কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। তবু কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পর্যটকরা।
সবশেষ শনিবার (১ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অক্ষর শৌভিক রায় (৩০) নামের একজন পর্যটক। তিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের বানিয়াখামার এলাকার স্যার ইকবাল সড়কের বাসিন্দা শেখর রায়ের ছেলে।
একই রকম ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালের ২০ মে। ওই দিন দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় সমুদ্রের পানিতে ছিটকে পড়ে আহত হয়েছেন এক নারী পর্যটক। ওই ঘটনায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল প্যারাসেইলিং কার্যক্রম। প্রশাসনের দাবি ছিল, নিয়ম না মেনে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছিল প্যারাসেইলিং। তবে পরে আবারও এটি চালু করা হয়।
গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটক ঝাউগাছের ডগায় আটকে দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিলেন। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও সে ঘটনার পরদিন জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।
একই বছরের আরেক ঘটনায় এক নারী পর্যটক প্যারাসেইলিং চলাকালে সমুদ্রে পড়ে আহত হন। তখনও জেলা প্রশাসন নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। প্রশাসনের ভাষ্য ছিল, নিরাপত্তা বিধি না মেনে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছিল।
একের পর এক দুর্ঘটনার কারণ কী
পর্যটক, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সৈকতে একের পর এক প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, দক্ষ অপারেটরের ঘাটতি এবং প্রশাসনের নজরদারির অবহেলা।
সর্বশেষ ১ আগস্ট প্যারাসেইলিং করার সময় নিরাপত্তা হারনেস বা বেল্ট ছিঁড়ে সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর আগেও এই সৈকতে একাধিকবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে।
পর্যটকরা বলছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা, লাইফগার্ড ও আধুনিক উদ্ধার ব্যবস্থার অভাব এবং নিম্নমানের ও পুরোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করার এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলা প্রশাসন সব ধরনের প্যারাসেইলিং বন্ধ ঘোষণা করলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই রাইড চালানো হচ্ছিল।
দুর্ঘটনার পেছনে আরও যেসব কারণ
বৈরী আবহাওয়া ও বিপজ্জনক মৌসুমের কারণে জেলা প্রশাসন প্যারাসেইলিং সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে রাইড সচল রাখে।প্রতিকূল বাতাসে রশি ছিঁড়ে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এ ছাড়া অধিকাংশ পয়েন্টে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। লাইফ জ্যাকেট, বেল্ট ও সেফটি হারনেস অনেক পুরোনো ও জরাজীর্ণ। উড্ডয়ন অবস্থায় হঠাৎ করে মূল রশি আলগা হয়ে পর্যটকরা ছিটকে নিচে পড়ে যান।
কক্সবাজারের মূল সৈকতে লাইফগার্ড থাকলেও দরিয়ানগর বা হিমছড়ির দীর্ঘ ১১২ কিলোমিটার সৈকত এলাকায় কোনও লাইফগার্ড বা ডুবুরি থাকে না। আকাশ থেকে পর্যটক সমুদ্রে ছিটকে পড়ার পর তাৎক্ষণিক উদ্ধারের জন্য স্পিডবোট বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী প্রস্তুত থাকে না। গুরুতর আহত পর্যটকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
এ ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অনুমতির মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন ছাড়াই অবৈধভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছিল। রাইড পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা অনেকেই অদক্ষ এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে অক্ষম। পর্যটকদের সঠিক ও বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশনা না দিয়েই উড্ডয়ন করানো হয়।
কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিতার অভাব
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর প্রশাসন সাময়িক বন্ধের ঘোষণা দিলেও কয়েকদিন পর আবার নিয়ম না মেনেই রাইড চালু করা হয়। অপরাধী পরিচালকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বা কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় উদাসীনতা কাটছে না।
কক্সবাজারের পর্যটন সেলের ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয়দের মতে, সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে কারিগরি পরীক্ষা ও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই রোমাঞ্চকর রাইড পর্যটকদের জন্য একটি মরণ ফাঁদ হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে। এটি চালানো বন্ধ ঘোষণা করা হলেও অনেকেই গোপনে চালাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ এক যুগ ধরে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে। প্রায় সময় প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে পর্যটক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় প্রশাসন প্যারাসেইলিংয়ে নিষেধাজ্ঞা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি এটি চালু রেখেছিল।
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্যারাসেইলিং কার্যক্রম পরিচালিত হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অতীতেও একই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেলিং কার্যক্রমে দুর্ঘটনার ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনায় আসে। তবে এসব ঘটনার পরও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিং করার সময় সমুদ্রে পড়ে ওই পর্যটক গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
নিরাপত্তা ছাড়াই প্যারাসেইলিং
দরিয়া নগরসহ সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে বলে অভিযোগ করেন কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রায় সময় প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে পর্যটক আহত হন। আজ একজনের মৃত্যু হলো। কোনও প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, নেই প্রশিক্ষিত অপারেটর, উদ্ধার জলযান ও প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা। নিরাপত্তা মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত।
প্যারাসেইলিং করতে আসা ঢাকার পর্যটক কামাল উদ্দিন বলেন, প্যারাসেইলিংয়ের সঙ্গে থাকা মোটা রশি সমুদ্রের পানিতে রাখা একটি স্পিডবোটে বাধা হয়। এরপর প্যারাসেইলিং আকাশে উড়লে স্পিড বোট টেনে সেটিকে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যায়। প্যারাসেইলিংয়ে উড়তে পারে একজন। ওঠানামার বিষয়টি যে উড়ছেন তার হাতে থাকে। অনেকে আকাশে উঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তখন প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু দ্রুত উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বৈরী পরিবেশে প্যারাসেইলিং পরিচালনা এবং পর্যটকের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

কক্সবাজারে রোমাঞ্চের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ, এবার আরেক পর্যটকের মৃত্যু







