স্বামীর সঙ্গে তর্ক, বাসচালককে অফিসে ডেকে পেটানোর অভিযোগ এএসপির বিরুদ্ধে

রাজশাহী প্রতিনিধি
০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৬আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৯

নওগাঁয় সিটবিহীন টিকিটে স্বামীর বাসযাত্রাকে কেন্দ্র করে তর্কের জেরে এক বাসের চালককে ডেকে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি, সাপাহার সার্কেল) শ্যামলী রানী বর্মণের বিরুদ্ধে।

রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় সাপাহার সার্কেল অফিসে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ওইদিন সকাল সাড়ে ৯টায় সাপাহার থেকে রাজশাহীগামী ‘হিমাচল’ পরিবহনে ধানসুরা যাওয়ার পথে বাসচালক ও সুপারভাইজারের সঙ্গে তর্কে জড়ান শ্যামলী রানী বর্মণের স্বামী জয়ন্ত বর্মন।

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রাজশাহীগামী হিমাচল পরিবহনের একটি বাস রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সাপাহার থেকে ছেড়ে যায়। রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের ওই বাসে যাত্রী হয়ে ধানসুরা নামার উদ্দেশ্যে সিটবিহীন টিকিট কেটে উঠেছিলেন শ্যামলীর স্বামী কলেজশিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ। বাসটি দিঘার মোড়ে পৌঁছালে ওই স্টপেজ থেকে রাজশাহীগামী যাত্রীর যেই সিটে জয়ন্ত বর্মণ বসেছিলেন সেটি থেকে উঠে যেতে অনুরোধ করেন সুপারভাইজার সিয়াম। ওই সময় নিজেকে সার্কেল এসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে সুপারভাইজারকে হুমকি দিতে শুরু করেন জয়ন্ত। একপর্যায়ে সৃষ্ট তর্ক বাড়তে থাকলে সিট ছেড়ে দিয়ে বাসচালক বাদলের কাছে এগিয়ে যান জয়ন্ত। চালকের সঙ্গে চলে তুমুল বাকবিতণ্ডা। এরপর নির্ধারিত গন্তব্য ধানসুরায় নেমে যাওয়ার আগে চালক ও সুপারভাইজারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান জয়ন্ত বর্মণ।

তারা আরও জানান, জয়ন্ত গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার পর সাপাহারের টিকিট মাস্টারকে অফিসে ডেকে নেন শ্যামলী রানী বর্মণ। টিকিট মাস্টারের ব্যবহৃত ফোন থেকে বাসচালক বাদলকে কল করেন তিনি। এরপর চালক ও সুপারভাইজারকে হুমকি ধামকি দেন। যাত্রাপথে বারবার শ্যামলী রানী বর্মণের কল আসায় বাসটি নির্ধারিত সময়ে রাজশাহী পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করে। পরে রাত ১০টায় হিমাচল পরিবহনের ওই বাস পুনরায় সাপাহারে ফিরলে চালককে বাসস্ট্যান্ড থেকে অফিসে ডেকে নেন শ্যামলী। সেখানে পৌঁছানোর পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাসচালক বাদলের পেটে প্রথমেই সজোরে লাথি দেন শ্যামলী। বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন তার স্বামী জয়ন্ত বর্মণও। এরপর শ্যামলী রানী বর্মণের নির্দেশে তার দেহরক্ষী আনন্দ বর্মণ পাইপ দিয়ে চালককে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন।

জানা যায়, পরে আহত অবস্থায় বাদল জ্ঞান হারালে সাপাহারের কোনও হাসপাতালে চিকিৎসা না নেওয়ার শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে পরের দিন সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে রাজশাহীতে ফিরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বাসচালক বাদল।

ভুক্তভোগী বাসচালক বাদল বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় বিশ্রামে আছেন। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে নির্যাতনের শিকার চালক বাদল বলেন, ‘এএসপি (শ্যামলী রানী বর্মণ) ম্যাডাম ও ওনার স্বামী (জয়ন্ত বর্মন) আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে শরীরের গোপন জায়গাগুলোতে মেরেছে। উনি (শ্যামলী রানী বর্মণ) বডিগার্ডকে বললেন, “মাইরা হাত পা ভেঙে দে।” তারপর বডিগার্ড আমাকে এসএস পাইপ দিয়ে ইচ্ছেমতো পিটিয়েছে। আমি এর বিচার চাই। শ্রমিক বলে আমরা কি মানুষ না?’

রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় ওই বাসে রাজশাহীর যাত্রী হিসেবে ছিলেন স্কুলশিক্ষক নাসির। ওইদিনের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষিত মানুষ হয়েও জয়ন্ত বর্মণ যে আচরণ করলেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সহকারী পুলিশ সুপারের স্বামী পরিচয় দিয়ে তিনি ওই বাসের ড্রাইভারের কাগজপত্র যে ভাষায় দেখতে চাইলেন ও হুমকি দিলেন তা রীতিমতো শাস্তিযোগ্য বলে মনে হয়েছে। ফোনে এএসপি শ্যামলী রানীও অনেক হুমকি দিয়েছেন।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী রাজশাহী কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সজীব বলেন, ‘জয়ন্ত বর্মণ স্ত্রীর ক্ষমতা দেখিয়ে খুবই বাজে আচরণ করেছেন। বাসের মধ্যে মনে হচ্ছিল তিনি ড্রাইভার আর সুপারভাইজারকে মেরেই ফেলবেন। বারবার তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন। তার এত পাওয়ার তো প্রাইভেট গাড়িতে চললেই হয়।’

এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, ‘আমাদের বাসের এক চালককে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে সার্কেল এসপি শ্যামলী রানী বর্মণ নির্যাতন করার পর থেকে স্থানীয় বাসমালিক ও শ্রমিকদের মাঝে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি (শ্যামলী রানী বর্মণ) আমাদের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেছেন। আমরা অবিলম্বে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি। অন্যথায় হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মণ বলেন, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে ফোনে অন কলে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার বিষয়টি আমি নিজে শুনেছি। পরে ড্রাইভার ও সুপারভাইজারকে রাতে অফিসে ডাকা হয়েছিল। ড্রাইভার এসে স্যরি বললেও সুপারভাইজার আসেননি। পরে মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। কাউকে মারধরের অভিযোগ সত্য নয়। এসব গুজব রটানো হচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে কথা হলে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাপাহার সার্কেল এসপি কাউকে মারধর করেছেন এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। একজন শ্রমিকনেতা এসব প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছেন। তারপরেও কেউ তার দ্বারা মারধরের শিকার হয়ে থাকলে আমাদের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন।’

/এমএএ/
সম্পর্কিত
থানার ভেতরে আটকে বিএনপি নেতাকে মারলো কারা?
বাসা থেকে পুলিশ কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার
সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় সাভার থানার ওসি প্রত্যাহার
সর্বশেষ খবর
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
২০০ টাকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ
২০০ টাকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
আসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
শিশু রামিসা হত্যা মামলাআসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী