X
সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২
২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

আনিসুর রহমান স্বপন, বরিশাল
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১১:৩০আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১১:৩৮

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

স্বাধীনতার পর ৪৫ কেটে গেলেও এখনও চিহ্নিত হয়নি বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের ৭০ ভাগ বধ্যভূমি। এমনকি তৈরি হয়নি শহীদদের তালিকাও । তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের গবেষকদের দাবি, বরিশালের ১০ উপজেলা,  পিরোজপুর ও ঝালকাঠীর বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে অন্তত ৬৮টি বধ্যভূমির সন্ধান তারা পেয়েছেন।

এ অঞ্চলে ’জেনোসাইড স্টাডিজ’ প্রকল্পের গবেষক সুশান্ত ঘোষ জানিয়েছেন, বরিশাল অঞ্চলে ৬৮টি বধ্যভূমির মধ্যে বরিশাল জেলার সদরে ৩, গৌরনদীতে ৪, আগৈলঝাড়ায় ৬, বাকেরগঞ্জে ৩, বানারীপাড়ায় ৫, বাবুগঞ্জে ২, উজিরপুরে ৫, মুলাদীতে ২, মেহেন্দীগঞ্জে ৩টি সহ ৩৩ টি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া ঝালকাঠীতে ৯টি, পিরোজপুরে ২৬টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা গেছে।

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

তিনি বলেন, এই ৬৮টি বধ্যভূমিতে নিহতদের সম্ভাব্য সংখ্যা নিরূপণ করা মুশকিল।  তারপরেও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, স্মৃতিচারণ, ঘটনার বিবরণ বিশ্লেষণ করে শহীদের সম্ভাব্য সংখ্যা ১০-১৫ হাজার মতে পারে। এই বধ্যভূমির বাইরেও অসংখ্য মানুষ হানাদার বাহিনীর হত্যার শিকার হয়েছেন। এই শহীদদের সংখ্যা বধ্যভূমিতে নিহতের সংখ্যায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে।

গবেষক সুশান্ত ঘোষ স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার  রিপোর্ট, সাংবাদিক বিধান সরকার ও বাপ্পী মজুমদারের করা গণহত্যা স্থলের জরিপ ও সাক্ষাৎকার এবং দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার বিবরণ প্রভৃতির ভিত্তিতে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের পরে  জেলাওয়ারী  গণহত্যার হিসেবে বরিশাল জেলায় শহীদের আনুমানিক সংখ্যা হবে ২৫ হাজার ।

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

এসব শহীদ ছাড়াও পরবর্তীতে আহত অনেকে মারা যান। ট্রমায় আক্রান্ত হয়েও অনেকের জীবন দীপ নিভে যায়।

এসব পর্যালোচনা করলে প্রকৃত শহীদের সংখ্যা দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ হওয়া অসম্ভব নয় বলে জানান সুশান্ত ঘোষ।

বরিশাল বিভাগের এসব বধ্যভূমির মধ্যে মাত্র দুটি বধ্যভূমির স্মারক-স্তম্ভ সরকারি অর্থে এবং মাত্র ৮টির ফলক বেসরকারি অনুদানে নির্মিত হয়েছে।

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

সুশান্ত ঘোষের দেওয়া জেলায় বধ্যভূমির সম্ভাব্য তালিকা এখানে তুলে ধরা হলো।  

বরিশাল জেলার সদর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড সংলগ্ন কীর্তনখোলা তীর, তালতলী বধ্যভূমি, চরকাউয়া মোসলেম মিয়ার বাড়ি সংলগ্ন খালের পাড়, গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর হরহর মৌজার মড়ার ভিটার বধ্যভূমি, গৌরনদী নদীর তীরে সহকারী পুলিশ সুপারের অফিসের সামনের বধ্যভূমি, গৌরনদী গয়নাঘাটা পুল (গৌরনদীর ব্রিজ) বধ্যভূমি, গৌরনদী কলেজের সংলগ্ন ঘাট (স্থানীয়ভাবে কসাই খানা নামে পরিচিত) বধ্যভূমি।

আগৈলঝাড়া উপজেলার কাটিরা ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংলগ্ন বধ্যভূমি, রাজিহার রাংতা বিল বধ্যভূমি, রাজিহার কেতনার বিল বধ্যভূমি, রাজিহার ফ্রান্সিস হালদার বাড়ি বধ্যভূমি, মতিহার গ্রামের বধ্যভূমি, দক্ষিণ সিহিপাশা গ্রামের বধ্যভূমি এবং বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠি বধ্যভূমি, বেবাজ বধ্যভূমি, শ্যামপুর বধ্যভূমি।

