১৫ বছর মাছ ধরি, দিন শেষে দাদন আর ঋণে বন্দি

সালেহ টিটু, বরিশাল
১২ মে ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৮:৩০

১৫ বছর ধরে সমুদ্র ও নদীতে মাছ ধরছেন বরিশালের খোরশেদ আলম। প্রতিদিন মাছ ধরে মহাজনের লোকের কাছে বিক্রি করে আসছেন। প্রতি বছর ঋণ নিয়ে মাছ ধরতে যান। তবে দিনশেষে মাছ বিক্রি করলেও তেমন আয় নেই। বছর শেষে উল্টো ঋণের জালে বন্দি থাকতে হয়। তখন মহাজনদের কাছ থেকে নতুন করে দাদন নিতে হয়। ওই দাদন পরিশোধ না করতে না পারায় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলছে সুদ।

এমন দারিদ্র্যের মাঝেও বাড়ছে ঋণ। জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তা। এবার জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে মৎস্য আহরণে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। প্রায় দুই মাস মাছ ধরতে যেতে পারেননি। এই সংকটের মধ্যেই জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ সময় মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিবন্ধিত জেলেরা সামান্য চাল ও কিছু প্রণোদনা পেলেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে সহায়তা পাননি। ফলে পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে তারা মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়েছেন।

বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ধুলখোলা, মেমানিয়া, হরিনাথপুর, বড়জালিয়া, উলানিয়া, গোবিন্দপুরসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এক থেকে দেড় লাখ জেলের বসবাস। মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা। কিন্তু মাছ ধরার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

হিজলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া এলাকার জেলে ইয়াকুব ব্যাপারী বলেন, ‘এবার তেলের সংকটের কারণে প্রায় দুই মাস ঘরে বসে ছিলাম। কোনও মাছ ধরতে পারিনি। ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছি। এরপরে নিষেধাজ্ঞায় মাছ ধরতে পারিনি। সংসার চালাতে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়েছে। দাদন নিতে নিতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাছ ধরে বিক্রি করে এই দাদন পরিশোধ করা যায় না। বছর বছর ঠিকই সুদে বেড়ে যায়।’

জেলেদের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে যান। মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনা, জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিতে হয়; কিন্তু সেই ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট আড়তেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় তাদের। বাজারে দাম বেশি থাকলেও অন্য কোথাও মাছ বিক্রির সুযোগ নেই।

জেলেরা জানান, এক মৌসুমের জন্য লাখে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হয়। বছরের পর বছর সুদের টাকা শোধ করলেও আসল ঋণ রয়ে যায়। অনেকের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মামলাও হয়েছে। কারণ ঋণ নেওয়ার সময় মহাজনরা আগাম সই করা চেক ও স্ট্যাম্প রেখে দেন।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের তথ্যমতে, বিভাগের ছয় জেলায় নিবন্ধিত মোট জেলে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৪২১ জন। প্রতিটি জেলায় নদী ও সমুদ্রগামী জেলে রয়েছেন। সরকারের হিসাবে চার লাখের কিছু বেশি হলেও অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন নিবন্ধিতের দ্বিগুণ। অনিবন্ধিত জেলেরা সরকারি ভিজিএফ সহায়তা বা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।

নিবন্ধিত জেলেরা সামান্য চাল ও কিছু প্রণোদনা পেলেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে সহায়তা পাননি

হিজলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সোলাইমান জমদ্দার বলেন, ‘বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিতে নিতে ঋণের বোঝায় জেলেরা জর্জরিত। মাছের দামও ভালো পাচ্ছেন না। সংসার চালাতে তাদের খুব কষ্ট হয়ে যায়। এরপরও পরিবারের সদস্যদের কথা ভেবে বছরের পর বচর মাছ ধরে যান।’

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘জেলেরা যদি ব্যাংক লোন নিতে চান, তারা যদি আমাদের কাছে আসেন, আমরা তাদের সহযোগিতা করবো; কিন্তু তাদের তো আগে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। জেলেদের ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে অর্থের জোগান দেওয়া গেলে দাদন রোধসহ মাছেরও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

বরিশাল পোর্ট রোডের আড়তদার জহির শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরুর দুই মাস আগে থেকে জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারেননি। কারণ তেলের সংকটে ট্রলার চালানো যায়নি। বেশিরভাগ জেলে বেকার বসে ছিলেন। এরপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে ঘরে বসে ছিলেন সবাই। এখন নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জেলে পরিবারগুলোর আসলে কষ্টের শেষ নেই।’

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দফতরের পরিচালক কামরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বিভাগের ছয় জেলায় নিবন্ধনকৃত জেলেদের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মাথাপিছু বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৭ হাজার ৫০৭ দশমিক ৩৬০ মেট্রিক টন চাল। বর্তমানে এ কর্মসূচি চলমান।এর মধ্যে ৫৮ দিনের চাল বিতরণ করা হয়। ইলিশ প্রকল্পের অধীন একজন জেলে চাল, ডাল, তেল, আটা, চিনি, আলুসহ ৪০ কেজি পণ্য পেয়ে থাকেন।

কামরুল হাসান জানিয়েছেন, বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জেলে পরিবার ভোলায়। সেখানে নিবন্ধিত জেলে ৯০ হাজার ২০০ জন। এরপর পটুয়াখালীতে ৫০ হাজার ৭৫০ জন, বরিশালে ৪৪ হাজার ৭৩৬ জন, বরগুনায় ২৭ হাজার পাঁচ জন, পিরোজপুর ১৮ হাজার ২৫০ জন এবং ঝালকাঠিতে তিন হাজার ৪৮০ জন। ভোলা জেলায় জাটকা নিধন বন্ধে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য বিতরণে কিছুটা অনিয়ম পাওয়া গেলেও অন্য জেলাগুলোতে তেমন কোনও অভিযোগ ছিল না। তবে এ বছর প্রথমবারের মতো ইলিশ প্রকল্পে দেওয়া খাদ্যশস্য নিয়ে কোনও প্রকার অনিয়ম হয়নি।

হিজলা উপজেলার জেলে জালাল উদ্দিন, ইউনুস মাঝি ও শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, জাটকা নিধন বন্ধে সরকার থেকে বরাদ্দকৃত চাল পেয়েছেন তারা। এ বছর চাল পেতে সমস্যায় পড়তে হয়নি, এমনকি মাপেও ঠিক ছিল। তবে এই সহায়তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। কারণ এবার অন্তত তিন মাস মাছ ধরতে পারেননি। 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলতেই ধরা পড়লো ৮০ মণ ইলিশ
চাঁদপুরে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে, দাম কেমন
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে তদারকি করছি, প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছি: চিফ হুইপ
সর্বশেষ খবর
ঢাকার রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না: ট্রাফিক প্রধান
ঢাকার রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না: ট্রাফিক প্রধান
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ঢাকায় একদিনে ২৩৭৭ মামলা 
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ঢাকায় একদিনে ২৩৭৭ মামলা 
মমতার ভাইঝির রহস্যজনক মৃত্যু
মমতার ভাইঝির রহস্যজনক মৃত্যু
অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি, রাজধানীতে যুবক গ্রেফতার
অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি, রাজধানীতে যুবক গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা পাবেন মোবাইল ভাতা
সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা পাবেন মোবাইল ভাতা
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
নির্বাচনের ৭ বছর পর রাশেদ খাঁনকে ডাকসুর জিএস ঘোষণা
নির্বাচনের ৭ বছর পর রাশেদ খাঁনকে ডাকসুর জিএস ঘোষণা