চাঁদপুরে অসময়ের বৃষ্টিতে বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। গত শুক্রবার দুপুরে থেকে কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে জেলার সাত উপজেলার ১১২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জমিতে হেলে পড়েছে সরিষার গাছ, অনেক আলুক্ষেতে পানি জমায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া শাকসবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চাঁদপুর কৃষি অফিস ও স্থানীয় কৃষকরা জানান, লাভজনক ফসল এবং উপযোগী মাটি হওয়ায় নদীবিধৌত চাঁদপুর জেলায় আলু চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি রবি মৌসুমে চাঁদপুরে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল নয় হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বীজতলায় পানি জমে থাকায় আবাদ হয়েছে সাত হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে।
কৃষকরা জানান, অন্যান্য বছরের মতো এবারও চাঁদপুরে কৃষকরা বুকভরা আশা নিয়ে আলু চাষ করেছেন। কয়েকদিন পরই কৃষকদের কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু হঠাৎ অসময়ের বৃষ্টি সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নিচ্ছে। বৃষ্টির পানি আরও দুই-তিনদিন ক্ষেতে থাকলে সব আলু নষ্ট হয়ে যাবে।
সদর উপজেলার শাহমামুদপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর ব্লকের কৃষক জামাল গাজী ও খোকন গাজী জানান, গত ৩০ নভেম্বর তারা ১১২ শতক জমিতে আলুর আবাদ করেছিলেন। এরপর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে আলুর বিজতলা পানিতে তলিয়ে যায়। তারপর ধারদেনা করে পুনরায় আলুর বিজ লাগান। কিন্তু গতকাল হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুক্ষেতে পানি জমেছে। এমনিতে আলুর দাম কম, তারপর হঠাৎ বৃষ্টিতে আলুর আরও ক্ষতি হলো। ক্ষেতের আলু নষ্ট হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। পানিতে আলু পচে গেলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে তাদের।
একই ইউনিয়নের কৃষক আবুল কালাম বলেন, লাভ-লোকসান যা-ই হোক আলুর আবাদ আমাদের প্রধান ফসল। গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার ৩৩ শতক জমিতে আলুর আবাদ করেছি। কয়েকদিন পর আলু তোলার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে ক্ষতির মুখে পড়লাম আমরা।
সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের কৃষক বিল্লাল হোসেন বলেন, এই বছর অনেক আশা নিয়া আলু চাষ করলাম। কিন্তু বৃষ্টিতে আলুক্ষেত একদম শেষ। এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে উঠবো জানি না। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সরকার আমাদের যদি কোনোভাবে সহায়তা করে তবে কিছুটা হলেও উপকৃত হবো।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. জামাল উদ্দিন বলেন, বৃষ্টিতে জেলার সাত উপজেলার ২৮ হেক্টর জমির আলু, ২৫ হেক্টর সয়াবিন, ৩০ হেক্টর সরিষা, ১২ হেক্টর ভুট্টা ও ১৭ হেক্টর জমির শাক-সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ফসলের কিছু হেলে পড়েছে আবার কিছু জমিতে পানি জমেছে। তবে বৃষ্টিপাতে কিছু ফসলের ক্ষতি হলেও ধান, গম, ভুট্টা ও মরিচসহ কিছু ফসলের জন্য উপকারীও।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কর্মকর্তা নরেশ চন্দ্র দাস বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের রবি মৌসুমে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল নয় হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্য সাত হাজার ১০০ ৪০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। তবে ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে দুই দফায় বৃষ্টিপাতের কারণে আলু উৎপাদন কিছুটা বিঘ্ন হবার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য ফসলেরও কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপরে আমাদের মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ চলছে। অচিরেই আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করবো।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব। এই খাতে সরকার নানাভাবে কৃষকদের সহযোগিতা করছে। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হবে।
এবার চাঁদপুরে সাড়ে নয় হাজার হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ মেট্রিক টন।
এর মধ্যে চাঁদপুর সদরে এক হাজার ৭০০ হেক্টর এবং উৎপাদন ৩৫ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন। মতলব উত্তরে ৬২০ হেক্টর এবং উৎপাদন ১২ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন। মতলব দক্ষিণে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার ৭০০ হেক্টর এবং উৎপাদন ৭৬ হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন। হাজীগঞ্জে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৭২০ হেক্টর এবং উৎপাদন ১৪ হাজার ৮৬১ মেট্রিক টন। শাহরাস্তিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হেক্টর এবং উৎপাদন ৪১২ মেট্রিক টন। কচুয়ায় চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৫০০ হেক্টর এবং উৎপাদন ৫১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। ফরিদগঞ্জে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৯০ হেক্টর এবং উৎপাদন এক হাজার ৮৫৭ মেট্রিক টন এবং হাইমচরে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৫০ হেক্টর এবং উৎপাদন তিন হাজার ৯৬ মেট্রিক টন।









