প্রধানমন্ত্রী সাঁওতালদের বাড়ি বানিয়ে দেবেন?

Send
রোকেয়া লিটা
প্রকাশিত : ১০:৪৬, নভেম্বর ১৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, মার্চ ২১, ২০১৭

রোকেয়া লিটাগত কয়েকদিন ধরে গাইবান্ধায় সাঁওতালদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও উচ্ছেদের খবর পাচ্ছি খুব। অভিযোগ অন্য কারও বিরুদ্ধে নয়, খোদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। গাইবান্ধার একটি চিনিকল নিয়ে ঝামেলা। বিভিন্ন সংবাদসূত্রে জানতে পারলাম, ১৯৫৬ সালে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ চিনি কলের জন্য প্রায় দুই হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। সেখানে তখন ২০টি গ্রামের মধ্যে ১৫টিতে সাঁওতালদের বসবাস ছিল। বাকি পাঁচটি গ্রামে বাঙালির বসবাস ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে গেলে সাঁওতালরা সে জমিতে আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করে।  
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো পড়লে চিনিকলের জমিতে ফিরে আসা নিয়ে প্রশাসন ও সাঁওতালদের পরস্পর বিরোধী অবস্থান চোখে পড়ে। প্রশাসন বলছে, ১৯৫৬ সালে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। সেজন্য এখানে সাঁওতালদের ফিরে আসার কোনও সুযোগ নেই। অন্যদিকে সাঁওতালদের দাবি, শর্ত অনুযায়ী অধিগ্রহণ করা জমিতে আখ চাষ ছাড়া অন্য কোনও কিছু করা যাবে না। যেহেতু সেখানে আখ চাষ ব্যতীত অন্য কিছু করা হচ্ছিল, তাই সে জমিতে ফিরে যাওয়াকে যৌক্তিক মনে করছে তারা।
উভয়পক্ষের অবস্থান জানার পর প্রথমেই আমার মনে প্রশ্ন উঠলো, ‘আচ্ছা, চিনিকলটা বন্ধ হয়ে গেল কেন? দেশে কি চিনির চাহিদা নেই?’ মাথায় এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল, কারণ চিনির কলটা বন্ধ হয়ে না গেলে তো ওখানে জায়গাও খালি থাকতো না, আখ চাষের পরিবর্তে অন্যকিছুও করা হতো না। ফলে শর্তভঙ্গের প্রশ্নই উঠতো না। সাঁওতালরাও তাদের জমির দাবি নিয়ে ফিরে আসতো না। অতএব, সব সমস্যার মূলে রয়েছে ওই চিনির কল বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশে চিনি উৎপাদনের বর্তমান অবস্থা কী, তা জানার জন্য গুগল করতেই বেশ কিছু প্রতিবেদন চোখে পড়লো। সরকারি চিনিকলে প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচ ৮৮টাকা, সে জায়গায় উৎপাদিত চিনি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৮টাকা দরে। অর্থাৎ সরকারি চিনিকলগুলোতে লোকসান গুনতে হচ্ছে সরকারকে। সরকারের অধীনে বর্তমানে ১৫টি চিনিকল আছে। এগুলোর বার্ষিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার টন। অথচ তারা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চিনি উৎপাদন করেছে মাত্র ৫৮ হাজার টন।

এভাবে প্রতিবছরই নাকি চিনি উৎপাদন কমছে আর বাড়ছে লোকসান। গত পাঁচ বছরেই নাকি এই খাতে লোকসান হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। বছর বছর চিনিশিল্পের লোকসান বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে আখ চাষ উঠিয়ে দেওয়ার কথাও নাকি ভাবছে সরকার। এতক্ষণে আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। হয়তো গাইবান্ধার ওই  মহিমাগঞ্জ চিনি কলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই জানতে ইচ্ছে করছে, সরকারের অধীনে যে অন্য চিনিকলগুলো আছে, সেগুলোর কী অবস্থা? সরকার যদি চিনিকলগুলো চালাতে না পারে, তাহলে তো বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লিজ দিয়ে হলেও চিনি কলগুলো চালু রাখতে পারতো, কারণ চিনির কল চালু থাকলে দেশে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হতো। কল বন্ধ করে দেওয়া মানে, মাথাব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলা। এই সাঁওতাল ইস্যুতে আসলে ভূমি অধিগ্রহণ বা সাঁওতাল দমন নয়, বাংলাদেশের চিনিশিল্পের অবনতিই নগ্নভাবে ধরা পড়েছে আমার চোখে।

