ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফেরার পথে চলন্ত ট্রেনে দুর্বৃত্তের ছোড়া পাথরের আঘাতে এক আয়কর আইনজীবী ও একটি কোম্পানির নির্বাহী হিসাবরক্ষক গুরুতর আহত হয়েছেন। চোখে আঘাত পাওয়া আয়কর আইনজীবীর দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের পরও রক্ষা করতে না পেরে একটি চোখ অপসারণ করেছেন চিকিৎসকরা।
চোখ হারানো আয়কর আইনজীবীর নাম শ্যামল চন্দ্র দাস (৪৫)। অপর আহত ব্যক্তি হলেন ঢাকার স্বপ্ন কুটির বিল্ডার্সের নির্বাহী হিসাবরক্ষক নাইমুল হাসান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালশহর স্টেশন অতিক্রমের সময় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পাথরটি শ্যামল চন্দ্র দাসের ডান চোখে আঘাত হানে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের পরও তার ডান চোখটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত অপসারণ করতে হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্যামলের সঙ্গে থাকা আইনজীবী সংগঠনের সভাপতি মানসুরুল হক মনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে আমরা একসঙ্গে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনের “ন” বগিতে করে আসছিলাম। শ্যামল দাস ৩৪ নম্বর সিটে বসা ছিলেন। রাত ১টা ৩০ থেকে ১টা ৪০ মিনিটের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্টেশনে পৌঁছার আগ মুহূর্তে তালশহর স্টেশন অতিক্রমের সময় ট্রেনটি লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। একটি পাথর ট্রেনের জানালা ছিদ্র করে শ্যামলের ডান চোখে আঘাত হানে। ট্রেনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে আসার পর গুরুতর অবস্থায় শ্যামলকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বুধবার সকাল থেকে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার করা হলেও চিকিৎসকরা তার ক্ষতিগ্রস্ত চোখটি রক্ষা করতে পারেননি। পরবর্তীতে চোখটি অপসারণ করতে হয়েছে।’
অপরদিকে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের আউটার পৈরতলা এলাকায় আসলে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে আহত হন স্বপ্ন কুটির বিল্ডার্সের নির্বাহী হিসাবরক্ষক নাইমুল হাসান। তিনি বলেন, ‘মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে প্রবেশ করছিল। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একটি পাথর এসে আমার মাথায় লাগে, এরপর দেখি রক্ত পড়ছে। আমার এই অবস্থা যাত্রীরা দেখে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান, তারপর পাঁচটি সেলাই লাগে মাথায়।’
পরপর দুটি ঘটনায় রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীদের অভিযোগ, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই ঘটছে। কিন্তু তা প্রতিরোধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেই।
জেলা নাগরিক ফোরামের সহসভাপতি নীহার রঞ্জন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একের পর এক ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় রেলযাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর উচিত ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।’
ফেসবুকভিত্তিক রেলওয়ে ফ্যান গ্রুপ ‘দ্যা ট্রেন’-এর অ্যাডমিন সোহেল আহমেদ জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে যাত্রীদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে পড়ছে। এক্ষেত্রে রেললাইনের পাশের জনপ্রতিনিধিদের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করাসহ প্রতিরোধের ব্যাপারে রেললাইনের পাশের ওয়ার্ডগুলোতে কমিটি করতে হবে। তাহলে এই ধরনের অপকর্ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খবর পেয়ে আজ আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তবে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









