শুধু বিমান কিনেই কি এভিয়েশন হাব হওয়া সম্ভব?

ফারাবী বিন জহির
০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০

সম্প্রতি একের পর এক বিমান কেনার নানা খবর সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। দেশে এ পর্যন্ত ২৫টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তি বা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। উড়োজাহাজের বহর বড় করা নিঃসন্দেহে যেকোনও দেশের আকাশপথের জন্য একটি দারুণ খবর। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে—শুধু সারিবদ্ধ নতুন বিমান কিনে কি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব বানানো সম্ভব? নাকি সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া এই বিশাল বিনিয়োগ দিনশেষে সাগরে ভাসানো টাকায় রূপ নেবে?

বিষয়টি বুঝতে হলে একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ঘোড়ার গাড়ি চালাতে হলে যেমন তেজস্বী ও শক্তিশালী ঘোড়া প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন একটি মজবুত, মসৃণ ও টেকসই গাড়ি। দুটির যেকোনও একটির কার্যক্ষমতা কম হলে গাড়ি এক পা-ও এগোবে না। এভিয়েশন খাতের সমীকরণে নতুন বিমানগুলো হলো সেই ঘোড়া, আর বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিস ও অবকাঠামো হলো মূল গাড়ি। ঘোড়া যত দামি বা দ্রুতগামীই হোক না কেন, গাড়ি ভাঙা হলে যাত্রা পণ্ড হতে বাধ্য।

আজকের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাস্তবতার দিকে তাকালে চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বর্তমানে বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীদের ব্যাগেজ দেওয়ার জন্য মাত্র ৮টি বেল্ট রয়েছে। প্রায়শই দেখা যায়, ১০ থেকে ১২টি ফ্লাইট মাত্র ২০-৩০ মিনিটের ব্যবধানে রানওয়েতে চাকা ছোঁয়ায়। প্রথম ৮টি বিমান বেল্ট পেয়ে গেলেও বাকি বিমানগুলোর যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা টার্মিনালের মেঝেতে বা ট্রলি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রবাস থেকে ফেরা ক্লান্ত কর্মী কিংবা বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি এক চরম তিক্ত অভিজ্ঞতা।

একটি সফল এভিয়েশন হাব হতে গেলে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা চকচকে টার্মিনাল ভবনই যথেষ্ট নয়। যাত্রীদের ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে যে মৌলিক সেবাগুলো প্রয়োজন সেখানে কিন্তু আমাদের ঘাটতি প্রকট। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দীর্ঘ সারি, পর্যাপ্ত ব্যাগেজ চেকিং রো না থাকা, অকেজো বা অপর্যাপ্ত ব্যাগেজ বেল্ট, অপরিষ্কার টয়লেট, টার্মিনালে বসার আসনের অভাব এবং পর্যাপ্ত ট্রলি না পাওয়ার অভিযোগ প্রতিদিনের। একজন যাত্রী আকাশপথে যত চমৎকার সেবাই পান না কেন, মাটিতে নেমে যদি ইমিগ্রেশন ও ব্যাগেজ পেতে তার দুই-তিন ঘণ্টা গায়েব হয়ে যায়—তবে সে আর কখনও এই বিমানবন্দরমুখী হতে চাইবে না।

অনেকে হয়তো যুক্তির খাতিরে বলবেন, তৃতীয় টার্মিনাল তো চালুর অপেক্ষায়, সেখানে তো সব বিশ্বমানের আধুনিক সুবিধা থাকছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকটটি যেখানে, সেখানে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে কতটুকু? তৃতীয় টার্মিনাল বিশাল আকৃতির হতে পারে, কিন্তু সেটির জন্য রানওয়ে কিন্তু সেই একটিই!

একটিমাত্র রানওয়ে হওয়ায় এখনই ফ্লাইটগুলোকে আকাশে চক্কর দিয়ে বা রানওয়েতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যান্ডিং ও টেক-অফের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে যখন দেশি-বিদেশি আরও নতুন এয়ারলাইন্সকে স্বাগত জানানও হবে, তখন আকাশপথের এই যানজট বা কনজেস্টন ঠিক কতটা ভয়াবহ রূপ নেবে?

ফ্লাইট ল্যান্ড করতে না পেরে আকাশে ভেসে থাকা বা হোল্ডিং-এ থাকা মানেই লিটার লিটার মহার্ঘ জ্বালানি বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের যা উচ্চমূল্য, তাতে কোনও লাভজনক এয়ারলাইন্স বারবার আকাশে চক্কর কেটে অহেতুক লোকসান গুনতে চাবে না। সময়মতো শিডিউল ধরে রাখতে না পারলে এবং অহেতুক জ্বালানি পুড়লে বিশ্বমানের এয়ারলাইন্সগুলো ঢাকা এয়ারপোর্টকে এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করবে।

