ধর্ষণ, ধর্ষণের শিকার ও ধর্ষক

Send
বিনয় দত্ত
প্রকাশিত : ১৬:৪১, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৯, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০

বিনয় দত্তআমাদের দেশে ধর্ষক কতজন? হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন। জিজ্ঞেস করছি, আমাদের দেশে ধর্ষক কতজন, বলতে পারেন কেউ? উত্তরটা জানা নেই তো? অসুবিধা নেই। নিকোলাস গ্রোথকে কেউ চেনেন? না চিনলেও অসুবিধা নেই। আমি বলছি, তার পুরো নাম A. Nicholas Groth। তিনি একজন মনোবিজ্ঞানী। যৌন নিপীড়ন বিষয়ে তার কয়েকটি বিখ্যাত বই আছে।
যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ বাড়ার কারণ কী? আমাদের দেশে কেন এত ঘন ঘন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে? এর পেছনে নিশ্চয় অনেক কারণ আছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ধর্ষণ বিষয়ে বা ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গভীর গবেষণা হওয়া উচিত। এই গবেষণার বিষয়টি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। হয়নি, কারণ আমাদের দেশে ‘গবেষণা’ শব্দটি অবহেলিত। তাই গবেষণায় কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এ কারণেই আমাদের সবসময় বাইরের তথ্য-উপাত্ত বা ক্রিমিনাল সাইকোলজি বা ধর্ষকদের মনস্তত্ত্বের উদাহরণ বা রেফারেন্স দিতে হয়।
মধুমিতা পান্ডে নামের একজন ভারতীয় গবেষক আছেন, যিনি অপরাধ বিজ্ঞান বিষয়ে কাজ করেন। সেই বিষয়ের একটি অংশ হলো ক্রিমিনাল সাইকোলজি। তা নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, তিনি ধর্ষকদের নিয়ে কাজ করেন।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভারতে ডাক্তারিপড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়। তার নাম দেওয়া হয় নির্ভয়া। সেই নির্ভয়া ধর্ষণে পুরো ভারত ফুঁসে উঠেছিল। তার পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে নয়াদিল্লির তিহার কারাগারে থাকা ধর্ষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন কারাগারে ঘুরে তিনি ১০০ জন ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নেন।

এই দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ তিনি সম্পন্ন করেন তার পিএইচডি গবেষণার জন্য। ২০১৮ সালের আগস্টে ফার্স্টপোস্ট অনলাইন ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে মধুমিতা পান্ডে ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেন। মধুমিতা বলেন, ‘ধর্ষণকারীদের পশু বলা, জানোয়ার বলা, দানব বলা সমস্যার সমাধান নয়। তাতে আমরা সমাজের ভালো মানুষ, আমরা ধর্ষণের জন্য দায়ী নই, আর ওরা হলো জন্তু-জানোয়ার, ওরা দায়ী—এ রকম একটা সহজ দায়মুক্তির ধারণা চলে আসে। ধর্ষণ একটা লম্বা সুতা, যার এক প্রান্তে আছে ধর্ষণ নামের ক্রিয়াটি। কিন্তু এটা শুরু হয়েছে সমাজের বিভিন্ন অনুষঙ্গ থেকে। নারীকে অধস্তন হিসেবে দেখা, ইভটিজিং, নারীবিদ্বেষী কৌতুক, নারীকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলা, হয়রানি—এসব কম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানই শেষমেশ ধর্ষণে গিয়ে পৌঁছায়।’

বিষয়টি খুব লক্ষণীয়। গবেষক মধুমিতা পান্ডে যেসব উপাদানের কথা বলেছেন, তার একটিও যে আমাদের দেশে হয় না, এই কথা কেউ বলতে পারবেন? পারবেন না। বরং ‘তাচ্ছিল্য’ করে কথা বলাটা সবচেয়ে বেশি হয় এবং সবাই এই কাজটি সজ্ঞানে করতে চাই। আমি এর প্রমাণ দেবো একটু পরে।

এসব উপাদানই একটির সঙ্গে আরেকটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি ধাপ পার করে আরেকটি ধাপে পা রেখে মানুষের সাহস বাড়ে। সাহস বাড়লে মানুষ অপরাধপ্রবণ কাজ করে বা অপরাধের সঙ্গে লিপ্ত হতে চায়। এই চাওয়াটাই একসময় ধর্ষণের মতো ভয়ানক ঘটনা ঘটায়।

২.

