X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

পদ্মা-মেঘনার সম্পদ ও ইলিশ রক্ষায় তদন্ত কমিটি

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২২, ২০:৩৬

চাঁদুপুরে পদ্মা-মেঘনার সম্পদ, নদীভাঙন রোধ ও ইলিশ রক্ষায় এবার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। বুধবার (০২ মার্চ) ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (খাস জমি) জহুরুল হককে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. জসিম উদ্দিন পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে।

পদ্মা-মেঘনার ভাঙন থেকে চাঁদপুরকে রক্ষা, ইলিশ সম্পদ রক্ষায় নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলে ও স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশের দেওয়া চিঠির পাওয়ার পর এই তদন্ত কমিটি গঠন করলো ভূমি মন্ত্রণালয়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, চাঁদপুর জেলার পদ্মা-মেঘনা নদীর অংশে নদীর নাব্য, ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষা, নদী ভাঙনরোধসহ নদীর সম্পদ রক্ষায় জেলা প্রশাসকের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেরিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয়টি তদন্তপূর্বক মতামত, সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রণয়নের লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলো।

তদন্ত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (আইন-২) আবুল কালাম তালুকদার, ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (অধিগ্রহণ-১) কবির মাহমুদ, চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দাউদ হোসেন চৌধুরী। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (সায়রাত) এই কমিটিকে সার্বিক সহায়তা করবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমন্বয় সভা, ইলিশ রক্ষায় টাস্কফোর্সের সভা এবং নদী রক্ষা কমিটির যে সভা হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং মতামতের রেজুলেশন ছিল। মামলা করে নদী থেকে যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করা হচ্ছে; এতে নদীর কি পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, নদী গবেষক ও ইলিশ গবেষক উল্লেখ করেছেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে বালু উত্তোলন বন্ধে মামলাগুলোর আদেশ ভ্যাকেট করতে নদী এবং ইলিশ রক্ষার জন্য আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে বিষয়গুলো জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। আমাদের চিঠি পাওয়ার পরই ভূমি মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে তদন্তের জন্য নির্দেশনা দিয়েছে।’

প্রসঙ্গত, চাঁদপুর নদী অঞ্চল থেকে গত কয়েক বছর ধরেই অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি চক্র। ফলে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেও নদী ভাঙন প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশ সম্পদসহ নদীর জীববৈচিত্র্য। সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

নদী ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর ও স্থানীয়রা বিরোধিতা করলেও বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে প্রভাবশালী ওই চক্রটি। সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বালু উত্তোলনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সভায় জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএর তথ্যমতে চাঁদপুরের নদী থেকে যে প্রক্রিয়ায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তা সঠিক হচ্ছে না। এতে নদীর ক্ষতি হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া আমাদের দিক থেকে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় বালু উত্তোলনের ফলে সরকার কোনও রাজস্ব পাচ্ছে না। সেলিম খান নামে এক ব্যক্তি আদালতে মামলা করে ২০১৫ সাল থেকে বালু উত্তোলন করছেন। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘একদিকে চার হাজার কোটি টাকার শহররক্ষা বাঁধ করার পরিকল্পনা, অপরদিকে মেঘনায় যত্রতত্র অবৈধ বালু উত্তোলন। এই দুটি একসঙ্গে চলতে পারে না। ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত মেঘনার বালু উত্তোলনে সরকারের এক টাকাও লাভ হয়নি। উল্টো ডুবোচর খননের নামে শতাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে এলোমেলোভাবে বালু উত্তোলনের কারণে মেঘনার দুই পাড় ভাঙন ধরেছে। বালু উত্তোলন বন্ধ এবং নদী ও ইলিশ রক্ষায় যা যা করণীয় তা প্রশাসন করবে।’

