ক্রসফায়ার এবং ক্রসচেক

হারুন উর রশীদ
২১ জুন ২০১৬, ০০:০২আপডেট : ২১ জুন ২০১৬, ১৮:৪৭

হারুন উর রশীদ সাংবাদিকতায় তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত হতে ক্রসচেক শব্দটি অহরহ ব্যবহার করা হয়। উদ্দেশ্য হলো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া। একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে কোনও বিষয় নিশ্চিত হওয়া। আর বাংলাদেশে ক্রসফায়ার শব্দটি ২০০৪ সাল থেকে আলোচিত। বাংলায় যাকে বলা যায় দু’পক্ষের গোলাগুলি। আর এই ক্রসফায়ারের শিকার হতে পারেন দু’পক্ষই। এমনকি তৃতীয় পক্ষও। ক্রসফায়ার মৃত্যুর খবর দেয় আর ক্রসচেক সঠিক তথ্যের নিশ্চয়তা দেয়।
২৫ বছর আগে একটি ক্রসফায়ারের ঘটনা-
আর ঘটনাটি ঘটেছিল ভারতের উত্তর প্রদেশে। ১৯৯১ সালের ১২ জুলাই উত্তর প্রদেশের পিলিভিতে’র কাছাল ঘাটে পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন ১০ জন শিখ ধর্মাবলম্বী। ভারতীয় পুলিশ ঘটনার একদিন পর ১৩ জুলাই এক বিবৃতিতে দাবি করে, ‘অ্যানকাউন্টারে খালিস্তানপন্থী ১০ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন। এসব ‘সন্ত্রাসীর’ বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে। এই চরমপন্থীরা সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, পুলিশ পাল্টা-গুলি ছুড়লে ১০ জন চরমপন্থী নিহত হয়। অ্যানকাউন্টারে ১০ জন নিহত হওয়ার পর অস্ত্র ও গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে।’ আর সেসব অস্ত্র ও গুলি প্রদর্শন করা হয়, সংবাদ মাধ্যমে পাঠান হয় ছবি।
তবে এটি ছিল উত্তর প্রদেশের পুলিশের একটি সাজানো নাটক। ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে প্রমাণ হয় পুলিশ নিরীহ তীর্থ যাত্রীদের হত্যা করেছিল। আদালত এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে ৪৭ পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে বিচার হয় ৫৭ জনের। ১০ জন রায় ঘোষণার আগেই মারা যান।
প্রকৃত ঘটনা হলো- ১৯৯১ সালের ১২ জুলাই, পিলিভিতে একটি বিলাসবহুল বাস থামায় পুলিশ সদস্যরা। বাসটি শিখ তীর্থযাত্রীতে পূর্ণ ছিল। কয়েকটি পরিবারের নারী ও শিশুদের রেখে ১০ পুরুষ যাত্রীকে বাস থেকে নামতে বাধ্য করে পুলিশ।
ঘটনাস্থলে আরও পুলিশ এসে যোগ দেওয়ার পর তারা ওই ১০ জনকে কয়েকটি দলে ভাগ করে। এরপর তাদের জঙ্গলে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সিবিআই মামলাটির তদন্ত করে জানায়, পুরস্কার অর্জন ও ‘সন্ত্রাসী’ হত্যার কৃতিত্ব জাহির করাই ছিল এই খুনের উদ্দেশ্য।

এখানে একটি বিষয় বলা দরকার, ভারতের পুলিশ কিন্তু প্রথমে ঘটনার তদন্ত করেনি। সংবাদ মাধ্যম এই ক্রসফায়ারের ঘটনার পর ক্রসচেক করতে গিয়ে যা পায় তা প্রকাশ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফৌজদারি মামলা হয় এবং আদালতের নির্দেশে তদন্ত হয়। বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। এটা স্পষ্ট যে, সিবিআই ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষভাবেই করেছে। ফলে আসল ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। সুতরাং নিরপেক্ষ তদন্তের একটি জায়গা থাকা প্রয়োজন। না থাকলে ভারতের এই ১০ নিরীহ তীর্থযাত্রী ‘সশস্ত্র চরমপন্থী’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকতো।