লেখার শুরুতেই মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস গ্রোথের কথা বলেছিলাম। গ্রোথ ধর্ষকদের প্রকারভেদ করেছেন তিনটি। যা গ্রোথ টাইপোলজি নামে পরিচিত।

১। Power rapist (পাওয়ার রেপিস্ট)

২। Anger rapist (অ্যাংগার রেপিস্ট)

৩। Sadistic rapist (স্যাডিস্টিক রেপিস্ট)।

এই তিন টাইপের ধর্ষকের আলাদা ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন। এসব ব্যাখ্যা আমার ধারণা আমাদের দেশে যারা মানবাধিকার সংস্থা সংশ্লিষ্টরাও পড়েননি। শুনে কষ্ট লাগছে? প্লিজ কষ্ট পাবেন না। যদি পড়তেন, তাহলে ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিশদে গবেষণা বের হতো। তা দিয়ে আমরা কাজ করতে পারতাম।

আর সরকারি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কথা তো এইখানে আসবেই না। তারা প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। যেকোনও ধরনের ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর তাদের কোনও কার্যক্রম বা কোনও কর্মকাণ্ড বা কোনও ছোট পদক্ষেপ কি কেউ পেয়েছেন বা দেখেছেন? পাবেন না এবং দেখবেনও না। কেন পাবেন না, সেই আলোচনা অনেক বড়। কেন একজন পুুরুষ ধর্ষক হয়ে ওঠে, সেই ব্যাখ্যায় ফিরে যাই।
বলছিলাম, গ্রোথ টাইপোলজির কথা।
Power rapist (পাওয়ার রেপিস্ট): এ ধরনের ধর্ষকরা নিজেদের সবদিক থেকে ক্ষমতাবান হিসেবে প্রমাণ করতে চায় এবং করেও। তারা সবসময় ক্ষমতাকে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। সে ক্ষমতা নিজের কি না, তা দেখার বিষয় নয়। ব্যক্তিজীবনেও তারা সবসময় ক্ষমতার ফ্যান্টাসিতে ভোগে। ক্ষমতার ফ্যান্টাসিতে থেকে তারা ধর্ষণের মতো কঠিন অপরাধ করেও তা ক্ষমতা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। যেকোনও কিছুতেই তাদের ধর্ষক প্রবৃত্তি জেগে ওঠে বা তারা জাগিয়ে তোলে। ধারণা করা হয়, এ ধরনের ধর্ষক আমাদের দেশে বেশি।

যেমন, বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রীর ধর্ষণের মামলার মূল আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ, বগুড়ায় ছাত্রীকে ধর্ষণের পর মারপিট এবং নির্যাতনের পর ধর্ষণের শিকার নারীর ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় অভিযুক্ত তুফান সরকার—এরা সবাই মূলত Power rapist (পাওয়ার রেপিস্ট)।

Anger rapist (অ্যাঙ্গার রেপিস্ট): এ ধরনের ধর্ষকরা ক্রোধ বা রাগকে ধর্ষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। প্রতিশোধের আশায়, কোনও কিছু নিষেধ করেছে, তা সহ্য করতে না পেরে, অন্যায়কে ন্যায় ভেবে তারা যেকোনও সময়, যেকোনও ইস্যুতে ধর্ষক হয়ে ওঠে বা তাদের ধর্ষক প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে। ছোটবেলায় তারা অবহেলিত, নিগৃহীত থাকলেও বড় হতে হতে তাদের মধ্যে সেই অবহেলা ক্রোধে রূপ নেয়। অনেকটা সিনেমার মতো, ‘তুই ছোটবেলায় আমাকে এই করেছিলি আমি এখন এই করবো।’ কার ওপর করছে তা বিষয় নয়, কী করছে তাই বিষয়। তাদের ধর্ষক মন মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না।

যেমন, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিন, গেণ্ডারিয়ায় ছোট আয়েশাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত নাহিদ—এ ধরনের ধর্ষকরা সবাই মূলত Anger rapist (অ্যাঙ্গার রেপিস্ট)।

Sadistic rapist (স্যাডিস্টিক রেপিস্ট): এ ধরনের ধর্ষকরা শুধু যে ধর্ষণ করে তা নয়, ধর্ষণের পর বিভিন্ন অদ্ভুত কারণে তারা ভিকটিমের ওপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। ভিকটিম বা ধর্ষিতাকে কষ্ট দেওয়ার মাঝে তারা এক ধরনের পাশবিক সুখ খুঁজে পায়। এতে ধর্ষিতা বা ভিকটিম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। যেমন, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে পাঁচ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর শুরু হয় পাশবিক নির্যাতন, যা অবর্ণনীয়। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম, ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার নারীলিপ্সার শিকার। এর ধরনের ধর্ষকরা সবাই Sadistic rapist (স্যাডিস্টিক রেপিস্ট)।