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেফাত জামিল বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে বালু উত্তোলন করছে, তা তারা বৈজ্ঞানিকভাবে তুলছেন না। তারা চাহিদাভিত্তিক বালু তুলছেন। যেখানে বালু পাচ্ছে সেখান থেকেই তারা বালু তুলছেন। নদীর গতিপথ আছে। এই গতিপথের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কোথায় পানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সেসব জায়গায় যদি ডুবোচর থাকে এবং কতটুকু গভীরতায় যেতে হবে, সেটি একটি স্তরের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যারা বালু উত্তোলন করছেন তারা সেটি মানছেন না। তারা যেভাবে বালু উত্তোলন করছেন তা নদীর জন্য ক্ষতিকর এবং ভাঙনের জন্য দায়ী।’

বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক কায়সারুল ইসলাম বলেন, ‘ড্রেজিংয়ের নামে তৃতীয় পক্ষ যেভাবে বালু উত্তোলন করে সেটি নদীর জন্য ভালো নয়।’

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরে জাটকা নিধন প্রতিরোধে জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভায় ইলিশ গবেষকসহ সংশ্লিষ্টরা নদীতে শত শত ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে ইলিশ সম্পদসহ মাছের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মার্চ-এপ্রিল জাটকা রক্ষায় দুই মাস নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকবে। এ নিয়ে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসককে একটি চিঠিও দেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হারুনুর রশিদ।  

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘চাঁদপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে গত কয়েক বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এই নদী থেকে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান ডুবোচর খননের নামে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে এই কাজটি করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন। ফলে ইলিশের বৃহত্তম বিচরণ ক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম (ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার) নষ্টসহ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘনা নদীতে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে প্রধান প্রজনন মৌসুমে চাঁদপুর অংশে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সম্প্রতি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।’

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে শত শত ড্রেজারের আঘাতে, নির্গত পোড়া মবিল ও তেলের কারণে মাছের প্রধান প্রাকৃতিক খাদ্য নদীর প্লাংটন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এছাড়া বালু উত্তোলনে নদী দূষণসহ নদী গর্ভের গঠন প্রক্রিয়া বদলে যাওয়ার ফলে বাসস্থানের বাস্তুতন্ত্রও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের এই ধরনের পরিবর্তনের ফলে তাদের আবাসস্থল যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি ইলিশসহ অন্যান্য মাছের খাদ্যের উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাছের বিচরণ ও প্রজনন বদলে যাওয়াসহ ইলিশের উৎপাদন মেঘনা নদীতে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ইলিশ রক্ষা এবং আবাসস্থল নিরাপদ করতে প্রধান প্রজনন ও বিচরণ মৌসুমে মেঘনা নদীতে বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধসহ ড্রেজারগুলো স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’

 

/এএম/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের র‌্যাবের ঈদ উপহার
আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের র‌্যাবের ঈদ উপহার
সেই ঘের থেকে ওঠা গ্যাস দিয়ে রান্না বন্ধের নির্দেশ
সেই ঘের থেকে ওঠা গ্যাস দিয়ে রান্না বন্ধের নির্দেশ
এ বিভাগের সর্বশেষ
অস্ত্র ও মাদকসহ ৪ যুবক গ্রেফতার
অস্ত্র ও মাদকসহ ৪ যুবক গ্রেফতার
কক্সবাজার সৈকত থেকে ২ শিশুর মরদেহ উদ্ধার
কক্সবাজার সৈকত থেকে ২ শিশুর মরদেহ উদ্ধার
মিতু হত্যার বর্ণনা দিলো ছেলে
মিতু হত্যার বর্ণনা দিলো ছেলে
ক্যাম্পে মিলেছে এম-১৬ রাইফেল, উদ্ধার ২০ লাখ পিস ইয়াবা
ক্যাম্পে মিলেছে এম-১৬ রাইফেল, উদ্ধার ২০ লাখ পিস ইয়াবা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ছাত্রের মৃত্যু, হাসপাতালে ছাত্রী
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ছাত্রের মৃত্যু, হাসপাতালে ছাত্রী