‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৭:১৪, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৪, আগস্ট ১৪, ২০২০

শান্তনু চৌধুরীদেশের বিভিন্ন স্থানে হাটে, বাজারে, দেয়ালে, পোস্টার, লিফলেট, বিলবোর্ড বা মাইকিংয়ে পুলিশ যে কথাটি বলে থাকেন তা হলো, পুলিশ জনগণের বন্ধু। যেকোনও নিরাপত্তার প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিন। এ কথাটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারে কাগুজে বলেই মনে হয়। কারণ, একান্ত বাধ্য না হলে থানার সামনে দিয়ে কানাও হাঁটে না বলে শোনা যায়। আবার বাধ্য হয়ে যারা কখনও পুলিশের খপ্পরে(!) পড়েছেন তারাই বুঝেছেন পুলিশ ছুঁলে কত ঘা। কিন্তু উপায় তো নেই, জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ওপরই দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদের কয়েকজন রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন। আজ যদি অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে পুলিশের গুলিতে হত্যা করা না হতো তাহলে কী এতটা সত্য উদঘাটনে রাষ্ট্র বা আইন আগ্রহী হতো, তা কখনও মনে হয় না। বিগত সময়গুলোতে কত হাজার হাজার মানুষ যে বেআইনিভাবে ক্রসফায়ার নামক ‘সাজানো গল্পে’ পড়ে জীবন হারিয়েছেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই। এই আমরাই, ফেসবুকীয় সমাজ অনেক সময় সেটিকে সাধুবাদ জানিয়েছি। বলছি না কথিত ক্রসফায়ারে যারা মারা গেছেন সবাই সাধু ব্যক্তি। কিন্তু নিরপরাধ মানুষ মারা যাওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রোষানলে পড়ে জীবন হারিয়েছেন এমন ঘটনাও বিরল নয়। ২০১৮ সালে কক্সবাজারের এক কমিশনার একরামের ফোনের কান্না আর তার মেয়ের জানতে চাওয়া ‌‘আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে’ এখনও অনেকের আত্মায় শেলের মতো বিঁধে। কিন্তু এরপরও এসব দৃশ্য ঘটনা হারিয়ে যায়। তার কারণ, এ দেশে নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা রয়েছে তারা সমস্ত বিচারের ঊর্ধ্বে উঠে যায় যেন! কিছু দিন পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হয়, তারপর সব চুপ। আরও আরও বড় ঘটনা এসে রাষ্ট্রের কাছে, সংবাদমাধ্যমের কাছে আপাত ছোট ঘটনাটি চাপা দিয়ে দেয়। বড় বড় অপরাধীর বাইরেও শুধু পুলিশের ঘুষের আবদার মেটাতে না পারায় কতজনের জীবন যে বলি হতে হয়েছে তার খবরই বা কে রাখে। সাক্ষী, প্রমাণের অভাবে সেসব ঘটনার মামলাও আর আগায় না। পুলিশ বা র‌্যাবের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে যাবে এমন বুকের পাটা কারই বা আছে। কারণ, আইন তো বাদী পক্ষের অন্তরাত্মার আর্তি শুনতে চাইবে না, আইন চাই জলজ্যান্ত সাক্ষী প্রমাণ।

এই যে চার মাস আগের ঘটনাই যদি বলি, বরগুনার আমতলী থানার ওসির রুম থেকে ঝুলন্ত উদ্ধার করা হয় শানু হালদার নামে এক ব্যক্তির, নিহতের পরিবারের দাবি, তিন লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় হত্যা করা হয় তাকে। প্রতিবাদে থানা ঘেরাও করেন এলাকাবাসী। এক মাস আগে গাজীপুরে পুলিশ হেফাজতে মারা যান এক নারী। পরিবারের দাবি, স্বামীকে না পেয়ে ইয়াসমিনকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে পুলিশ। এছাড়া ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ২৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগে চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামি থানার ওসিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা, ফেনীর নুসরাতের জবানবন্দি রেকর্ড করে ওসি মোয়াজ্জেমের ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত।

