X
শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

বাসায় আয়াতকে হত্যা ও লাশ টুকরো, কিছুই জানতো না আবিরের মা-বাবা?

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৮:৪৩আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৯:১১

শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে (৫) অপহরণের পর আবির আলী প্রথমে তাকে নিয়ে যায় বাবার বাসায়। সেখানে হত্যা করে বস্তায় ভরে লাশ নিয়ে যায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে মায়ের বাসায়। ওই বাসার শৌচাগারের ওপর ফাঁকা জায়গায় লাশটি কিছুক্ষণ রাখে। এরপর মা-বোন বাসা থেকে বের হলে লাশ টুকরো করে দুই বস্তায় ভরে নিয়ে যায় সাগর পাড়ে। আলাদা আলাদা স্থানে ফেলে লাশের বস্তাভর্তি অংশবিশেষ। তবে প্রশ্ন জেগেছে, বাসার মধ্যে ঘটে যাওয়া নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কি কিছুই জানতো না ঘাতকের বাবা-মা ও বোন?

নিহতের পরিবারের দাবি, আবিরের মায়ের বাসায় রক্তের দাগ লেগে ছিল। তাও তারা কিছুই জানায়নি। তবে পুলিশ এই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে রাজি নয়। তারা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে বিস্তারিত জানাবে বলে জানিয়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর) ভোরে আবিরের বাবা আজমল আলী, মা আলো বেগম ও বোন আঁখি আক্তারকে (১৫) গ্রেফতার করে পিবিআইয়ের কাছে সোপর্দ করে র‌্যাব। হত্যার ঘটনায় চট্টগ্রামের ইপিজেড থানায় আয়াতের বাবার করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাদের রিমান্ডে পাঠান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই ইন্সপেক্টর মনোজ কুমার দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবিরের বাবা আজমল আলী ও মা আলো বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত শুনানি শেষে তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। বোন আঁখি আকতারের (১৫) দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবদুল হালিমের আদালত এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সোমবার থেকে দ্বিতীয় দফায় আবির আলীকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগে দুই দিন রিমান্ডে ছিল।’

নিহতের দাদা মঞ্জুর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবিরকে গ্রেফতারের পর আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম। ওই বাসার মেঝে, পাতিল, খাট ও দেয়ালে তখনও রক্তের দাগ লেগেছিল। ঘটনার ১০ দিনের মাথায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখেছি। তার মা-বোন ওই বাসায় থেকেও কি এসব দেখেননি? তারা যদি দেখে থাকে তাহলে আমাদের জানায়নি কেন? হয়তো তারাও এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। তবে আবিরের বাবা জড়িত কিনা বলতে পারবো না। কেননা, আবির তার মা ও বোনকে নিয়ে থাকতো ইপিজেড আকমল আলী সড়কের একটি বাসায়। আর বাবা থাকতো আরও পাঁচ কিলোমিটার দূরে আমার ভাড়া বাসায়। তাদের রিমান্ডে আনা হয়েছে। নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে।’

র‌্যাব-৭ সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) নূরুল আবছার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবির আলীর বাবা, মা ও বোনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিজ বাসা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। যেহেতু এই মামলা পিবিআই তদন্ত করছে, এ কারণে গ্রেফতারকৃতদের তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

আয়াত হত্যায় তাদের কোনও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মামলাটি এখনও তদন্তাধীন। এ কারণে আমরা এই বিষয়ে আর কিছু বলতে পারছি না।’

এদিকে, শোকে কাতর আয়াতের বাবা সোহেল রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এত বড় ঘটনা আবির একা করেনি। নিশ্চয়ই তার মা-বাবা, বোন জড়িত। ঘটনার পর থেকে আমি তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছি। শেষ পর্যন্ত তাদের র‌্যাব গ্রেফতার করেছে। রিমান্ডে বেরিয়ে আসবে সবকিছু। আমার মেয়ে হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি জানাচ্ছি।’

