বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষাধিক, জনপ্রতি সরকারি বরাদ্দ ৩২ টাকা, সঙ্গে ২৭০ গ্রাম চাল

জিয়াউল হক, রাঙামাটি
১৭ জুলাই ২০২৬, ১৫:০৯আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১৫:০৯

রাঙামাটিতে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার অসংখ্য সড়ক, কালভার্ট, কৃষিজমি ও মৎস্য ঘের। জেলায় এ পর্যন্ত ১৩৫টি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং তিন জন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে বন্যায় ১ লাখ ৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বিপরীতে সরকারিভাবে যে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত অপ্রতুল।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এবারের বন্যা ও পাহাড় ধসে জেলায় মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৭১৭ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারিভাবে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা এবং ২৯৫ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৩১৪ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে; যার সুবিধা পেয়েছেন ৩২ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ ৭৬ হাজার ৭১৭ জন মানুষ এখনও সরকারি কোনও সুবিধার আওতায় আসেননি। জেলার মোট বরাদ্দের ৩৫ লাখ টাকা ও ২৯৫ টন চাল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ভাগ করে দিলে মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁডায় মাত্র ৩২ টাকা এবং ২৭০ গ্রাম চাল।

বর্তমানে বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়ন থেকে পানি যাওয়ায় দুর্গতরা ঘরবাড়ি পুনর্গঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে সড়ক যোগাযোগ এখনও স্বাভাবিক হয়নি; বিশেষ করে বাঘাইছড়ির সঙ্গে খাগড়াছড়ির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক

বন্যায় জেলায় ৪৮৩টি বসতঘর, ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২৫টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কৃষি ও মৎস্য খাতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলার অসংখ্য সড়ক, কালভার্ট, কৃষিজমি, মাছের পুকুর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শত শত বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও কাদা-পানিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যায় বাঘাইছড়ি উপজেলার সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে; সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে বসতঘর হারিয়ে দিশেহারা অনেক পরিবার এখন ত্রাণের বদলে ঘর পুনর্গঠনে সরকারি সহায়তা দাবি করছে।

জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বন্যায় আনুমানিক ৪৮৩টি বসতঘর, ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৫টি সেতু-কালভার্ট এবং ৫৪৬.৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতে ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি এবং মৎস্যখাতে প্রায় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, জেলায় ২৯৫ মেট্রিক টন চালের মধ্যে রাঙামাটি সদর ও পৌরসভায় ৪০, লংগদু ২০, কাউখালী ৩০, বরকল ২০, বাঘাইড়ি ৪৫, জুরাছড়ি ১০, নানিয়ারচর ১০, কাপ্তাই ৫০, বিলাইছড়ি ৫০, রাজস্থলী ২০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ কর হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ও বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন।

বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফারুয়া বাজারের ৭২টি দোকান এবং ১ হাজার ৯৮২টি বসতঘর বন্যার পানিতে ডুবে ছিল, যার মধ্যে ২৭৪টি স্থাপনা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য ব্যবসায়ীরা বাজারটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানালেও বন বিভাগের আইনি জটিলতায় তা আটকে আছে।

অন্যদিকে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমেনা মারজান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, উপজেলার ৮০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল এবং ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি ছিল। বর্তমানে দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৯৫ জন মানুষ অবস্থান করছেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে প্রতিটি উপজেলায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ফাইবার বোট প্রদান এবং পুনর্বাসনের জন্য ঢেউ টিন ও নগদ অর্থ মঞ্জুরির প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।

বন্যায় ঘরবাড়ির বেহাল দশা

রাঙামাটির ‘সনাক’ (সচেতন নাগরিক কমিটি) হলো ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সদস্য মো. আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। দেখেছি আশ্রয়কেন্দ্রে কিছুটা অব্যবস্থাপনা ছিল। আবার অনেকে চোখ লজ্জার কারণে আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি। তারা তো মনে হয় না সরকারি কোনও সুবিধা পেয়েছে। যারা সব হারিয়ে নিরুপায় হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছিলেন তারাই সরকারি সুবিধা পেয়েছেন। তারও খাবার ও বরাদ্দ কোনভাবেই পর্যাপ্ত ছিল না।

এ বিষয়ে রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আনোয়ারুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পার্বত্য তিন জেলায় অতীতে বন্যায় ও পাহাড় ধসে এতো মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। মানুষ মারা গিয়েছে, তবে এতো মানুষ সার্বিক ক্ষতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব

দিয়ে দেখছেন বলে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ঘুরে গিয়েছেন। শেষে জেলা প্রশাসন থেকে যে তথ্য পেয়েছি তাতে আমার হতাশ। পুনঃঘটনে সরকারি আরও সহায়তা বৃদ্ধি জরুরি বলে আমি মনে করি।

/এএম/আরকে/
সম্পর্কিত
বন্যার্তদের পুনর্বাসনে সরকারের কার্যক্রম চলবে: অর্থমন্ত্রী
চট্টগ্রামে বন্যাভেসে গেছে মাছ ভেঙেছে সড়ক, ক্ষতি ১৫০ কোটি
এক সপ্তাহ ধরে ঘরের চুলায় আগুন জ্বলে না, আমার পরিবারে ত্রাণ পৌঁছায়নি
সর্বশেষ খবর
জুলাই সদন নিয়ে বিরোধী দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে: মির্জা ফখরুল 
জুলাই সদন নিয়ে বিরোধী দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে: মির্জা ফখরুল 
ফোনে বেশি টাইপ করছেন? বুড়ো আঙুলের ব্যথা জানাচ্ছে বড় বিপদের ইঙ্গিত
ফোনে বেশি টাইপ করছেন? বুড়ো আঙুলের ব্যথা জানাচ্ছে বড় বিপদের ইঙ্গিত
পেলের ১৯৫৮ বিশ্বকাপ ফাইনালের জার্সি ৪৮ লাখ ৮৮ হাজার ডলারে বিক্রি 
পেলের ১৯৫৮ বিশ্বকাপ ফাইনালের জার্সি ৪৮ লাখ ৮৮ হাজার ডলারে বিক্রি 
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাউবির দুই দিনের পরীক্ষা স্থগিত
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাউবির দুই দিনের পরীক্ষা স্থগিত
সর্বাধিক পঠিত
খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন ভাতা নির্ধারণ
খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন ভাতা নির্ধারণ
এনসিপির সমাবেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
এনসিপির সমাবেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
শহীদ আবু সাঈদের স্মরণসভায় লোক কম দেখে মন্ত্রী বললেন, ‘আমি হতাশ’
শহীদ আবু সাঈদের স্মরণসভায় লোক কম দেখে মন্ত্রী বললেন, ‘আমি হতাশ’
তিন ধরনের কেক-পাউরুটি বিক্রি বন্ধের নির্দেশ
তিন ধরনের কেক-পাউরুটি বিক্রি বন্ধের নির্দেশ
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় গ্রেফতার কে এই মোজাফফর
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় গ্রেফতার কে এই মোজাফফর