এবার বাংলাদেশের একটি ক্রসফায়ারের গল্প বলি-

ঢাকার মিরপুরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স থেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. আক্কাস আলির ছেলে নুর আলম বাবুকে র‌্যাব সদস্যরা ধরে নিয়ে যায় ২০০৯ সালের ১৩ মে। এর দুদিন পর তার লাশ পাওয়া যায় সবুজবাগ থানা এলাকায়।

মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস আলি টেলিভিশনে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে ‘মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসী’ নিহত হওয়ার খবর দেখে তার ছেলেকে শনাক্ত করেন। আর তার মরদেহের পাশে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ছবিও দেখানো হয় টেলিভিশনের খবরে। বাবুর বাসা মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স-এ হলেও তাকে ধরে নিয়ে যায় সবুজবাগ এলাকার র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব থেকে তখন জানানো হয়- বাবুকে নিয়ে অস্ত্র ও মাদক দ্রব্য উদ্ধারে অভিযান চালানোর সময় তার সহযোগীরা তাকে গুলি করে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করলে র‌্যাব সদস্যরা পাল্টা গুলি করে। দু’পক্ষের গোলাগুলিতে সে নিহত হয়।

মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস আলি তার ছেলেকে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করতে চাইলেও থানা মামলা নেয়নি। এরপর তিনি মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করলে তারা তদন্ত করে বাবুকে নিরীহ বলে তদন্ত রিপোর্ট দেয় এবং তাকে অর্থের বিনিময়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। মানবাধিকার কমিশনের অনুরোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বাবু কোনও সন্ত্রাসী বা মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন না। বরং তিনি মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স এলাকায় মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীরা। আর এ কারণেই প্রতিপক্ষের ইন্ধনে র‌্যাব সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করে এবং তিনি ক্রসফায়ারে নিহত হন।

২০১৩ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বাবু হত্যার জন্য দায়ী র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। নিজ নিজ বিভাগকে মামলা দায়ের করে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়। কিন্তু আজও সেই মামলা হয়নি। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি।

এখানে বাংলাদেশ ও ভারতের দুটি ঘটনায় কিছু মিল এবং কিছু পার্থক্য স্পষ্ট। ক্রসফায়ারের গল্পটি ভারত-বাংলাদেশে প্রায় একইরকম। গুলি, পাল্টা-গুলি অতঃপর ‘সন্ত্রাসী’ নিহত। আর উভয় ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে। ভারতে ওই ক্রসফায়ারের উদ্দেশ্য ছিল নগদ অর্থ পুরস্কার অর্জন ও ‘সন্ত্রাসী’ হত্যার কৃতিত্ব জাহির। আর বাংলাদেশে যে ঘটনাটি বললাম তার উদ্দেশ্যও আর্থিক লাভ। বাবুর প্রতিপক্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্তি।

পার্থক্য হলো- ভারতে তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পর বিচারে ৪৭ পুলিশ সদস্যের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর বাংলাদেশে তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পরও বিচার তো দূরের কথা কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।

এখানেই আসে ক্রসচেক-এর কথা। যেকোনও বাহিনীর কার্যকলাপকে ক্রসচেকের আওতায় আনা না গেলে তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তারা ভুলে যায়, আইন তাদের জন্যও। আইনের বাইরে কেউ নেই। আর এই ক্রসচেকটি হওয়া প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনও কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে।

২০০৪ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার শব্দটি পরিচিতি পায়। ক্রসফায়ারের পর অ্যানকাউন্টার এবং সর্বশেষ বন্দুকযুদ্ধ। বিষয়টি দেশের নাগরিকরা এখন বেশ ভালো বোঝেন। আজকাল ক্রসফায়ারের আগাম পূর্বাভাস দিয়েও কেউ কেউ সফল হচ্ছেন।

