X
শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২
১৭ আষাঢ় ১৪২৯

সিনহা হত্যা: সেদিন মেরিন ড্রাইভে যা ঘটেছিল

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:০০

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হবে সোমবার (৩১ জানুয়ারি)। এ ঘটনায় গ্রেফতার টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ আসামি কারাগারে রয়েছেন। ঘটনার প্রায় ১৮ মাস পর রায়ের দিন ধার্য করেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল। এই মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে সিনহার পরিবার। অপরদিকে ন্যায়বিচার চেয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

সেদিন যা ঘটেছিল: ২০২০ সালের জুলাই মাসে সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পট এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশের পাহাড় ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করতে এসেছিলেন। এ সময় তার দুই সহযোগী সাহেদুল ইসলাম সিফাত এবং শিপ্রা দেবনাথ সঙ্গে ছিলেন। এরই অংশ হিসেবে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া এলাকার মুইন্যা পাহাড়ের ভিডিও চিত্র ধারণ শেষে মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে কক্সবাজার ফিরছিলেন। ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে শামলাপুর বাজারের কাছে এপিবিএন পুলিশ চেকপোস্টে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকতের গুলিতে নিহত হন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ সময় আটক করা হয়েছিল সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে। তল্লাশি চালানো হয় সিনহা যে হোটেলে থাকতেন সেখানে। ওই হোটেল থেকে আটক করা হয় অপর সহযোগী শিপ্রা দেবনাথকে। ঘটনাটি নিয়ে সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। 

ঘটনার বিষয়ে পুলিশের ভাষ্য: এই বিষয়ে পুলিশ তখন বলেছিল, সিনহা মেজর পরিচয় দিয়ে পুলিশের তল্লাশিতে বাধা দেন। পরে পিস্তল বের করলে চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে ঘটনা ভিন্নখাতে নিতে পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি এবং রামু থানায় একটি মামলা করে। সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং মাদক আইনে এসব মামলা করা হয়। টেকনাফ থানায় করা দুই মামলায় সিনহার সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। আর রামু থানায় মাদক আইনে করা মামলায় আসামি করা হয় শিপ্রা দেবনাথকে।

সিনহার বোনের মামলা: এ ঘটনার চার দিন পর ২০২০ সালের ৫ আগস্ট সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে নয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারক তামান্না ফারাহ’র আদালতে মামলা করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিতকে। আদালত মামলাটির তদন্তভার দেন কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫-কে। এরপর জানা যায় আসল ঘটনা।

আসামিদের আত্মসমর্পণ: ২০২০ সালের ৬ আগস্ট ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও ওসি প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরও সাত জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এরপর মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে। পাশাপাশি সিনহা নিহতের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে অতিরিক্ত ডিআইজি এবং লে. কর্নেল মর্যাদার একজন সেনা কর্মকর্তাকে সদস্য করে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। 

এই মামলায় চার মাসের বেশি সময় তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীসহ অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মামলায় বর্তমানে কারাগারে থাকা ১৫ আসামি হলেন- বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র্রের বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, বরখাস্ত কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, বরখাস্ত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, বরখাস্ত কনস্টেবল সাগর দেব, বরখাস্ত এপিবিএনের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহজাহান, বরখাস্ত কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, টেকনাফ থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন। 

বিচারকাজ শুরু: কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তথ্যমতে, ২০২১ সালের ২৭ জুন জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলার চার্জ গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়। ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে প্রথম দফায় ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনে দুই জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় দফায় ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দিনে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয় চার জনের। তৃতীয় দফায় ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে জেরা সম্পন্ন হয় আট জনের। চতুর্থ দফায় ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা করা হয় ছয় জনের। পঞ্চম দফায় ১০ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনে ১৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। ষষ্ঠ দফায় ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয় ২৪ জনের। 

সপ্তম দফায় ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ছয় জন সাক্ষ্য দেন। এদের মধ্যে পাঁচ জনের জেরা সম্পন্ন হলেও তদন্ত কর্মকর্তার জেরা অসম্পন্ন ছিল। সর্বশেষ অষ্টম দফায় ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। এরপর ৬ ও ৭ ডিসেম্বর আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। সর্বশেষে ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।

আদালতে সাক্ষীর বক্তব্য: সিনহা হত্যা মামলার ২ নম্বর সাক্ষী সিফাত আদালতকে বলেছেন, সেদিন রাতে পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে রাস্তায় ঢলে পড়ে কাতরাচ্ছিলেন সিনহা রাশেদ খান। ওসি প্রদীপ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমে লিয়াকত আলীর সঙ্গে আড়ালে গিয়ে কথা বলেন। তারপর সিনহার কাছে গিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে আপত্তিকর ভাষায় গালাগালি করেন। সিনহা তখনও জীবিত ছিলেন এবং ‘পানি’ ‘পানি’ করছিলেন। তখন সিনহার বুকে লাথি মারেন এবং পা দিয়ে গলা চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন প্রদীপ।

রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য: রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলম বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানকে সুপরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে সাবেক ওসি প্রদীপের পরিকল্পনায় পরিদর্শক লিয়াকত হত্যা করেছিল। প্রথমে সিনহাকে মারিশবুনিয়া এলাকার মুইন্না পাহাড়ে ডাকাত বলে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল প্রদীপ ও তার সহযোগীরা। কিন্তু তা করতে না পেরে এপিবিএনের চেকপোস্টে সিনহাকে হত্যা করা হয়। 

বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সিনহা ও তার সহকর্মীরা কক্সবাজারে ডকুমেন্টারি বানাতে এসে বিভিন্ন মানুষের কাছে ওসি প্রদীপের ক্রসফায়ারের নামে খুন, মামলা দিয়ে হয়রানিসহ নানা অপকর্মের তথ্য জানতে পারেন। ডকুমেন্টারির পাশাপাশি সিনহা মানুষের এসব অভিযোগেরও ভিডিও ধারণ করেছেন। প্রদীপ এসব খবর জানতে পেরে সিনহাকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রদীপের কথা উপেক্ষা করায় সিনহাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সিনহাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করতে পেরেছি আমরা। আদালত এই মামলায় প্রদীপ ও লিয়াকতসহ সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

আসামিপক্ষের বক্তব্য: এই মামলায় বরখাস্ত ওসি প্রদীপের পক্ষে আদালতে আইনি লড়াইয়ে সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত। তিনি আদালতে শুনানিতে অংশ নিয়ে বলেছেন সিনহা হত্যাকাণ্ডে ওসি প্রদীপ জড়িত ছিলেন না। মামলার তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী প্রদীপ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। রানা দাশ গুপ্ত এই মামলায় প্রদীপকে খালাস দেওয়ার দাবি জানান। এ ছাড়া লিয়াকতের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার দাশ। তিনিও লিয়াকতের বিষয়ে ন্যায়বিচার চেয়েছেন।

/এএম/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
‘এতদিন শুকনো খাবার খেয়ে থাকা যায়?’
‘এতদিন শুকনো খাবার খেয়ে থাকা যায়?’
নির্গমন কমাতে বাইডেনের ক্ষমতা কমিয়ে দিলো সুপ্রিম কোর্ট
নির্গমন কমাতে বাইডেনের ক্ষমতা কমিয়ে দিলো সুপ্রিম কোর্ট
জঙ্গিদের সুপথে ফেরানো ও সচেতনতা কার্যক্রম কতদূর?
জঙ্গিদের সুপথে ফেরানো ও সচেতনতা কার্যক্রম কতদূর?
এ বিভাগের সর্বশেষ
গোমতীর পানি কমে বেরিয়ে আসছে ক্ষত
গোমতীর পানি কমে বেরিয়ে আসছে ক্ষত
খাগড়াছড়িতে ১১ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া
খাগড়াছড়িতে ১১ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া
মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনা: বি-বাড়িয়া নয়, এখন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনা: বি-বাড়িয়া নয়, এখন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
এক কাউন্সিলরের মামলায় আরেক কাউন্সিলরের জেল ও জরিমানা
এক কাউন্সিলরের মামলায় আরেক কাউন্সিলরের জেল ও জরিমানা
চট্টগ্রাম কাস্টমসে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়
চট্টগ্রাম কাস্টমসে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়