূল্য অনেক। এই বাক স্বাধীনতা আমি কোনও কিছুর বিনিময়েই হারাতে রাজি নই। আমার যদি সরকারের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকে, পুলিশের বিরুদ্ধে কোনও অনুযোগ থাকে, তাহলে আমি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলার অধিকার চাই। এই অধিকারটির মূল্য আমার কাছে অনেক। এই অধিকারটি থাকলে কিছু কম খেয়েও, কিছু কম পরেও স্বস্তি পাওয়া যায়।
বেইজিংয়ে দেখলাম চীনের প্রাচীর, ফরবিডেন সিটি, মাওয়ের মুসোলিয়াম, জাতীয় জাদুঘরসহ অনেক কিছু। দেখলাম তিয়ানানমেন স্কোয়ার। ওই স্কোয়ারে যখনই পা দিয়েছি, ভেবেছি সেই হত্যাকাণ্ডের কথা। ঠিক এই স্কোয়ারেই তো গণতন্ত্রের আশায় জড়ো হয়েছিল হাজারো মানুষ, ওই প্রতিবাদী মানুষের দিকে গুলি ছুঁড়েছিল সরকার, গুলিতে ঝাঁঝড়া করে দিয়েছিল শত শত বিপ্লবীর বুক। তবে বিপ্লবীরা ক্ষমতায় গেলে তাদের কাছে বিপ্লব জিনিসটা আর পছন্দের থাকে না।
চীনে গণতন্ত্র নেই। পুলিশ কাউকে ধমক দিলে আমরা চমকে উঠি, কাউকে গ্রেফতার করলে আমরা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি। গণতন্ত্র নেই– এই খবরটিই আতংক ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু কাগজপত্রে গণতন্ত্র আছে, এমন অনেক দেশের সরকার কিন্তু গণতন্ত্র কাকে বলে জানে না। সেসব দেশে তুমুল অরাজকতা এবং অগণতান্ত্রিক কাজকর্ম চলছে। সাধারণ মানুষের ওপর সরকারি নির্যাতন চলছে, পুলিশের নৃশংসতা চলছে। যে কেউ যে কাউকে খুন করে চলে যাচ্ছে। সরকারের কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। গণতান্ত্রিক সরকার অচিরে নেমে পড়ে স্বৈরাচারীর ভূমিকায়, খুনীর সঙ্গে আপস করে। চীন দেশে গণতন্ত্র না থাকলেও তিয়ানানমেনের ইস্যুতে কমিউনিস্ট পার্টির উদারপন্থী আর কট্টরপন্থীদের মধ্যে বিরোধ বেড়েছিল। এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, চীন এমন সুষ্ঠুভাবে চালাচ্ছে যারা, তাদের ঘটে কিছু না হলেও বুদ্ধি আছে, চরিত্রে কিছু না থাকলেও সততা আছে। কিন্তু পৃথিবীর এমন অনেক দেশের কথা জানি, যে দেশের সরকার দেশের সম্পদ নিজেরাই লুটে পুটে খায়, অসততা আর বুদ্ধিহীনতা তাদের চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক না। শুনেছি শেখ হাসিনা নাকি বলেছেন, মুক্তচিন্তা একটা ফ্যাশন। চীনের প্রধান যদি বলেন, গণতন্ত্র একটা ফ্যাশন, আমরা হেসে গড়িয়ে পড়বো। কারণ আমরা জানি গণতন্ত্র ফ্যাশন নয়, গণতন্ত্র নেসেসিটি। ঠিক একইরকম মুক্তচিন্তা ফ্যাশন নয়, মুক্তচিন্তাও নেসেসিটি। শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের কিছুই বোঝেন না, সে কারণে মুক্তচিন্তারও কিছু বোঝেন না।
তু জিয়ানহুয়া আমাকে বেইজিং ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু তাকে খুশি করতে, আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি তিয়ানানমেন স্কোয়ারে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা। আমি ৪ জুনের সেই ম্যাসাকারের কথা স্মরণ করেছি এবং তুর পছন্দের সরকারের নিন্দা করেছি। এতে তুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে হয়তো, কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য আমি মত প্রকাশের মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিতে রাজি নই।



