কোনও ধনসম্পদ রেখে যাননি ভারতের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী, রেখে গেছেন গাড়ি কেনার ঋণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৪৫ আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:০১

যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তীব্র খাদ্য সংকটের মধ্যেও শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন, সেই রাষ্ট্রনেতা নিজের মৃত্যুর পর বিশাল কোনও রাজপ্রাসাদ কিংবা বিপুল ধনসম্পদ রেখে যাননি। ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মৃত্যুর সময় রেখে গিয়েছিলেন কেবল একটি ফিয়াট গাড়ির অপরিশোধিত ঋণ এবং দেশের জন্য এক উজ্জ্বল, মহিমান্বিত রাজনৈতিক ঐতিহ্য।

ভারতে প্রতিবছর ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনের পাশাপাশি লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মবার্ষিকীও পালিত হয়। শাস্ত্রী কেবল দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে অবদান রেখে গেছেন তার জন্যই স্মরণীয় নন, বরং তার হাতে থাকা বিশাল ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত সাদামাটা জীবনযাপনের বৈপরীত্যই তাকে ইতিহাসজুড়ে অনন্য করে রেখেছে।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, সন্তানদের অনুরোধে তিনি যখন একটি ফিয়াট গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেটির দাম ছিল প্রায় ১২ হাজার রুপি। শাস্ত্রীর সঞ্চয় ছিল মাত্র ৭ হাজার রুপি। বাকি টাকা তিনি পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি) থেকে ঋণ হিসেবে নেন। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তাসখন্দে তার আকস্মিক মৃত্যুর সময়ও সেই ঋণের টাকা পুরোপুরি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে ঋণ মওকুফ করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও শাস্ত্রীর স্ত্রী ললিতা শাস্ত্রী তা বিনম্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে নিজের পারিবারিক পেনশন থেকেই তিনি সেই ঋণের অর্থ শোধ করেছিলেন। নয়া দিল্লির লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত সেই ফিয়াট গাড়িটি আজ আর কেবল একটি পুরোনো যানবাহন নয়; দেশের সর্বোচ্চ পদে থেকেও যে সাধারণ জীবনযাপন করা সম্ভব, এটি তারই নীরব প্রতীক।

১৯০৪ সালের ২ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের মুঘলসরাইয়ে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাস্ত্রী। শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে চরম কষ্টের মধ্যে বড় হতে হয় তাকে। পরবর্তীতে নিজের জাতিগত পদবি ‘শ্রীবাস্তব’ ত্যাগ করে কাশি বিদ্যাপীঠ থেকে অর্জিত ‘শাস্ত্রীয়’ উপাধিটিকে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি। রাজনীতিতে আসার পর নয়, বরং শৈশব থেকেই চরম অনাড়ম্বর জীবনযাপন ছিল তার সহজাত স্বভাব।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বহু আগেই নিজের সততা ও নৈতিকতার উদাহরণ তৈরি করেছিলেন শাস্ত্রী। ১৯৫৬ সালে একটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলে তৎকালীন রেলমন্ত্রী হিসেবে তিনি এর নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে চাননি, তবে শাস্ত্রীর অনড় অবস্থানের কারণে অবশেষে তা মেনে নিতে বাধ্য হন। পরে ১৯৬৪ সালের মে মাসে নেহরুর প্রয়াণের পর দেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শাস্ত্রী। সে সময় ভারতের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, তীব্র খাদ্য সংকট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হয়েছিল তাকে।

স্বল্প মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্ব সত্ত্বেও ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শাস্ত্রীর ভাবমূর্তিকে চিরতরে বদলে দেয়। ১৯৬৫ সালের আগস্টে পাকিস্তান কাশ্মির দখলের উদ্দেশ্যে ‘অপারেশন জিব্রালটার’ ও ‘অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ পরিচালনা করলে শাস্ত্রী কঠোর জবাব দেন। ৬ সেপ্টেম্বর তার নির্দেশে ভারতীয় বাহিনী পাঞ্জাব সীমান্ত পার হয়ে লাহোরের দিকে অগ্রসর হয়, যা পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ হতবাক করে দিয়েছিল। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রেম প্রকাশ তার ‘রিপোর্টিং ইন্ডিয়া: মাই সেভেন্টি-ইয়ার জার্নি অ্যাজ আ জার্নালিস্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, সীমান্ত পেরিয়ে লাহোর ও শিয়ালকোটের দিকে সেনা পাঠানোর শাস্ত্রীর ওই সাহসী সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক, যা যুদ্ধের পর তার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

যুদ্ধের সঙ্গেই দেশে দেখা দিয়েছিল তীব্র খাদ্য সংকট। দেশি গম উৎপাদন কম থাকায় ভারতকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। শাস্ত্রী তখন দেশবাসীকে সপ্তাহে অন্তত এক বেলা খাবার না খাওয়ার আহ্বান জানান, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘সোমবারের উপবাস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই সিদ্ধান্ত দেশবাসীর উদ্দেশে জানানোর আগে তিনি নিজের ঘরে তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা ও খাদ্য সংকট মোকাবিলার গুরুত্বকে একসূত্রে বেঁধে তিনি দেন বিখ্যাত স্লোগান, ‘জয় জাওয়ান, জয় কিষান’।

যুদ্ধবিরতির পর সমঝোতার জন্য তাসখন্দে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শাস্ত্রী। তাসের ওই আলোচনার নেপথ্যে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশেষ কূটনৈতিক চাপ। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক তাসখন্দ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন তিনি। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, ১১ জানুয়ারি তাসখন্দেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান নেতা। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৮ মাসের মাথায় তার এই জীবনাবসান ঘটে।

একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ একটি পারিবারিক গাড়ি কিনতে যাকে ঋণ নিতে হয়েছিল এবং যা পরিশোধ করতে হয়েছিল তার মৃত্যুর পর পরিবারকে, সেই ফিয়াট গাড়িটি আজও দিল্লির স্মৃতিসৌধে সাজানো রয়েছে। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর এই সহজ সরল যাপন এবং জাতীয় স্বার্থে নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্তগুলোই আজ ভারতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় প্রেরণা হয়ে টিকে রয়েছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
দ. কোরিয়ায় খালে আটকা হাঙরকে দেখতে লাখো মানুষের ভিড়
অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে চিনি খেলে কী ঘটে?
ইসরায়েলি উড়োজাহাজকে অবতরণের অনুমতি দিলো না আমিরাত
সর্বশেষ খবর
ফেরদৌসী মজুমদারের মেয়ে ত্রপার আক্ষেপ
ফেরদৌসী মজুমদারের মেয়ে ত্রপার আক্ষেপ
হেফাজতের আমিরের সঙ্গে রাশেদ খাঁনের কী কথা হলো?
হেফাজতের আমিরের সঙ্গে রাশেদ খাঁনের কী কথা হলো?
২০ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল এসেছে ২৯ হাজার টাকা
২০ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল এসেছে ২৯ হাজার টাকা
‘দর্শকরা কী ভাবলো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না’
‘দর্শকরা কী ভাবলো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না’
সর্বাধিক পঠিত
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
ফেসবুকে শেখ হাসিনার জন্মদিনের পোস্ট, স্কুলছাত্র কারাগারে
ফেসবুকে শেখ হাসিনার জন্মদিনের পোস্ট, স্কুলছাত্র কারাগারে
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
হরমুজে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান, তেহরানের হাতে বিকল্প কী?
হরমুজে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান, তেহরানের হাতে বিকল্প কী?
পাঁচ বছরে ৩২ দফায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম
পাঁচ বছরে ৩২ দফায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম