চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)-তে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ বন্ধসহ আট দফা দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শ্রমিকরা। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ।
রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে বন্দরের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সামনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগ শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার দাবি জানান তারা।
সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন। প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরীর সহ-সভাপতি মকবুল আহমদ ভূঁইয়া। আরও বক্তব্য দেন মুজাহিদুল ইসলাম আদনান, আমিনুল ইসলাম রুমেল, শাহ আলম, রেজাউল করিম সেলিম, আমানুল্লাহসহ শ্রমিক নেতারা।
বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রফতানি পণ্য এ বন্দরের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ২০২৪ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে আসছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার টার্মিনালগুলো পর্যায়ক্রমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
তারা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা করছেন না তারা। বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানান তারা। তবে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিচালিত এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবির মতো বিদ্যমান টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরোধিতা করছেন তারা।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি পরিচালনা করছে। লালদিয়ার চরে নতুন টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালেও বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, এসব টার্মিনালে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত। বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে তাদের কর্মসংস্থান ও বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত যেকোনও টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অন্তত ২০ শতাংশ দক্ষ জনবল নিয়োগের শর্ত রাখার দাবি জানান তারা।
এনসিটির অপারেশন ব্যবস্থাপনা নিয়েও আপত্তি জানান শ্রমিক নেতারা। তারা বলেন, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে পরিচালনার পরিবর্তে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বক্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রম শাখার অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের এনসিটিতে কাজের নিশ্চয়তা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে এনসিটি ও সিসিটির অপারেশন চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, জিসিবি বন্দরের নিজস্ব জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। জিসিবিতে দেশি বা বিদেশি কোনও অপারেটর নিয়োগ করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
সমাবেশ থেকে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য বোর্ড সভায় অনুমোদিত উৎসাহ বোনাস, পোর্ট অ্যালাউন্স, ঝুঁকি ভাতা ও সরকার অনুমোদিত গৃহনির্মাণ ঋণ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা, বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত টার্মিনালে বন্দর থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগ, এনসিটিতে ডকুমেন্টেশন ও পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাখা, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের নিশ্চয়তা, জিসিবিতে অপারেটর নিয়োগ বন্ধ, অনুমোদিত আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়ন, সিবিএ নির্বাচন এবং শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের দাবি জানানো হয়।