খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন কোন পথে

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:৪৭, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৯, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২০

মোস্তফা হোসেইনবিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দুই বছর ধরে কারাগারে। মুক্তির কোনও লক্ষণ নেই। কখনও আন্দোলনের কথা, কখনও আইনি প্রক্রিয়া কিংবা কখনও যৌথ প্রচেষ্টার কথা বলছেন নেতারা। বাস্তবতা হলো, কোনও কিছুতেই সাফল্য আসেনি, খালেদা জিয়াও মুক্তি পাননি।
এ নিয়ে বিএনপি কি দিকভ্রান্ত? আলোচনায় এসেছে বিএনপি দলীয় আইনজীবীদের দক্ষতা, তাদের আইনি কৌশল, সর্বোপরি তাদের আন্তরিকতা নিয়ে। আর সেটা শুরু থেকেই কিছুটা প্রকাশও হয়ে পড়েছিল। সেখানে আইনজীবীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তিও স্পষ্ট ছিল। অনেকেই নবীন-প্রবীণের দ্বন্দ্ব নিয়েও কথা বলেছেন। আইনজীবীদের গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেও এমনটা অনুমান করা যায়।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের মন্তব্য একরকম, আবার অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্যের ধারা ভিন্নতর। মওদুদ আহমদ ও খন্দকার মাহবুব আইনি প্রক্রিয়ায় সম্ভাবনা বাদ দেওয়ার বিষয়টি জোরালো কণ্ঠেই বলেন। কিন্তু অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও কয়েকজন আইনজীবীর বক্তব্য তাদের সঙ্গে মেলানো যায় না।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যে বোঝা যায়, আইনি কৌশলেও তারা হেরে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সরকার পক্ষের আইনজীবীদের বাধা ও কূটকৌশলের কারণে সেটা আটকে যাচ্ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, চেষ্টা চালিয়ে যাবো। কিন্তু ফয়সালাটা রাজপথেই হতে হবে।’ (সারাবাংলা, ৬ জুন, ২০১৯)।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিপক্ষের আইনজীবী আইনি কৌশল প্রয়োগ করবেন এটাই স্বাভাবিক। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের প্রতিপক্ষ দুদকের আইনজীবী। ওই আইনজীবী বাধা দিলে সেটাও আইনগত পথ অবলম্বন করেই। আর সেজন্য যদি খালেদা জিয়া আটকে যান তাহলে বলতে হবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনার মতো আইনি শক্তি তাদের হাতে নেই। মওদুদ আহমদের উল্লেখিত এই বক্তব্যের পর হয়তো আমরা এমনটাই মনে করতে পারি।

যে যাই বলুক না কেন, সত্য হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি আদায় করতে পারেননি তারা। এখন বাকি থাকে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি। আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে নেতাদের আন্তরিকতাও কি প্রশ্নাতীত? হুমকি-ধমকিও তো কম শোনা যায়নি এ বিষয়ে। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ একাধিক সিনিয়র নেতা ক্ষুব্ধ হয়ে সিনিয়র নেতাদের পদত্যাগ করার আহ্বানও  জানিয়েছিলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও একই কথা একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন। তারা স্পষ্টতই আন্দোলনে ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদ থেকে সরে যেতে বলেছিলেন সিনিয়র নেতাদের। এতে বোঝা যায়, সিনিয়র প্রায় সব নেতাই চান তরুণদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে। আর এমন বক্তব্য আসতে শুরু করেছে সেটাও বছরকাল আগে থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ পর্যন্ত সিনিয়র কোনও নেতা ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে কি পদত্যাগ করেছেন? সিনিয়র নেতারাই সিনিয়র নেতাদের ব্যর্থতার কথা বলেন আবার এর জন্য পদত্যাগেরও আহ্বানও জানান, কিন্তু নিজে পদে বহাল থাকেন। এটা স্ববিরোধী নয় কি?

খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে তাদের প্রচেষ্টা বিভিন্ন মাধ্যমেই হয়েছে। আইনি পথে, আন্দোলনের পথে চেষ্টার পাশাপাশি সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও আমরা ভুলে যাইনি। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭ জন সংসদ সদস্য হলেন বিএনপি থেকে। দল থেকে বলা হলো, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে তারা সংসদে যেতে পারেন না। কিন্তু নির্বাচিতরা একে একে শপথ নিলেন। সংসদ সদস্যরা বললেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা সংসদে যোগ দিয়েছেন। সেখানে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি ও হারুনুর রশিদ এমপি তাদের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করছেন ঠিকই কিন্তু সরকারি দলের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে তাদের কণ্ঠ মিলিয়ে যাচ্ছে।

এরপর গত সিটি নির্বাচনকে তারা বেছে নিলেন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন হিসেবে। সেখানেও সাংগঠনিক দুর্বলতার স্পষ্ট চিত্র আমরা দেখতে পেলাম। আন্দোলনে যেমন সিনিয়র নেতাদের দেখা যায় না, তেমনি নির্বাচনের দিনও দেখা যায়নি। সরকারি দলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগগুলো আমলে নিলেও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নিস্পৃহতা নির্বাচনি আন্দোলনকেও রাজপথের আন্দোলনের মতোই ব্যর্থ করে দিয়েছে।

খালেদা জিয়ার আন্দোলনের স্তরগুলো এভাবে সাজানো যেতে পারে। প্রথমত, তিনি কারাগারে যাওয়ার মুহূর্ত থেকে রাজপথের আন্দোলন, দ্বিতীয়ত, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে, তৃতীয়ত, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, চতুর্থত, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের মাধ্যমে এবং পঞ্চম, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ফলাফল সবাই জানেন।

এরমধ্যে সমঝোতার মাধ্যমেও মুক্তির চেষ্টার কথা শোনা গিয়েছে একসময়। হারুনুর রশিদ খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন। কাজ উপলক্ষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও দেখা করেছেন। তখন শোনা গিয়েছিল তিনি সমঝোতার যোগসূত্র হিসেবে কাজ করছেন। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে থাকে রাজনৈতিক মহলে। এমনকি বিএনপির অভ্যন্তরেও গুরুত্ব পায় বিষয়টি। একজন সিনিয়র নেতার বক্তব্য ছিল, এই মুহূর্তে খালেদা জিয়াকে বিএনপির জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাকে বাঁচানোটাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। একইসঙ্গে তার বক্তব্যে ছিল, সেটা যে মাধ্যমেই হোক, তার মুক্তি প্রয়োজন।

তার বক্তব্যে প্যারোলে মুক্তির সুরই শোনা যাচ্ছিলো। কিন্তু খালেদা জিয়া প্যারোলে বের হওয়ার পক্ষে নন বলে সংবাদ হয়েছে একই সময়।

সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলে এবং চিকিৎসকরা যদি তার চিকিৎসার্থে বাইরে যেতে পরামর্শ দেন তাহলে সরকার বিবেচনাও করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রেও বিএনপি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। 

অধিকাংশ সময়ই বিএনপি নেতাদের আন্দোলনের প্রতি জোর দিতে দেখা যায়। একসময় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে যে বিশাল মাপে মাপা হতো, গত সিটি নির্বাচনের পর হরতালসহ কিছু কর্মসূচির পর সেই শক্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি কী করতে পারে? এই মুহূর্তে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্য মনে আসছে। তিনি জাতীয়তাবাদী মহিলা দল আয়োজিত মানববন্ধনে বলেছিলেন, ‘তাই রোজা রেখে বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য দোয়া করবেন। আর এরপরে রাজপথে নেমে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বেগম জিয়ার মুক্তির পথ প্রশস্ত করবেন।’ (আমাদের সময়, ১৮ মে ২০১৯)।

যেহেতু বুকের তাজা রক্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি তাই কি তারা গয়েশ্বর রায়ের বক্তব্য অনুযায়ী দোয়া করেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবেন?

সঠিক নেতৃত্ব আর সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া কোনও আন্দোলন হয় না। যে দলের মধ্যে চেইন অব কমান্ড থাকে না তাদের আন্দোলনে সাফল্যও আসে না। তাই তাদের খালেদা মুক্তির আন্দোলন করতে হলে সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। স্ববিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। সর্বোপরি দলীয় কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দেখার বিষয় তারা কীভাবে দুর্বলতাগুলো দূর করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