এই যে ওসি প্রদীপ বা এস আই লিয়াকতের বিরুদ্ধে একের পর এক অন্ধকারের কাহিনি বের হয়ে আসছে, সেসব তো আর একদিনে তৈরি হয়নি। প্রদীপের বিরুদ্ধে পুলিশের সদর দফতর থেকে শুরু করে বিভিন্ন থানায়, আদালতে অভিযোগও কম নয়। কিন্তু নিজ দফতরের কর্তাব্যক্তিদের প্রশ্রয় পেয়ে পেয়ে সে আরও দানব হয়ে উঠেছে যেন। রাষ্ট্র তাকে বারবার পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এমনকি তাকে যে কারণে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে সেগুলো নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। তাহলে বিচার করবে কে? অপরাধের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততা নতুন কিছু নয়। একটা সময় ছিল মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা অপরাধীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতো আর এখন পুলিশের কিছু কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এ কাজটি করছেন। আবার অনেক পুলিশ একসময় ঘুষ খেতো আকারে ইঙ্গিতে, হাত কচলিয়ে। আর এখন রীতিমতো দরদাম করে। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া।

সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর একের পর এক ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে টেকনাফের মানুষ অভিযোগ করে যাচ্ছেন ক্রসফায়ার করার বা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের। সবচেয়ে হাস্যকর কথা হচ্ছে, নতুন আসা টেকনাফ থানার ওসি প্রশ্ন তুলেছেন, এসব অভিযোগ আগে করেননি কেন? অভিযোগ কার কাছে করবে? যার কাছে করবে তিনিই তো প্রদীপের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা। আর গ্রামের এসব সরল মানুষদের দৌড়ই বা কতটুকু পর্যন্ত।

প্রতিদিন পুলিশের অপরাধের ক্ষেত্রে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মাত্রা। জনগণের জন্য তোলা থাকা চড় থাপ্পড় বা কিল ঘুষিতো স্বাভাবিক বিষয়, এর বাইরে থানায় এনে মারা। সন্দেহজনক মনে হলেই আধমরা করা, আর এদের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে কত সাংবাদিকের জীবন যে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বিচারের বাণী নীরবেই কাঁদে। মানববন্ধন আর মৌন মিছিলেই সীমাবদ্ধ। পুলিশ যেন অপরাধ করলে পদোন্নতি হয়। বিশেষ করে সমাজে নাম ডাক আছে, সরকারের কাজের সমালোচনা করে এমন কেউ হলেতো কথাই নেই। কিন্তু অপরাধ করে পুলিশ বড় ধরনের সাজা পেয়েছেন তেমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। একটু পেছনে যদি তাকাই, পুলিশ কর্মকর্তা মোল্লা নজরুলের ঘুষ নেওয়ার ঘটনা সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ার পরও তার শাস্তি হয়নি। এসপি হারুণকে নিয়ে বিতর্ক থাকার পরও তিনি বারবার পুরস্কৃত হয়েছেন। অনেক চাপের পর কোনও কোনও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও তার সাজা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। চট্টগ্রামে মাহমুদা খাতুন মিতুকে হত্যার ঘটনায় তার স্বামী এসপি বাবুল আক্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। যদি তিনি স্ত্রী হত্যায় জড়িতই থাকেন তাহলে পদত্যাগের সুযোগ কেন এই প্রশ্ন থেকেই যায়। ১৯৯৮ সালে ডিবি হেফাজতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুবেল হত্যায় ডিবির তখনকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আকরাম হোসেনকেও আইনের আওতায় আনতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। বিচারিক আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে খালাস পান। যেটি সাধারণত হয়ে থাকে, পুলিশ অপরাধ করলেও তাকে বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যেই শাস্তি সীমিত থাকে। পরে সে কোনও না কোনোভাবে ম্যানেজ করে ফেলে। মন্দ লোকেরা বলে থাকেন, এতেও নাকি চলে টাকার খেলা! প্রতিবার পুলিশের নতুন আইজি বা কমিশনার এলে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। যেটিতে একটি কমন প্রশ্ন থাকে পুলিশের অপরাধের বিরুদ্ধে। আর সেটিরও একটি সাধারণ উত্তর থাকে, ব্যক্তিগতভাবে কোনও পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তার দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। আর অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি।