বিশ্বের যেকোনও সফল এভিয়েশন হাব দিকে তাকালেই একাধিক রানওয়ে ও একাধিক বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। শুধু লন্ডনেই রয়েছে ৬টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নিউইয়র্কে ৩টি, ইস্তাম্বুলে ২টি, দুবাইতে ২টি এবং আমাদের পাশেই ব্যাংকক শহরে রয়েছে ২টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও একাধিক রানওয়ে থাকার মূল সুবিধা হলো— ফ্লাইট জটের সম্ভাবনা শূন্যে নেমে আসে, সময় বাঁচে এবং যাত্রীরা সর্বোচ্চ সেবা পান। ফলে শাহজালাল বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঢাকার পূর্বাচল বা পূর্বাঞ্চলের দিকে আরেকটি রানওয়েসহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি এভিয়েশন হাব গড়ার সঠিক সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

হাব হতে না পারার আরেকটি বড় অদৃশ্য দেয়াল হলো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং একচ্ছত্র আধিপত্য বা মনোপলি। পৃথিবীর কোনও সফল এভিয়েশন হাব খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে পুরো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস একটিমাত্র এজেন্টের হাতে জিম্মি থাকে। কোনও এভিয়েশন হাবই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে মনোপলি সমর্থন করে না। প্রতিযোগিতা না থাকলে সেবার মান পড়ে যায়, টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম বাড়ে এবং লাগেজ হারানো বা নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে নিয়মিত। নিজেদের আন্তর্জাতিক সুনাম বাঁচাতে অনেক এয়ারলাইন্স এ ধরনের একচ্ছত্র আধিপত্যের বাজারে ফ্লাইট চালাতে চায় না।

পশ্চিমের দেশগুলো বাদ দিলেও আমাদের প্রতিবেশীদের চিত্রটা খেয়াল করা যাক। ভারতের কলকাতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩টি প্রধান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্সি কাজ করে। নতুন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রয়েছে ৩টি এজেন্সি, থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে ৩টি এবং সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে ২টি শক্তিশালী এজেন্সি রয়েছে। এই সুস্থ প্রতিযোগিতার কারণেই তারা বিমানকে দ্রুত খালি করে আবার আকাশে উড়িয়ে দিতে পারে এবং বিশ্বমানের সেবা বজায় রাখতে পারে।

সুনির্দিষ্ট গ্রাউন্ড সার্ভিসের পাশাপাশি আরেকটি অতি সংবেদনশীল ও গুরুতর বিষয় হলো বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সিকিউরিটি সিস্টেম। নিরাপত্তাগত ঘাটতির কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনার সংখ্যা নেহাত কম নয়।

বিমানবন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে যদি সম্পূর্ণ আধুনিক, বিশ্বমানের এবং কমপিউটারাইজড ডিজিটাল প্রযুক্তিতে উন্নীত না করা যায়, তবে শুধু সাধারণ যাত্রীদের সুরক্ষাই নয়, বরং কোটি কোটি ডলারের মূল্যবান উড়োজাহাজগুলোর অস্তিত্বও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। যে বিমানবন্দর নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে বারবার আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনাম হয়, সেখানে বিশ্বখ্যাত কোনও এয়ারলাইন্স তাদের দামী এয়ারক্রাফট নিয়ে আসতে চাইবে না—এটাই খুব স্বাভাবিক বিষয়।

আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব গড়তে হলে সিকিউরিটি সিস্টেমকে এমন এক উচ্চতায় নিতে হবে, যেন নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বের যেকোনও এয়ারলাইন্স ও আন্তর্জাতিক সংস্থা চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখতে পারে।

সুতরাং, শুধু কয়েক ডজন আধুনিক বিমান কিনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করলেই বাংলাদেশ রাতারাতি এভিয়েশন হাব হয়ে যাবে না। বিমান কেনার পাশাপাশি বিমানে বহনকৃত যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেন কোনোরূপ ভোগান্তিতে পড়তে না হয়— সেই মৌলিক অবকাঠামোগত সংস্কার সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী ও সমন্বিত একটি মাস্টারপ্ল্যান।

একক মনোপলি ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, রানওয়ে সংকট দূর করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং প্রাথমিক প্যাসেঞ্জার সার্ভিস ঢেলে সাজাতে না পারলে— জাঁকজমকপূর্ণ এয়ারক্রাফট কেনা হবে, মেগা প্রজেক্টের ফিতা কাটা হবে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হওয়ার মূল স্বপ্নটি চিরকাল অধরাই থেকে যাবে।

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক।

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘এসআরবি’র কাছে ‘জিয়ার সৈনিক’ পরিচয় দিয়ে লাভ নেই: কর্মকর্তা 
‘এসআরবি’র কাছে ‘জিয়ার সৈনিক’ পরিচয় দিয়ে লাভ নেই: কর্মকর্তা 
‘আমেরিকা আর আমাদের চায় না’, ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের দেশে ফেরার আহ্বান ভেম্বুর
‘আমেরিকা আর আমাদের চায় না’, ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের দেশে ফেরার আহ্বান ভেম্বুর
তানজিদের ঝড়ো ব্যাটিং, দারুণ সূচনায় লাঞ্চ বিরতিতে বাংলাদেশ 
তানজিদের ঝড়ো ব্যাটিং, দারুণ সূচনায় লাঞ্চ বিরতিতে বাংলাদেশ 
ক্যানসারকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এটি
ক্যানসারকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এটি
সর্বশেষ সর্বাধিক