নিকোলাস গ্রোথের টাইপের বাইরে আরেক ধরনের ধর্ষকের কথা জানা যায়। এরা হলো The Power-reassurance rapist or Opportunity Rapist (দ্য পাওয়ার-রিজ্যুরেন্স রেপিস্ট বা অপরচুনেটি রেপিস্ট)। এরা সবচেয়ে ভয়ানক। এরা সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকে, কিন্তু তাদের চেনা যায় না। কখনও কখনও এরা সবার বিশ্বাস নিয়েও খেলে। মাদ্রাসার শিক্ষক থেকে শুরু করে বাসের হেলপার, ড্রাইভার বা সিরিয়াল রেপিস্ট—সবাই এই টাইপের মধ্যে পড়ে।

যেমন, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বায়তুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা আল-আমিন ১২ জন শিশুছাত্রীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবুল খায়ের বেলালী আট জন শিশুকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। রাজধানীর দক্ষিণখানের একটি মসজিদের ইমাম ইদ্রিস আহম্মেদ পাঁচ জন নারীকে ধর্ষণ এবং ১০ থেকে ১২ জন ছাত্রকে ধর্ষণের  কথা স্বীকার করেছে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ধর্ষণে অভিযুক্ত মজনু—এরা সবাই The Power-reassurance rapist or Opportunity Rapist (দ্য পাওয়ার-রিজ্যুরেন্স রেপিস্ট বা অপরচুনেটি রেপিস্ট)। এই ধরনের ধর্ষকরা সমাজের অংশ হিসেবে থাকে। তাদের কখনও চেনা যায়, কখনও চেনা যায় না। সুযোগ মতো তাদের ধর্ষক প্রবৃত্তি তারা জাগিয়ে তোলে।

৩.

এবার গবেষক মধুমিতা পান্ডের সেই ‘তাচ্ছিল্য’ করা নিয়ে বলি। কয়েকদিন আগে আমার বাসার পাশে ওয়াজ মাহফিল হয়েছে। সেই ওয়াজে বক্তা জোর গলায় চিৎকার করে বলছেন, এসব বেলেল্লাপনা বন্ধ করতে হবে। আর সবাই তাতে সায় দিচ্ছেন। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শুনলাম, যেখানে ধর্মীয় কথা বলার কথা সেই জায়গায় একজন নারীর বেশভূষা, চালচলন, আচার-ব্যবহার নিয়ে বক্তা অনেক দীর্ঘ সময়জুড়ে চিৎকার করে বক্তব্য দিচ্ছেন। সেই বক্তব্য সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছেন।

আমার প্রশ্ন হলো, এই বক্তা কি নারীর বেশভূষা, চালচলন, আচার-ব্যবহার দেখার এবং বলার জন্য এখানে বসেছেন? শুধু এখানে নয়, সব জায়গায় ওয়াজে নারীর বেশভূষা, চালচলন, আচার-ব্যবহার নিয়ে কথা বলা হয়। কেন? একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কীভাবে চলবেন, তা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেই ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়েছে?  একজন নারীকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? কেউ দেয়নি।

তাচ্ছিল্য করে কথা বললে কী হয়? এর ফলে  বাকিরা যারা শুনছেন, তারা কেউই আর নারীর প্রতি শ্রদ্ধা বা সম্মান দেখান না। ফলে নারীর প্রতি তাদের মধ্যে এক ধরনের বিতৃষ্ণা, ঘৃণা, ক্ষোভ, ক্রোধ জেগে ওঠে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ঘৃণা, ক্ষোভ, ক্রোধ সংক্রমিত করে অন্যদের। এভাবে নিজের অজান্তেই তারা ধর্ষক তৈরি করে।

শুরুতেই জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের দেশে ধর্ষক কতজন? ২০১৯ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পেছনে এক হাজার ৪১৩ জন বা এর বেশি অভিযুক্ত রয়েছে। এই অভিযুক্তরাই ধর্ষক হিসেবে সমাজে প্রমাণিত হচ্ছে, হবে।

এই প্রমাণিত হওয়া ধর্ষকদের যদি গণমাধ্যমে বারবার দেখানো হয়, যদি ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়, যদি ধর্ষণ, ধর্ষণের শিকার, ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা হয়, যদি প্রতিটি ছেলে সন্তানকে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান দেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়, যদি ওয়াজে নারীদের তাচ্ছিল্য করে কথা বলা বন্ধ করা হয়, তাহলে ধর্ষণ কমতে বাধ্য।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