‘বজ্রপাত, আকাশে গর্জন, শিলাবৃষ্টি, ভারী বৃষ্টিপাত ও কাল বৈশাখীর কারণে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কৃষকের সবজি ক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। চৈত্র মাসে এমন ভয়ানক অবস্থা গত ৪০ বছরে কখনও দেখিনি, যা ঘটে গেল।’ লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শিয়ালখোয়া এলাকার শিক্ষক ও কৃষক আব্দুল হাকিম বাংলা ট্রিবিউনকে এই কথা বলেন।
শুক্রবার লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড়ে শিলা বৃষ্টিসহ প্রবল ঝড় বয়ে গেছে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলার কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধা উপজেলায় শিলা বৃষ্টি এবং লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী ও পাটগ্রাম উপজেলায় হালকা শিলা বৃষ্টিসহ ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে থাকায় এবং থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে লালমনিরহাট জেলা।
শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় (এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে জেলার কোথাও প্রাণহানির মতো কোনও খবর পাওয়া যায়নি। সবজি ক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে লালমনিরহাট কৃষি বিভাগ।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদফতরের উপপরিচালক বিধু ভূষণ রায় বলেন, 'স্থানীয় উপকৃষি কর্মকর্তাদেরকে কৃষকের ফসলের ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ-খবর নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, 'কৃষি বিভাগ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। আকাশের অবস্থার উন্নতি ঘটলে ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। প্রাথমিকভাবে সবজি ক্ষেত, আম, লিচুর মুকুলসহ বিভিন্ন প্রকার ফসলের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সাগরিকা পারভীন ও পাটগ্রাম বাউরা ইউনিয়নের জমগ্রাম এলাকার ইনাম প্রামাণিক বলেন, ‘এমন শিলাবৃষ্টি কখনো দেখিনি। চৈত্রমাসে কাল বৈশাখী ঝড় কি জলবায়ু পরিবর্তনের আলামত? সময় এসেছে ছয় ঋতুর বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ে গবেষণা করার। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন ঘটলে কৃষিতে মারাত্মক দুর্যোগ নেমে আসতে পারে।’
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবল শিলা বৃষ্টি আর ঝড়ে পাকা গম ও আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১১টায় আধ ঘণ্টার ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে মাটির খড়ের তৈরি কাঁচা বাড়িঘরেরও ক্ষয়ক্ষতির কথা জানা গেছে।
কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাস গরম ও ধুলাবালি থেকে মানুষকে স্বস্তি এনে দিলেও কৃষকের ক্ষতি হয়েছে।ঝড়ে জেলার ৫টি উপজেলার তিন হাজার ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়ার খবর পাওয়া গেছে বিভিন্ন সূত্রে। সড়কে গাছপালা ভেঙে পড়ে ও বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ায় জনজীবন ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আফতাব আহমেদ বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করার কাজ করা হচ্ছে।’
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলার ফুলবাড়ী উপজেলায় শিলাবৃষ্টিতে ফসল ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার (৩০ মার্চ) সকালে প্রায় আধ ঘন্টারও বেশি এই প্রাকৃতিক তাণ্ডব ঘটে। শিলাবৃষ্টির কারণে উপজেলার বিভিন্ন ফসল আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি সবজি,আম,ভুট্টা ও লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি শিলাবৃষ্টি পড়েছে। এ উপজেলার হাড়িভাসা, হাফিজাবাদ, কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার হাইব্রিড টমেটো ও তরমুজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝরে গেছে আম ও লিচু বাগানের গাছের মুকুল। এছাড়া গম ও ভূট্টা ক্ষেতেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
শুক্রবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়। এই সময় প্রচুর পরিমাণে শিলাবৃষ্টি পড়ে। জেলা সদরে ৩৭ মিলিমিটার শিলাবৃষ্টি রেকর্ড করে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
জেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের কৃষক নুরুজ্জামান জানান, তার টমেটো ও তরমুজ ক্ষেতের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
জেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের আজিজার রহমান জানান, আম বাগানের অধিকাংশ আমের মুকুল পড়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামছুল হক শিলাবৃষ্টি ফল ও ফসলের ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও ‘তাৎক্ষণিক ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি। মাঠে উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা করছেন বলে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
‘শিলত ধানের গাছ ভাঙ্গি গেইছে, আবাদ না হইলে কি খায়া বাচিম!’
রংপুরে বজ্রাঘাতে দুই জনের মৃত্যু








