লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পূর্ব সাগর্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শায়েস্তানগর (বানাতুল মোসলেমিন) দাখিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ও পাঠদান কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠান দুটিতে ওয়াশব্লক ও সীমানাপ্রাচীর না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া বৃষ্টি হলেই মাঠের এক পাশে থাকা পরিত্যক্ত পুকুরের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এসব কারণে প্রতিষ্ঠান দুটিতে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। গত ২০ বছর ধরে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীকে ক্লাস করতে হচ্ছে।
এ দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রায়পুর উপজেলায় ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৫টি দাখিল মাদ্রাসা ও ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রশাসনিক ও পাঠদান কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা অফিস।
জানা যায়, ১৯৭০ সালে রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের পূর্ব সাগর্দি গ্রামে ৫২ শতাংশ জমির ওপর পূর্ব সাগর্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষানুরাগী এমদাদ উল্যা, আমিন উল্যা, অজিউল্যা ও অলিউল্যা। ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়। ২০১৩ সালে সেমিপাকা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও সেখানেই চলছে পাঠদান। চারটি কক্ষ থাকলেও ভবনটি জরাজীর্ণ এবং শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। অনেক আগেই দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে শতাধিক শিক্ষার্থীকে ক্লাস করতে হচ্ছে।
একই অবস্থা রায়পুর ইউনিয়নের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত শায়েস্তানগর (বানাতুল মোসলেমিন) দাখিল মাদ্রাসার। প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো দুইতলা ভবনের নিচতলায় একটি ছোট কক্ষে বসতে হয় প্রতিষ্ঠানটির সুপার, সহকারী শিক্ষক ও দফতরিকে। ফলে সংকীর্ণ ওই কক্ষেই কোনও রকমে চলছে দাফতরিক কার্যক্রম। এতে মাদ্রাসার সুপারসহ সাতজন সহকারী শিক্ষক ও একজন দফতরিকে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পুরোনো ভবনটির কক্ষগুলো স্যাঁতসেঁতে ও নোংরা হওয়ায় শিক্ষার্থীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এসব কারণে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।
মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জুনায়েদ জানায়, কয়েক দিন আগে তারা ভবনের পাশে বসে খেলছিল। এ সময় ভবন থেকে পলেস্তারা খসে তাদের পাশে পড়ে। এতে তারা খুব ভয় পেয়ে যায়।
পূর্ব সাগর্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আহাম্মদ বলেন, বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই নাজুক। সেমিপাকা ভবনের টিনের চাল, দরজা-জানালা দিয়ে বৃষ্টি ও বাতাসের সময় সমস্যা হয়। বইপত্র ভিজে যায়। দেয়ালে ফাটল থাকলেও ঝুঁকি নিয়েই শিশুদের পাঠদান করাতে হচ্ছে। গত ১০ বছরে তিনবার নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়া গেলেও জমি নিয়ে দাতা সদস্য অলিউল্যার দুই নাতির বিরোধের কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। ছয়জন শিক্ষক ও শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে আমরা চরম বিপদে আছি। শিশুরা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে।
শায়েস্তানগর বানাতুল মোসলেমিন দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মোহাম্মদ আমিন পাটোয়ারী বলেন, মহিলা মাদ্রাসাটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৭ সালে এমপিওভুক্ত হয়। গত ২০ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ে দুই শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। যেকোনও মুহূর্তে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী এবং প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর ক্ষতি হতে পারে। প্রতিটি কক্ষই জরাজীর্ণ। শিক্ষার্থীরা নিরাপদে ক্লাস করতে পারছে না। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অনেক আশা নিয়ে মাদরাসায় আসে। সেখানে এসে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর দায়ভার কে নেবে?
সামাজিক সংগঠক ও শিক্ষানুরাগী এমএ রহিম বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। নিরাপদ খেলার মাঠ, খেলাধুলার উপকরণ, ওয়াশব্লক ও পর্যাপ্ত সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষ গুণগত শিক্ষার অন্যতম উপাদান। তাই শিশুদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
রায়পুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগ রয়েছে। তবে সরকারি বিদ্যালয় ও এমপিওভুক্ত মাদরাসার কয়েকটি ভবনের অবস্থা খুবই নাজুক। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে জানানো হয়েছে।