সেন্টমার্টিনে আসছে পর্যটক, দ্বীপে ফিরেছে ‘ঈদের আনন্দ’

আব্দুর রহমান, সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে
০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২১:২৭ আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২১:২৭

দুপুর দেড়টা। সেন্টমার্টিন জেটিঘাটের পাশের একটি মুদির দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন জেলে মনজুর আলম (৬৫) ও মুদিদোকানি হামিদ হোসেন (৬০)। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হাসিমুখে গল্প করছিলেন তারা। কথার ফাঁকে উঠে আসে গত দুই বছরের দুঃসহ দিনগুলোর কথা। পর্যটক কম আসা, দ্বীপে রাতযাপনে বিধিনিষেধ আর বেচাকেনার মন্দায় সংসার চালাতে কতটা হিমশিম খেতে হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাও শোনান তারা। তবে এবার তাদের চোখেমুখে স্বস্তি আর নতুন আশার ঝিলিক।

এবারের পর্যটন মৌসুম নিয়ে জানতে চাইলে দুই জনের কণ্ঠেই ফুটে ওঠে আনন্দ। তাদের ভাষায়, দীর্ঘদিন পর যেন ‘ঈদের আনন্দ’ ফিরে আসছে দ্বীপে।

কথা হলে মনজুর আলম ও হামিদ হোসেন বলেন, ‘গত দুই বছর সেন্টমার্টিনে পর্যটনের ওপর বিধিনিষেধের কারণে সংসারে খুব টানাপোড়েন গেছে। পর্যটকদের রাতযাপন বন্ধ থাকাসহ পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেচাকেনা ছিল খুবই কম। আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন পর্যটনের ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় আমাদের ঈদের মতো খুশি লাগছে। আগের দুই বছর ঈদেও আমাদের মধ্যে সেই আনন্দ ছিল না।’

সেন্টমার্টিনে আসছে পর্যটক, দ্বীপে ফিরেছে ‘ঈদের আনন্দ’

শুধু মনজুর আলম ও হামিদ হোসেন নন, পর্যটননির্ভর সেন্টমার্টিনের অনেক বাসিন্দার প্রত্যাশা এবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের ব্যবসায়ী, জেলে, হোটেল-মোটেলসংশ্লিষ্ট কর্মী, নৌযান শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আশা। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে আবারও সচল হবে দ্বীপের অর্থনীতি এমন প্রত্যাশা তাদের।

এদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর  থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত শুরুর কথা ছিল। তবে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় নির্ধারিত দিনে তা শুরু হয়নি। ৫ নভেম্বর কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে।

সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়। রাত্রীযাপনসহ সাড়ে চার মাসে দিনে সাড়ে তিন হাজার পর্যটক ভ্রমণে যাবেন। কিন্তু এর আগে গত দুই বছর নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফেরা এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের সুযোগ ছিল। সে সময়ে দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতেন।

সেন্টমার্টিনে আসছে পর্যটক, দ্বীপে ফিরেছে ‘ঈদের আনন্দ’

সেন্টমার্টিনে আট বছর ধরে টমটম চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মোহাম্মদ ছিদ্দিক। পশ্চিম সৈকতে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পথে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুই বছর ধরে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ। পরিবারের আট সদস্য নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন মৌসুমে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের সবার মধ্যে কর্মব্যস্ততা ফিরেছে। পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন। হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। সবমিলিয়ে ঈদের আগে যেমন ব্যস্ততা দেখা যায়, দ্বীপে এখন অনেকটা তেমন পরিবেশ। আশা করছি, এবার আয় বাড়লে অন্তত কিছুটা ঋণের বোঝা কমাতে পারবো।’

দ্বীপের বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন। জীবিকার তাগিদে বছরের বেশির ভাগ সময় তাকে দ্বীপের বাইরে থাকতে হয়। তবে পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে এবার ফিরেছেন নিজ দ্বীপে। তিনি বলেন, ‘দ্বীপে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় আমার মতো অনেক যুবকই জীবিকার সন্ধানে বাইরে চলে গিয়েছিলেন। এবার পর্যটন মৌসুমে বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ায় তারা আবার ফিরছেন। কমপক্ষে দুই শতাধিক তরুণ পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শুধু ফটোগ্রাফি নয়, বাইক চালানোসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন আরও অনেকে। এতে দ্বীপে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।’

শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা তরুণ রহমত উল্লাহও পর্যটন মৌসুম ঘিরে মোটরসাইকেল নিয়ে সেন্টমার্টিনে এসেছেন। পর্যটকদের পরিবহনসেবা দিয়ে বাড়তি আয়ের আশায় পুরো মৌসুম দ্বীপে থাকার পরিকল্পনা তার। তিনি বলেন, ‘পুরো পর্যটন মৌসুম সেন্টমার্টিনে অবস্থান করবো। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি টমটমও ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করছি, এবার আগের তুলনায় আয়-রোজগার অনেক বাড়বে। সেই প্রত্যাশা থেকেই মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপে চলে এসেছি।’

স্থানীয়দের মতে, বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত প্রবালদ্বীপটির অধিকাংশ মানুষের জীবিকা পর্যটননির্ভর। কেউ দোকানপাট, কেউ মাছ ও সামুদ্রিক খাবার বিক্রি, আবার কেউ হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ কিংবা নৌযানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে পর্যটক কমলে সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের আয়ে। গত দুই মৌসুমের স্থবিরতা কাটিয়ে এবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন দ্বীপবাসী।

সেন্টমার্টিনে আসছে পর্যটক, দ্বীপে ফিরেছে ‘ঈদের আনন্দ’

দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘জাহাজ চলাচল শুরু হলে দ্বীপের মানুষের জীবন-জীবিকায় আবারও গতি ফিরবে। কারণ, এখানকার অধিকাংশ মানুষ পর্যটননির্ভর। পর্যটন মৌসুম অনেকের কাছে ঈদের আনন্দের মতো। এ সময়টিকে ঘিরেই স্থানীয় মানুষের সারা বছরের আয়ের বড় একটি অংশ নির্ভর করে। তবে শুধু পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল না রেখে দ্বীপের মানুষের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত সরকারি উদ্যোগে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।’

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ জেলে ও পর্যটননির্ভর। এখানে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে জীবিকার তাগিদে অনেকেই দিনে এনে দিনে খান। পর্যটন বন্ধ বা সীমিত থাকলে তাদের আয়-রোজগারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই বছর পর পর্যটন ঘিরে দ্বীপের মানুষের মধ্যে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। তাদের মধ্যে ঈদের মতো আনন্দ বিরাজ করছে। পর্যটকদের বরণ করে নিতে দ্বীপবাসী প্রস্তুত। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।’

টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে দ্বীপের মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। কারণ, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ মানুষ পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুমে তাদের কর্মব্যস্ততা ও আয়-রোজগার দুটোই বাড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দ্বীপবাসী যেন পুরোপুরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন, সে বিষয়েও প্রচেষ্টা চলছে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের পরিবেশ সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

/এফআর/
সম্পর্কিত
১৪ দিন ধরে অচল সাজেক: তীব্র খাদ্য সংকট, সংকট সমাধান করবে কে?
নেপালে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন ভারতীয় পর্যটক
ভিস্তাডোম ট্রেনকে টেক্কা দিতে গুজরাতে চালু কাচের ছাদযুক্ত পর্যটক বাস
সর্বশেষ খবর
১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতারা, ভাগাভাগি নিয়ে যুবদল নেতাকে খুন
১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতারা, ভাগাভাগি নিয়ে যুবদল নেতাকে খুন
ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান ও রাজীব ঘোষ: সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ
ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান ও রাজীব ঘোষ: সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ
ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, ৫ নেতা আহত
ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, ৫ নেতা আহত
ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামোর আশ্বাস: তবুও কেন ‘অনিশ্চয়তায়’ শ্রমিকরা
ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামোর আশ্বাস: তবুও কেন ‘অনিশ্চয়তায়’ শ্রমিকরা
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
৭ নভেম্বর ঘিরে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচি, থাকছে সাধারণ ছুটি
৭ নভেম্বর ঘিরে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচি, থাকছে সাধারণ ছুটি