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

বানারিপাড়া উপজেলায় রয়েছে দক্ষিণ গাভার নরেরকাঠী বধ্যভূমি. গাভা বাজার বধ্যভূমি, গাভা বিল্ববাড়ি বধ্যভূমি,গাভা পূর্ব বেড়মহল, বাওনের হাট বধ্যভূমি,  গাভা রামচন্দ্রপুরের পূর্ব বেরমহল. বাবুগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে ক্যাডেট কলেজ বধ্যভূমি, রামপট্টি বধ্যভূমি এবং উজিরপুর উজেলায় চিহ্নিত বধ্যভূমিগুলো হচ্ছে বড়াকোঠা দরগা বাড়ি বধ্যভূমি, উত্তর বড়াকোঠা মল্লিক বাড়ি বধ্যভূমি, বড়াকোঠা মুক্তিযুদ্ধের মিলনকেন্দ্র সংলগ্ন বধ্যভূমি, খাটিয়াল পাড়া বধ্যভূমি, বড়াকোঠা চন্দ্রকান্ত হালদারের বাড়ির বধ্যভূমি, মূলাদীর পাতারচর গ্রাম  বধ্যভূমি, মুলাদী নদীর দক্ষিণ পাড়, বেলতলা বধ্যভূমি ।

বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় বধ্যভূমি রয়েছে মেহেন্দীগঞ্জ থানা সংলগ্ন খাল, পাতারহাট গার্লস স্কুল সংলগ্ন ব্রিজের গোড়ায়, পাতারহাট গার্লস স্কুলের দক্ষিণ পাড়ে খলিল মোল্লার বাসায়।

চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও

পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠী উপজেলাতে বধ্যভূমি রয়েছে ভরসাকাঠী. মৈশানি, জুজুখোলা, জুলুহার, সোহাগদল, অলংকারকাঠী, শশীদ ও সাগরকান্দা গ্রামে।

কুড়িয়ানা খালের বধ্যভূমি, কুড়িয়ানা জয়দেব হালদারের বাড়ির বধ্যভূমি, পূর্ব জলাবাড়ী খালপাড় বধ্যভূমিও এ উপজেলাতে।

তেজদাসকাঠী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, দৈহারী ইউনিয়ন পরিষদের সামনের বধ্যভূমিও রয়েছে স্বরূপকাঠী উপজেলাতেই।

পিরোজপুর সদর উপজেলাতে বধ্যভূমি হচ্ছে বলেশ্বর তীরে এবং  হুলারহাট  টার্মিনলের সামনে।

একই জেলার নাজিরপুর উপজেলাতে দীর্ঘা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর সামনে, ঘোষকাঠী বিদ্যালয়, শ্রী রামকাঠী বন্দর এবং গাবতলা গ্রামেও রয়েছে বধ্যভূমি।

এ জেলার কাউখালি উপজেলাতে কাউখালি লঞ্চঘাট, মঠবাড়িয়া উপজেলাতে মণ্ডলবাড়ি, বড়মাছুয়া ভেড়িবাঁধ, সাপলেজা, নলি বাড়ৈ বাড়ি গ্রাম. সূর্যমনি, আংগুলকাটা গ্রামেও আছে বধ্যভূমি।

ঝালকাঠী জেলার রাজাপুর উপজেলাতে রয়েছে, দক্ষিণ কাঠীপাড়া বধ্যভূমি, বাঘরি ব্রীজ সংলগ্ন থানাঘাট বধ্যভূমি, পূর্ব নৈকাঠী বধ্যভূমি, নৈকাঠী- নমপাড়া-বড়মিস্ত্রী বাড়ি বধ্যভূমি, কাঠীপাড়া ঠাকুর বাড়ি জংগলের হত্যাকাণ্ডের বধ্যভূমি ।

পাকিস্তানি বাহিনীর বাংকার

ঝালকাঠী জেলার নলছিটি উপজেলার নলছিটি সুগন্ধা তীরের বধ্যভূমি, মানপাশা বধ্যভূমি, সদর উপজেলার পালবাড়ি সংলগ্ন নদী তীরের এবং বেসাইন খান গ্রামেও রয়েছে  বধ্যভূমি ।

