কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে খতনা করানোর পর অর্ধশতাধিক শিশুর ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণের ঘটনায় পরিস্থিতি দেখতে এবং অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিতে টেকনাফ থেকে একটি মেডিক্যাল টিম পাঠানো হয়েছে। বুধবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট থেকে টিমটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা হয়।
সেখানে পৌঁছে অসুস্থ শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অসুস্থতার কারণও খতিয়ে দেখবে মেডিক্যাল টিমটি।
টিমে রয়েছেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নওশাদ আলম কানন, ডা. আশরাফুল ইসলাম এবং উপসহকারী শাওখাত হোসেন মিতু। তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও পাঠানো হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. এনামুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, টেকনাফ থেকে দুই চিকিৎসকসহ একটি মেডিক্যাল টিম সেন্টমার্টিনে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পৌঁছে অসুস্থ শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিশুদের অসুস্থতার কারণও খতিয়ে দেখা হবে। মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও পাঠানো হয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর সেন্টমার্টিন অবকাশ রিসোর্টে ‘আল মোমিন সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সুন্নতে খতনা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের মেডিকেল টিম ওই কর্মসূচিতে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২১০ শিশুর খতনা করে।
সেন্টমার্টিন হাসপাতাল সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার পর্যন্ত দুই দিনে খতনা করানো ৫৫ শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ফয়সাল ও আইনুল ইসলাম নামে দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।
সেন্টমার্টিন হাসপাতালের উপসহকারী কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, গত দুই দিনে অর্ধশতাধিক খতনা করানো রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকের ইনফেকশন হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।
ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, খতনা করানোর সময় স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সতর্কতা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিশুর খতনা করানোর কারণে চিকিৎসাসেবায় অবহেলা হয়ে থাকতে পারে বলেও অভিযোগ তাদের।
দ্বীপের বাসিন্দা কবির আহমেদ বলেন, আমার শিশুর এখনও একই অবস্থা। মেডিকেল টিম এলে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো। এর আগে একটি মেডিক্যাল টিমের কাছে আমার ছেলে আইনুল ইসলামকে (৯) খতনা করিয়েছিলাম। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ওষুধও দিয়েছি। এরপর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য টেকনাফে রেফার করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রলার না পাওয়ায় তাকে টেকনাফে নেওয়া সম্ভব হয়নি। মেডিক্যাল টিম দ্বীপে পৌঁছালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হবে।
দ্বীপের বাসিন্দা শিক্ষক আয়াছ উদ্দিন কাজল বলেন, খতনা করানোর পর অর্ধশতাধিক শিশু রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ, দ্বীপের অধিকাংশ পরিবারই অসচ্ছল। কোনও শিশুর বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিলে তাদের উন্নত চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই শিশুদের অসুস্থতার কারণ কী এবং চিকিৎসায় কোনও ভুল বা অবহেলা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, টেকনাফ থেকে ওষুধপত্রসহ সেন্টমার্টিনে একটি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়েছে। তারা সেখানে পৌঁছে খতনা করানো শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবে। পাশাপাশি তাদের অসুস্থতার কারণও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, একটি মেডিক্যাল টিম নিয়ে আমিসহ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছি। দ্বীপে পৌঁছে খতনা করানো শিশুদের চিকিৎসা শুরু হবে। মেডিক্যাল টিম পৌঁছানোর পর অসুস্থ শিশুরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে বলে আশা করছি। তাই কাউকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করছি। পাশাপাশি শিশুদের বিষয়ে স্বজনদেরও সচেতন থাকতে হবে।
এদিকে খতনা কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসকদের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা সাড়া দেননি।