ফেসবুকে রাজনৈতিক মন্তব্যের জেরে নিজের দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে গালিগালাজ এবং তুলে আনার হুমকি দিয়েছেন কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা) আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। একজন আইনপ্রণেতার ভেরিফায়েড প্রোফাইল থেকে এমন কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ ও শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে। এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘হায়রে অপরাজনীতি, মিছিল করলো আওয়ামী লীগ, খুশি হলো গফুর লীগ, ব্যর্থ হলো এমপি, বিচার করবে জনগণ।’
ওই পোস্টের নিচে সৌরভ হোসেন সরওয়ার নামে এক যুবদল কর্মী মন্তব্য করেন, ‘মাননীয় এমপি মহোদয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় বোঝা যাবে যে আপনার সমন্বয়করা কতটুকু বিএনপিকে সুসংগঠিত করেছে।’ এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এমপির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালি দিয়ে লেখা হয়, ‘তোকে হিসাব করার জন্য কে দায়িত্ব দিছে?’
একই পোস্টে আলাউদ্দিন নাহিদ নামে ছাত্রদলের আরেক কর্মী মন্তব্য করেন, ‘ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করে দিলো বাপে, এখন ছেলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে বাপকে বলে আপনার কী অবদান আমার পেছনে। বিষয়টা এরকম হয়ে গেলো না? আপনি একজন বর্তমান এমপি, আমরা আপনাকে সম্মান করি। নিজের সম্মান ধরে রাখতে শিখুন, এখনও সময় আছে।’ এর জবাবে সংসদ সদস্য সরাসরি হুমকি দিয়ে লেখেন, ‘তোকে কানে আর গালে মারমু।’
একজন সংসদ সদস্যের আইডি থেকে এমন অশালীন ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি নজরে এলে নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হলে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া কোনও অনুতপ্ত হওয়া ছাড়াই গণমাধ্যমের কাছে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আমি যা লিখেছি সত্য লিখেছি। তাকে (সৌরভ) খোঁজা হচ্ছে ধরার জন্য। এটি কোনও এডিট করা স্ক্রিনশট নয়, আমি যা বলেছি সত্য বলেছি।’
নিজের ব্যবহৃত ভাষার পক্ষে সাফাই গেয়ে এমপি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি গালি দিয়েছি। তার বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা জারি করেছি, পেলে ধরে নিয়ে আসবো। বিএনপির ঘরানার লোক হয়ে আমাকে বেইজ্জতি করলে আমি কি তাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলবো? সোজাসাপটা হিসাব।’
তিনি আরও দাবি করেন, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে নিজ দলের লোকজনের এমন আচরণ তিনি মেনে নেবেন না।
তবে একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এমন ভাষা ও সরাসরি তুলে আনার হুমকিকে কাণ্ডজ্ঞানহীন ও শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে মন্তব্য করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
পেছনের ঘটনা কী
নাঙ্গলকোট উপজেলা ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার নাঙ্গলকোটে ছাত্রলীগের মিছিলের প্রতিবাদে বের করা ছাত্রদলের মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছাত্রদলের অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী। আহতদের অভিযোগ, হামলায় জড়িতরা কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারী ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী। আর আহতরা একই আসনে বিএনপির সাবেক এমপি আবদুল গফুর ভূঁইয়ার অনুসারী। মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে বিএনপির সাবেক এমপি আবদুল গফুর ভূঁইয়ার।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, নাঙ্গলকোটে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের ব্যানারে ১৫ আগস্ট ঘিরে গত বুধবার বিকালে উপজেলার ঢালুয়া বাজারে মিছিল বের করা হয়। উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান ভূঁইয়া বাছিরের ছোট ভাই হাসান খোরশেদ ফরহাদের নেতৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী ঢালুয়া বাজারের বিভিন্ন অলিগলি ও সড়কে মিছিল করেন। মিছিল চলাকালে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং বাজার এলাকার আনাচে-কানাচে ঘুরে শোডাউন করেন। পরে মিছিলটি ঢালুয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ১৩ আগস্ট নাঙ্গলকোটে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের মিছিলের প্রতিবাদ জানিয়ে উপজেলার ঢালুয়া বাইপাস এলাকায় মিছিল শুরু করেন উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে উপজেলা ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমান আহত হন।
উপজেলা ছাত্রদলের নেতা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রতিবাদ মিছিল শেষ করার আগেই আবদুল মমিন, আলী হাসান টিপু ও আব্দুর রহিম সুজনের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জন আমাদের দলের নেতাকর্মী আমাদের ওপর হামলা চালান। এতে আমির হামজা মুন্না, আমি ও মো. শহিদসহ ছাত্রদলের ১৫ নেতাকর্মী আহত হন। আমরা এখনও হাসপাতালে ভর্তি। আমরা ছাত্রলীগের মিছিলের প্রতিবাদে মিছিল করেছিলাম। সেখানে এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারীরা আমাদের ওপর হামলা করেছে। কার কাছে বিচার দেবো? উল্টো এমপির ফেসবুক পোস্টে কমেন্ট করায় আমাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।’
তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল মমিন বলেন, ‘আমরা হামলা করিনি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় উভয়পক্ষের মধ্যে সাময়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল।’
হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার ফেসবুক পোস্টে যারা মন্তব্য করেছে, আমি তাদের চিনি। বিএনপির নেতাকর্মীরা বিএনপির ওপর কেন হামলা করবে, বিষয়টি আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘সেদিনের বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ অবগত আছে। তবে কোনও পক্ষ থানায় অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









