চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে মুহাম্মদ করিম নামে এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানীহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত মুহাম্মদ করিম উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ঘটনার পর প্রায় এক ঘণ্টা সড়কের ওপর পড়ে ছিল তার লাশ। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে মোট ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হলো যুবদল কর্মী করিমের হত্যাকাণ্ড।
হত্যাকাণ্ডের পর কেরানীহাট বাজারসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের এলাকাও প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। জানা গেছে, শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানীহাট বাজারে যান করিম। এ সময় পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে একদল সন্ত্রাসী এসে তাকে ঘিরে ফেলে। তাদের একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় কোপ দেয়। এতে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এরপর অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে মোটরসাইকেলে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
বাজারের ব্যবসায়ী নুরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এই বাজারে এর আগে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারা কখনও দেখেননি। এ ঘটনার পর এলাকায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাউজান থানা পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, করিমের শরীরের তিনটি স্থানে (পেট, উরু ও নিতম্বে) গুলি লেগেছে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে গেছে। এ ছাড়া তার ঘাড় ও কপালে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না।
রাউজান উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম জানান, নিহত করিম দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফেরেন। এরপর বিএনপির বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। এলাকায় যুবদল কর্মী ও নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও তার কোনও আনুষ্ঠানিক পদ ছিল না।
স্থানীয় লোকজন জানান, করিমের পরিবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজার এলাকায় থাকতো। তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দেশে থাকার সময় তিনি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
রাউজান থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি একাধিকবার কারাগারেও ছিলেন।’
ওসি আরও বলেন, ‘তাকে কে বা কারা, কী কারণে খুন করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যার পর বাজারটি দ্রুত জনশূন্য হয়ে পড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার কারণ ও বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘করিমের শরীরে তিন জায়গায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে অস্ত্রধারীরা। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
উল্লেখ্য, রাউজানে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। এর আগে গত ১৩ জুন উপজেলার পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় একদল অস্ত্রধারীর গুলিতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ (৪৮) নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে বলে সূত্রটির দাবি করে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।









