এমন জানাজা আগে দেখেনি কেউ, ৭ দিন পর মা জানলেন চার ছেলে নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
২০ মে ২০২৬, ২০:০৯আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ২০:৪৬

এক সপ্তাহ আগে বিদেশে থাকা চার ছেলের একসঙ্গে মৃত্যু হয়েছে। তবে সেই খবর জানতেন না মা খাদিজা বেগম। ছেলেদের কফিনবন্দি মরদেহ বাড়িতে আনার পর জানানো হয়। বুধবার (২০ মে) সকালে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ছেলেদের কফিন দেখে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। সকাল থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।

বুধবার সকালে এই দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্ধরাজপাড়ায়। গত ১৩ মে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় এই পাড়ারই বাসিন্দা চার ভাইয়ের মরদেহ। আজ সকাল ৭টায় চার জনের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। খবর পেয়ে উপজেলার নানা প্রান্ত থেকে হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু জড়ো হন বাড়ির সামনে। কেবল রাঙ্গুনিয়া নয়, উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ আসে বাড়িটিতে। মানুষের কান্না আর স্বজনের বিলাপে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসক কাজী মনসুর আহমেদ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, খাদিজা বেগমের কাছে গত এক সপ্তাহ ধরে যে সত্যটি আড়াল করে রাখা হয়েছিল, তা আজকে আর চাপা থাকেনি। এখন তিনি শয্যাশায়ী। সকালে খবর শোনার পর থেকে তিনি কাঁদছেন আর বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

জানাজায় ইমামতি করেন তাদের বেঁচে থাকা একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনাম

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার লালানগর উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে চার ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জানাজার জন্য। সেই শেষ যাত্রায় শামিল হয় কয়েক হাজার মানুষ। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড়ে বিদ্যালয়ের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বেলা ১১টায় হওয়া জানাজা পড়ান খাদিজা বেগমের একমাত্র জীবিত সন্তান মোহাম্মদ এনাম। চার ভাইকে হারিয়ে বিপর্যস্ত এনাম জানাজা শেষে মোনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগর থেকে জানাজায় অংশ নিতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‌‘এরকম ঘটনা রাঙ্গুনিয়ার মানুষ আর দেখেনি। চার ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো রাঙ্গুনিয়ার মানুষ শোকাহত। যারা নিহত হয়েছেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ও জানাজায় অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন।’

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৮টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিশেষ ফ্রিজারে করে মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে বুধবার ভোরে নিয়ে আসা হয়।

মারা যাওয়া চার ভাই হলেন শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম। তাদের বাবার নাম মৃত জামাল উদ্দিন। রাশেদুল ও শাহিদুল বিবাহিত ছিলেন। সিরাজুল ও শহিদুল ছিলেন অবিবাহিত। তাদের দেখতে লালানগর গ্রামসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ উপস্থিত হন। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না এলাকাবাসী ও স্বজনরা। আহাজারি করছেন স্বজনরা।

সকালে রাঙ্গুনিয়ার বাড়িটিতে গিয়ে চারপাশে কয়েক শত মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ কান্না করছেন। কেউ আবার মারা যাওয়া চার জনের স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত। ঘরের ভেতরে গিয়ে আহাজারি করতে দেখা যায় মারা যাওয়া চার জনের মা খাদিজা বেগমকে। সেখানে আহাজারি করছিলেন নিহত রাশেদুলের স্ত্রী কুলসুমা আক্তার ও শাহিদুলের স্ত্রী শান্তা আকতারও। তারা আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।

সাফিয়া বেগম নামের এলাকার এক নারী বলেন, ‘ঘরে কারও কথা বলার মতো অবস্থাই নেই। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। তাদের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।’ 

স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বলেন, ‘একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু, আবার চার জনের একসঙ্গে জানাজার ঘটনা এই গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। এটি কতটা মর্মান্তিক তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

পাশাপাশি কবরে চার ভাইকে চিরশায়িত করা হয়

স্থানীয় বাসিন্দা এম এ মতিন বলেন, ‘১১ বছর আগে মেজো ভাই প্রথমে ওমানে যান। পরে একে একে অন্য ভাইদের সেখানে নিয়ে যান। তারা ওমানে দুটি গাড়ি ওয়াশিংয়ের ব্যবসা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন। কিন্তু একসঙ্গে চার ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়া আসলে মানা যায় না।’

উপজেলার লালানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমির হোসেন সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওমানে মারা যাওয়া চার ভাইকে এক সারিতে কবর করে দাফন করা হয়েছে।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘চার ভাইয়ের মরদেহ ভোরে বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।’

গত ১৩ মে রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় প্রবাসী চার ভাইয়ের মরদেহ। রয়্যাল ওমান পুলিশের ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজোস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। 

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১৫ মে বিবাহিত দুই ভাই ও অবিবাহিত দুই ভাই একসঙ্গে দেশে ফেরার কথা ছিল। তাই চার ভাই একটি গাড়ি নিয়ে একসঙ্গে বিয়ের কেনাকাটার জন্য বের হয়েছিলেন। এর মধ্যেই পথে গাড়িতে তাদের মৃত্যু হয়।

/এএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়ালো
ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু
লিফটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পড়ে সাবেক শিক্ষকের মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি
লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
জামায়াত বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইনু-মেননের মতো অবস্থা হবে: নুরুল আমিন
জামায়াত বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইনু-মেননের মতো অবস্থা হবে: নুরুল আমিন
সম্পদবিবরণী প্রকাশের শর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আহ্বান টিআইবির
সম্পদবিবরণী প্রকাশের শর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আহ্বান টিআইবির
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
আজ স্বর্ণের দাম কত
আজ স্বর্ণের দাম কত