ক্রসফায়ার আসার আগে একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছিল। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথবাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। তখন হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর পরিমাণ বেড়ে যায়। যৌথবাহিনী যাদের তখন আটক করেছিল তাদের একটি অংশ তাদের হেফাজতেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। তবে এটা যে আসলে হার্ট অ্যাটাক ছিল না তার প্রমাণ হলো- ওই সময়ে যৌথবাহিনীর সব কাজকে দায়মুক্তি দিয়ে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথঅভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩' করা হয়। পরে অবশ্য এই আইনকে হাইকোর্ট বাতিল করে।

অপারেশন ক্লিনহার্ট চলার সময় আমি দৈনিক সংবাদে কাজ করতাম। সাংবাদিকদের মাঝে মাঝে তখন বিভিন্ন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো উদ্ধার করা অস্ত্র এবং আটক ‘সন্ত্রাসীদের’ দেখাতে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় তখন যৌথবাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল। একদিন সেই ক্যাম্পে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হয়। সামনে অস্ত্র আর তার পেছনে ‘সন্ত্রাসীদের’ দাঁড় করানো হলো ছবি তোলার জন্য।

হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেলো পাশাপাশি তিনটি মুখে। তারাও নিরবে আমার দিকে তাকালেন। দুই পক্ষের চোখ স্থির। দু’পক্ষই কথা বলতে চায়। চোখে আকুতি, কিন্তু কারোর মুখ থেকে শব্দ বের হয় না। অনেক দিনের পরিচিত কেউই এখন আর কাউকে চেনার চেষ্টা করলেন না। যে যার অবস্থানে দাঁড়িয়ে রইলেন। কারণ এটা অপারেশন ক্লিনহার্ট। ক্রসচেকের সুযোগ নেই। যৌথবাহিনী যা বলবে তাই। নয়তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে।

আজ এতদিন পরে বলি, সেই তিনজন ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা। তবে তাদের সৌভাগ্য যে হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতে হয়নি। ছাড়া পাওয়ার পর তাদের সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছিল।

ক্রসফায়ার জামানার শুরুতেও একইভাবে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের ডেকে নেওয়া হতো। ক্যামেরা এবং সাংবাদিক হাজির না হওয়া পর্যন্ত লাশ ঘটনাস্থলে পড়ে থাকতো। আর সাংবাদিকরা যাওয়ার পর বের হতো ‘স্থানীয় উৎফুল্ল জনতার’ মিছিল। চলতো ‘সন্ত্রাসী’র ক্রসফায়ারে মৃত্যুবরণে মিষ্টি বিতরণ। তবে এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন আর ক্রসফায়ারের স্পটে সাংবাকিদের ডেকে নেওয়া হয় না। কারণ সাংবাদিকরা মোহভঙ্গের পর ধীরে ধীরে ঘটনা ক্রসচেক করতে শুরু করেন। আর ঘটনাস্থলে ক্রসচেক করলে কেমন জানি গল্পের মধ্যে ফাঁক পাওয়া যায়। তাই এখন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের না নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সেই ব্যাখ্যা বা বর্ণনা বিশুদ্ধভাবে আগের মতোই আছে।

সম্প্রতি বিশেষ করে চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে ‘জঙ্গিরা’ ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া শুরু করেছে। ওই ঘটনার পর এ পর্যন্ত মোট আটজন ‘জঙ্গি’ ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে।

সর্বশেষ একদিনের ব্যবধানে নিহত হয়েছে ফাহিম ও শরিফুল। তবে শরিফুলের প্রকৃত নাম নাকি মুকুল।

১৫ জুন মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর হামলার ঘটনায় নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরিরের সদস্য ফাইজুল্লাহ ফাহিমকে জনতা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। আটকের পর ফাহিমকে পুলিশ আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয়। এর পরদিনই রিমান্ডে থাকা অবস্থায়ই সে শনিবার ভোররাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

