চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকা থেকে গ্রেফতার আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের ৬৩ বিদেশিকে নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তাদের কাছে পাসপোর্ট ও ভিসা পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পাসপোর্ট পলাতক সহযোগীদের কাছে রয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছেন তারা। তারও সত্যতা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের ওই সহযোগীদের খুঁজছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার বিদেশিরা অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। এই চক্রের পলাতক হোতা মহসীন নামে এক ব্যক্তিকে খোঁজা হচ্ছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের দাবি অনুযায়ী, মহসীনের কাছেই থাকতে পারে গ্রেফতারকৃতদের পাসপোর্ট। তবে সেটি এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। গ্রেফতারের পর জানা যাবে আসল ঘটনা।
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নগরের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের ১ নম্বর বাড়ির আট তলা ভবনের পাঁচ তলায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ৬৩ বিদেশি নাগরিকের মধ্যে ৩২ জন লাওসের, ২০ জন পাকিস্তানের, একজন নেপালের, একজন ভিয়েতনামের এবং পাঁচ জন চীনের।
লাওসের ৩২ নাগরিক হলেন- টিয়েং, মান্স ভ্যান, কেও, টক, সিমোনেখাম, দাও, মিকো, আলী, সাকোনে, খোনে চাই, বুন মি, টয়ো, সুকসাখোন, সোলিসা, মানিভান চাঁথাফোন, ফুয়াং, মাইয়, বুনথাভি, কেওমানি, সিয়ামপাই, নি, নকসান্নিভাথ বুয়ালিয়েনফাই, সউফাভোন ভং সাই, থিলাকোন ফুন সা ভাথ, ইয়েলেং থর, সোমচিট জাইয়াভং, ফাইমানি সিসোমবুথ, ফেতসামগুয়ান কেওতা, সিলিফং ইনথাভং, থংজেউয়া চাঁথাভং, জায়খাথ বুয়াভান, সিভিলাই ও সোমফৌভান ফোমফিথ্যাক।
পাকিস্তানের ২০ নাগরিক হলেন- আহসান সাবির, মোহাম্মদ রিজওয়ান, মোহাম্মদ তালহা, মোহাম্মদ উসমান, মোহাম্মদ রমজান, মোহাম্মদ খান, নাভিদ খান, ফারহান উল্লাহ, রেহান আলী, ফাহাদ জামিল, খিজার ফারুক, জাইনাল-উল-আবিদিন, আলী আহমেদ, আমির জামান, আমজাদ, গোহার, হাম্মাদ, হুজাইফ খান, শাহজাদ খান ও সোনিয়া এবং মরিয়ম। গ্রেফতার অন্য বিদেশিদের মধ্যে নেপালের সরোজ, ভিয়েতনামের থুয়ং থি ডাং এবং চীনের লিউ গুয়াং শু, ঝাং কিন, ইয়াং ইয়ং বিও, লিউ কিয়াং ও ইয়াং ঝং হাই রয়েছেন।
পাওয়া যায়নি পাসপোর্ট-ভিসা
৬৩ বিদেশি নাগরিকের মধ্যে কারও কাছে পাওয়া যায়নি পাসপোর্ট-ভিসা। এ অবস্থায় কীভাবে তারা বাংলাদেশে এসেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাদের দাবি, পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে বৈধভাবে বাংলাদেশে এসেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছেন এমনটি। আসলে পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে তারা বাংলাদেশে এলেন কিনা, তারও সত্যতা এখনও মেলেনি। কারণ তারা যার কথা বলছেন, সে পলাতক।
মামলার এজাহারে পুলিশ উল্লেখ করেছেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছে পাসপোর্ট-ভিসা পাওয়া যায়নি। পাসপোর্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানান, তাদের পাসপোর্ট সহযোগী ও পলাতক ব্যক্তির হেফাজতে রয়েছে। এর মধ্যে মহসীন নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন তারা। এখনও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
মহসীনকে খুঁজছে পুলিশ
গ্রেফতার বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট জমা থাকা পলাতক ব্যক্তি মহসীনকে খুঁজছে পুলিশ। তিনিই ভবনটি ভাড়া নিয়ে ওই বিদেশিদের যাবতীয় কিছুর দেখভাল করতেন বলে জেনেছে পুলিশ।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে মহসীন নামে একজনের তথ্য পেয়েছি। তার কাছে পাসপোর্ট রয়েছে বলে গ্রেফতার ব্যক্তিরা দাবি করেছেন। তাকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তাকে গ্রেফতার করতে পারলে জানা যাবে, আসলে তাদের পাসপোর্ট আছে কিনা। তখন এও জানা যাবে, তারা ভিসা নিয়ে বৈধভাবে এসেছেন, নাকি অবৈধভাবে।’
অভিযানে যা যা উদ্ধার হলো
৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতারের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ বিপুল সংখ্যক ইলেকট্রনিক ডিভাইস। পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী, অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১৩৪টি ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মধ্যে রয়েছে- অ্যাপল ব্র্যান্ডের ৪৯টি মোবাইল ফোন। এসবের মধ্যে সাতটির ব্যাকপার্ট ভাঙা ছিল। এ ছাড়া অপো ব্র্যান্ডের ৫২টি, স্যামসাংয়ের ১০টি, ইনফিনিক্সের আটটি, ভিভোর পাঁচটি এবং বাকিগুলো রেডমি ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের। পাশাপাশি ৫৭টি ল্যাপটপও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া একটি অ্যাপল ব্র্যান্ডের ট্যাব, একটি গিগাবাইট ব্র্যান্ডের সিপিইউ, একটি স্যামসাং ব্র্যান্ডের মনিটর, একটি কি-বোর্ড ও একটি মাউস জব্দ করা হয়। গিগাবাইট ব্র্যান্ডের সিপিইউটির ভেতরে ৫১২ জিবির একটি এসএসডি হার্ডডিস্ক রয়েছে বলে জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি ইপসন ৩২১০ মডেলের প্রিন্টার এবং বিভিন্ন ধারণক্ষমতার পাঁচটি পেনড্রাইভ, চারটি মোবাইল ফোনের সিমকার্ডও জব্দ করা হয়। জব্দ তালিকা অনুযায়ী, এসব আলামত গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে জব্দ করা হয়।
মামলার এজাহারে কী আছে
এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর খুলশী থানায় মামলা করা হয়। সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের উপপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২১, ২২, ২৪ ও ২৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় থেকে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অনলাইন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।
মামলার এহাজারে বলা হয়, বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য দেশীয় ও বিদেশি কয়েকজন সহযোগী বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। এসব সহযোগীর মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তারা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের পাসপোর্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানান, তাদের পাসপোর্ট সহযোগী ও পলাতক নিয়োগকর্তার হেফাজতে রয়েছে। পরস্পর যোগসাজশে ওই বাসায় অবস্থান করে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধভাবে আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং আইনানুগ কর্তৃত্ববহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন।
যা বলছে পুলিশ
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘গ্রেফতার বিদেশি নাগরিকরা প্রায় দেড় মাস আগে ওই বাড়িটি ভাড়া নেন। বাড়িটি একজন দুবাইপ্রবাসীর। ওই বাড়িতে অবস্থান করে তারা সংঘবদ্ধভাবে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। তারা নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রযুক্তিগত বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করতেন।’
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য চক্রটির সঙ্গে দেশীয় ও বিদেশি কয়েকজন সহযোগীও রয়েছেন। এসব সহযোগীর মধ্যে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বর্তমানে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে। শুক্রবার ৬৩ বিদেশি নাগরিককে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।