এ ৬৮ টি বধ্যভূমির মধ্যে বরিশাল শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড সংলগ্ন কীর্তনখোলা তীরের বধ্যভূমি সরকারিভাবে স্মারক স্তম্ভ দিয়ে সংরক্ষিত এবং তালতলী বধ্যভুমি বেসরকারি ভাবে স্মৃতি ফলক দিয়ে চিহ্নিত।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার কাটিরা ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংলগ্ন বধ্যভূমিতে ফলক নির্মিত হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে একই উপজেলার রাজিহারে ফ্রান্সিস হালদার বাড়ির বধ্যভূমি চিহ্নিত এবং সেখানে ৮ শহীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠীতে প্রায় ৪ শত মানুষকে শহীদ করার বধ্যভূমিটি চিহ্নিত  এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেখানে ফলক নির্মিত হলেও শহীদদের তালিকা ও তথ্য প্রমাণের অভাবে সম্পূর্ণ রক্ষিত হয়নি।

পিরোজপুর জেলায় স্বরূপপকাঠী উপজেলার ভরসাকাঠী বধ্যভূমিটি সরকারি উদ্যোগে চিহ্নিত স্মৃতিস্তম্ভ দ্বারা সংরক্ষিত।

হানাদার বাহিনী মানুষ হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দিতো

একই জেলার নাজিরপুর উপজেলায় দীর্ঘা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর সামনে আনুমানিক অর্ধশত মানুষকে হত্যা করা হয়। ব্যাক্তিগত উদ্যোগে তা চিহ্নিত করে সেখানে স্মৃতি ফলক নির্মিত হয়েছে।

একই উপজেলার সোহাগদলে ৭ ব্যক্তিকে হত্যা করে একটি কবরের মধ্যে মাটি চাপা দেওয়ার স্থানটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফলক দিয়ে চিহ্নিত করা আছে।

পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সূর্যমনিতে ৩০ শহীদের বধ্যভূমিটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্মৃতি ফলক দিয়ে চিহ্নিত হয়েছে।

ঝালকাঠী জেলার রাজাপুর উপজেলায় দক্ষিণ কাঠীপাড়া বধ্যভূমি,  বাঘরি ব্রীজ সংলগ্ন থানাঘাট বধ্যভূমি এবং বেসাইন খান গ্রামের বধ্যভূমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্মৃতি ফলক দিয়ে চিহ্নিত হয়েছে। এর প্রতিটিতে  অর্ধশত মানুষ শহীদ হলেও তাদের নাম-পরিচয় উদ্ধার করা যায়নি।

এ ব্যাপারে বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাংগঠনিক কমান্ডার এনায়েত হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘এমনিতেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, নিদর্শন, ইতিহাস ও দলিলপত্র সংরক্ষণে অনেক দেরি এবং শৈথিল্য দেখানো হয়েছে। কাজেই আর বিন্দুমাত্র দেরি না করে এ ব্যাপারে আমাদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। না হলে ইতিহাস বিস্মৃতি ও বিকৃতি হতে আমরা যেমন রেহাই পাবো না। তেমনি পরবর্তী প্রজম্মও আমাদের ক্ষমা করবে না।’

/এসটি/

 

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যবিপ্রবির প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এবার অধ্যাপকের মানহানির মামলা
যবিপ্রবির প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এবার অধ্যাপকের মানহানির মামলা
যেখানে পার্থক্য দেখছেন তামিম
যেখানে পার্থক্য দেখছেন তামিম
বিমানবন্দরে যাত্রীকে চড়: কাস্টমের সেই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
বিমানবন্দরে যাত্রীকে চড়: কাস্টমের সেই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্কুলছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা
কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্কুলছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা
এ বিভাগের সর্বশেষ
ভগ্ন হৃদয়ে বরগুনা ছাড়লেন প্রেমের টানে আসা তামিল যুবক
ভগ্ন হৃদয়ে বরগুনা ছাড়লেন প্রেমের টানে আসা তামিল যুবক
‘প্রেমিকার’ মা-বাবার সঙ্গে দেখা করা ছাড়া ফিরবেন না প্রেমকান্ত
‘প্রেমিকার’ মা-বাবার সঙ্গে দেখা করা ছাড়া ফিরবেন না প্রেমকান্ত
মুক্তিযোদ্ধাসহ সাত জনের কঙ্কাল চুরি
মুক্তিযোদ্ধাসহ সাত জনের কঙ্কাল চুরি
স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধার, থানায় ৩ কিশোর
স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধার, থানায় ৩ কিশোর
‘প্রেমের টানে’ আসা ভারতীয় যুবকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ 
‘প্রেমের টানে’ আসা ভারতীয় যুবকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