অথচ যতটুকু জানি, চাকরিতে যোগদানের মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী দিনে কখনও নীতিভ্রষ্ট না হওয়ার শপথ নেন পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু কিছু কিছু সদস্য সেই নীতির কথা ভুলে যান। হয়ে ওঠেন দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক। আর মানুষের কাছে ভয়ের প্রতিরূপ। আবার এর পেছনে রাজনীতি একটি বড় ভূমিকা রাখে। যেহেতু ক্ষমতাসীনরা পুলিশকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য, সে কারণে তারাও সুবিধা নেয়। আবার কোনও কোনও পুলিশের দেখা যায় রাজনৈতিক ‘গডফাদার’ রয়েছে। তাদের ওপর মহলে কানেকশন ভালো। সে প্রেক্ষাপটে থানার অনেক ওসিও পুলিশ কমিশনারকে গণ্যই করে না।

পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য কোনও কোনও সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা যে সচেষ্ট হন না তা নয়। কিন্তু খারাপের দাপটে ভালোরা কূল খুঁজে পান না। নইলে করোনাকালে মানুষের পাশে যেভাবে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল বা এখনও রয়েছে, সেটিকে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছে। কিন্তু কিছু ঘটনা এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে, ভালো অর্জনকে ম্লান করে দেয়। গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, দেশের ৬৬০টি থানার মধ্যে শতাধিক থানার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত এসব পুলিশকে খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু যেটি বললাম, প্রত্যাহার আর বদলিতে সীমাবদ্ধ শাস্তি, তাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হয়ে ওঠেন ভয়ঙ্কর। এর প্রতিকার একমাত্র রাষ্ট্রের হাতে। কারণ, ধরতে গেলে ‘ব্রিটিশ আমল’ থেকে যখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের পেটাতো আর শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতো, ‘পুলিশ তুমি যতোই মারো বেতন তোমার ৩১২’, সেই সময় থেকে বদনাম রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তাই দুর্নাম হয়তো একদিনে ঘোচানো সম্ভব নয়। কিন্তু যেটি সম্ভব তা হলো, পুলিশ সদর দফতরের সতর্ক তদারকি। সেটি যদি সর্বোতভাবে করা যায় পুলিশ অপরাধে জড়ানোর সাহস পাবে না। আর শাস্তির বিষয় নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে বিশেষ করে কর্মকর্তা আর মাঠ পর্যায়ের পুলিশের মধ্যে, সেটিও কীভাবে সামঞ্জস্য করা যায় তা দেখতে হবে। এখানে দুদক বা নিজেদের বিভাগের অপরাধ তদন্ত যারা করেন তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কারণ, একজন পুলিশ সদস্য তার পদমর্যাদার বাইরে গিয়ে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হন সেটি নজর রাখা জরুরি। বেতন বা পারিবারিক সম্পত্তির বাইরে দেখা যাচ্ছে পুলিশে যোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন। আবার এর সঙ্গে জড়িত নিয়োগ বাণিজ্যও। পুলিশে যোগ দিতে গেলে যে ঘুষ দিতে হয় অনেক ক্ষেত্রে সেটিও নতুন করে ঘুষ বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে। কথা হচ্ছে, সমস্যার সমাধান তো করা যায়, কিন্তু এমন যদি হয়, সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেবো কোথা! তবে? সেই দায়িত্ব নিতে হবে খোদ রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X