আমরা দেখেছি, হাতকড়া পড়া অবস্থায় ফাহিমের লাশ। বুকে গুলির চিহ্ন। বুলেট প্রুফ জ্যাকেট নেই। ফাহিমকে নিয়ে পুলিশ এত অসতর্কভাবে কেন অভিযানে বের হয় সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ সে তো জঙ্গিদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছিল, যা পুলিশের জন্য অনেক জরুরি ছিল জঙ্গিবিরোধী অভিযানে। পুলিশ কী তাহলে তাদের কোনটা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করতে পারেনি? না পেরেছে? প্রথম প্রশ্নের জবাব হ্যাঁ হলে তা পুলিশের অদক্ষতা। আর দ্বিতীয়টির জবাব হ্যাঁ হলে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

আর রবিবার ভোররাতে ঢাকার মেরাদিয়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় শরিফুল ওরফে হাদি। পুলিশের দাবি একটি মোটরসাইকেলে তিনজন যাওয়ার সময় পুলিশ চ্যালেঞ্জ করলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এরপর পুলিশ প্রতিরোধ করলে শরিফ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

শরিফুল অভিজিৎ হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন আসামি। পুলিশের দাবি সে একই ধরনের আরও ৭টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, অভিজিৎ রায় এবং তার স্ত্রী রাফিজা আহমেদ বন্যাকে শরিফ হত্যার আগে অনুসরণ করছিল।

পুলিশের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে শরিফুল ছিল এমন এক জঙ্গি যার মাধ্যমে পুরো জঙ্গি নেটওয়ার্কের খোঁজ পাওয়া যেত। ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যার নেপথ্য অপরাধীদেরও চিহ্নিত করা যেত। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে গেলো। আর নষ্ট হয়ে গেলো ন্যায় বিচারের পথও। এই অপরাধীদের যদি বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া যেত তাহলে এর বিরাট এক সামাজিক প্রভাব আমরা দেখতে পেতাম।

আমরা জানি না এই দুই ‘জঙ্গি’র কাছে আরও কী তথ্য ছিল। তবে আমরা জানি জঙ্গিরা একা নয়। তাদের উপরে, ডানে বায়ে আরও অনেক হাত আছে। সেই ডান-বামরা কি সক্রিয় হয়ে উঠেছে! এই জঙ্গিরা বেঁচে থাকলে কি তারা সমস্যায় পড়তেন। জানি না। জানার সুযোগও নেই।

আমরা আসলে বিচার চাই। বিচারহীনতা চাই না। কেউ শাস্তি পেলে তা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হতে হবে। বিচারহীনতায় আসলে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দেয়। তাই সবক্ষেত্রেই ক্রসচেকটি জরুরি। তা না হলে এক নিয়ন্ত্রণহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার, অ্যানকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধে মোট নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৭১৫ জন। আর এসব ক্রসফায়ারের প্রতিটির গল্পই একইরকম। আমাকে আমার এক সাংবাদিক বন্ধু প্রশ্ন করেছেন, ‘ক্রসফায়ারের গল্পগুলো এখন আর তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না কেন?’ জবাবে আমি বলেছি- প্রতিটি ক্রসফায়ারের ঘটনা যদি স্বাধীন কোনও সংস্থা দিয়ে তদন্ত করানো হয়, তাহলে অনেক প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। একই গল্প হবে না। আমরা জানতে পারতাম নানা ধরনের, নানা স্বাদের, নানা রঙ-এর গল্প। তা কি আদৌ হবে এই দেশে?

আমারও দু’একটি প্রশ্ন আছে। কেউ কি বলতে পারবেন- মোট কতটি ক্রসফায়ার হলে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসমুক্ত হবে? আর ক্রসফায়ারে নিহত ১ হাজার ৭১৫ জন-এর যদি একটি গল্পও নাটক প্রমাণিত হয় ভারতের ঘটনাটির মতো, তাহলে কি তার বিচার হবে?

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: [email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বশেষসর্বাধিক