জিজ্ঞাসাবাদে আবির পিবিআইকে জানায়, গত ১৫ নভেম্বর নগরের ইপিজেড থানাধীন বন্দরটিলা নয়াহাট বিদ্যুৎ অফিস এলাকার মসজিদে প্রতিদিনের মতো আরবি পড়তে যাচ্ছিল আয়াত। ওই মসজিদে এলাকার ছোট ছেলেমেয়েদের আসরের নামাজের পর আরবি পড়ানো হয়। প্রথমে একবার আয়াতকে কোলে নিয়েছিল আবির। তখন দেখে ফেলে আয়াতের এক সহপাঠী। এ কারণে তখন তাকে ছেড়ে দেয়। পরে আবার তাকে পেছন থেকে ডেকে নিয়ে যায় আবির। কাছে আসামাত্র তাকে চেপে ধরে আবিরের বাবার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে লুঙ্গি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে লাশ একটি ব্যাগে ঢুকিয়ে সেখান থেকে নিয়ে যায় মায়ের বাসায়। দুই বাসার দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। কয়েক মাস ধরে আবিরের মা-বাবা আলাদা থাকছেন।

পিবিআই কর্মকর্তারা বলেন, লাশভর্তি ব্যাগটি মায়ের বাসায় আনার পর প্রথমে শৌচাগারের ওপর ফাঁকা জায়গায় রাখে। সেখান থেকে আয়াতের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে সেও খোঁজাখুঁজি করে। পরে রাত সাড়ে ১০টায় পুনরায় মায়ের বাসায় আসে। সেখানে মাকে বলে, ‘আয়াতকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমিও বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছি। দীর্ঘদিন তাদের বাসায় ছিলাম, একটু গিয়ে তার মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে আসো’। এই বলে মা ও বোনকে ওই বাড়িতে পাঠায়। এদিকে ফাঁকা বাসায় আবির কাটার এবং বঁটি দিয়ে লাশ ছয় টুকরো করে। টুকরোগুলো দুটি বস্তায় ঢুকিয়ে একটি পতেঙ্গা বেড়িবাঁধ এলাকায় বঙ্গোপসাগরে, অপরটি স্লুইসগেটের মুখে ফেলে দেয়। আজ আয়াতের লাশের পায়ের দুটি খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেছে পিবিআই।

পিবিআই ইন্সপেক্টর মনোজ দে বলেন, ‘রিমান্ডে আবির আমাদের কোথায় কোথায় আয়াতের লাশের খণ্ডিত অংশ ফেলেছে তা দেখিয়ে দিতে রাজি হয়। এরপর তাকে নিয়ে বেড়িবাঁধ সাগরপাড় এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে কোথায় কোথায় লাশভর্তি বস্তা ফেলেছিল।’

ওই দিন সাগর পাড়ে অভিযানের পর আবিরের বাসায় তল্লাশি করে পিবিআই। তার বাসা থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। ডায়েরিতে অনেক অর্থের মালিক ও বড়লোক হওয়ার লালসার কথা উল্লেখ রয়েছে। পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, অল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার নেশায় আয়াতকে অপহরণ করেছিল আবির। তার লক্ষ্য ছিল অপহরণের পর আয়াতের পরিবারের কাছ থেকে ১৫-২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা। তবে আয়াত নিখোঁজের পরপরই স্বজনরা থানায় ডায়েরি করেন। আয়াতকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা শুরু হওয়ায় পর ধরা পড়ার ভয়ে মুক্তিপণ চাওয়া থেকে বিরত থাকে আবির।

/এফআর/এমওএফ/
সর্বশেষ খবর
কাভার্ডভ্যানের চাপায় ২ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
কাভার্ডভ্যানের চাপায় ২ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির টার্গেট ১৩ মুসলিম অধ্যুষিত আসন
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির টার্গেট ১৩ মুসলিম অধ্যুষিত আসন
সারাদেশে যুব মজলিসের বিক্ষোভ: মামুনুল হকের মুক্তি দাবি
সারাদেশে যুব মজলিসের বিক্ষোভ: মামুনুল হকের মুক্তি দাবি
বিএনপির দুর্নীতি নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস
বিএনপির দুর্নীতি নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস
সর্বাধিক পঠিত
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
বিয়ে করে বিপাকে অভিনেতা তৌসিফ!
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
উপহার পেয়েছিলেন মাত্র চারটি, এখন তাদের ছাগল-ভেড়া ৬৩টি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে জমজমের পানি
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
কলকাতার দেয়ালে দেয়ালে তাসনিয়া: ফারিণের পাশে দাঁড়ালেন প্রসেনজিৎ
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার
প্রধানমন্ত্রী কুমিল্লা নামেই বিভাগ দিন: এমপি বাহার