আর সরকার যদি আখ চাষ উঠিয়ে দেওয়ার কথাই ভেবে থাকে, তবে আর অধিগ্রহণকৃত জমি ধরে রেখে লাভ কী? শর্ত অনুযায়ী জমির মালিকদের কাছে জমি ফিরিয়ে দেওয়াই তো যুক্তিযুক্ত। একদিন দু’দিন আগে নয়, সেই ২০০৪ সালে বন্ধ হয়েছে চিনির কল। জমির প্রকৃত মালিকরা তো অনেক দীর্ঘ একটা সময় দিয়েছে সরকারকে। সরকার এই সময়ের মধ্যে নতুন করে কল চালুও করতে পারতো, সেটাও করেনি। তার চেয়ে বড় কথা, এ বছরের জুন-জুলাই মাসেই নাকি সাঁওতালরা ওই জমিতে এসে বসতবাড়ি গড়েছে, সরকার চাইলে তো তখনই তাদের ঠেকাতে পারতো। তখন যেহেতু তাদের কেউ ঠেকায়নি, এখন এভাবে উচ্ছেদ করে দেওয়া অন্যায়। এখন বিষয়টি পুরোপুরি একটি আইনি জটিলতা। আদালতের মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করতে হতো। মাঝখান থেকে প্রাণ গেল কয়েকজন সাঁওতালের। এই সমস্যা যে এখানেই মিটে যাবে আমার তা মনে হয় না।

আমার জন্ম উত্তরবঙ্গের জেলা দিনাজপুরে। আমাদের একটি মাটির বাড়ি ছিলো। সেই বাড়ি তৈরি করে দিয়েছিল সাঁওতালরা। ওরা ভীষণ পরিশ্রমী এবং শান্তিপ্রিয়। আমার দাদাবাড়িতে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকটি সাঁওতালপাড়া ও মুশাহারপাড়ার পাশ দিয়ে যেতে হতো। ছোটবেলায় নিয়মিত ওই রাস্তায় যাওয়া-আসা করতাম আমি, কখনও ওদের সঙ্গে কথা হতো না। আবার ওরাও কখনও কথা বলতে আসতো না। ওরা ওদের মতো থাকতো। খুব বেশি কিছু বুঝতাম না, শুধু বুঝতাম ওরা আমাদের চেয়ে একটু আলাদা, ওদের ভাষাও আলাদা। ওদের অনেকেই লেখাপড়া করছে, চাকরি করছে। ওরা ওদের মতো থাকতো। ওদেরও কেউ জ্বালাতো না। এতটা সময় পার করেছি ওই এলাকায়, কখনও শুনিনি বাঙালিদের সঙ্গে ওদের কোনও ঝামেলা হয়েছে।  মোটামুটি শান্তিতেই ছিল আমাদের বসবাস।

খবরে দেখলাম, সেই দিনাজপুরেই নাকি সাঁওতালরা আন্দোলন করছে। গাইবান্ধায় সাঁওতালদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে তারা। হতে পারে এটা কেবল একটা সূত্রপাত। আগামী দিনে হয়তো আরও অনেক নতুন নতুন ইস্যুতে আন্দোলন করবে তারা। প্রশাসন এভাবে তাদের ক্ষেপিয়ে দিয়ে মোটেই ভালো কাজ করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে তো এমনিতেই সারাবছর আন্দোলন চলে, উত্তরবঙ্গটা বেশ শান্ত ছিল। উত্তরবঙ্গের এই নৃগোষ্ঠীদের এভাবে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেওয়া ঠিক হয়নি প্রশাসনের। আইনানুগভাবেই সমাধান করা যেত বিষয়টির। আর তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী তো এমনিতেই অনেকের বাড়ি বানিয়ে দেন, সেখানে সাঁওতালদের মতো পিছিয়ে পড়া ভূমিহীনদের জমি নিয়ে এমন বাড়াবাড়ি কেন সহ্য করছে তার সরকার? তারা জাতীয় দলের কোনও জনপ্রিয় ক্রিকেটার নয় বলেই কি খোলা আকাশের নিচে ঘুমাবে?

লেখক: সাংবাদিক।

 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