জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির র্যালিকে ঘিরে ফেনীর দাগনভূঞা পৌর শহরে মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ ও বিশেষ পোশাক পরা ব্যক্তিদের অস্ত্র হাতে মহড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে বন্ধ হয়ে যায় অধিকাংশ দোকানপাট। ব্যাহত হয় যান চলাচল, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষজন। এ ঘটনায় বিএনপির একাধিক নেতা হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের প্রশ্ন, তারা কারা? ঐক্য ও সংহতির কর্মসূচিতে এমন মহড়া ও বিস্ফোরণ কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে, ক্ষুণ্ন হচ্ছে দলের ভাবমূর্তি।
রবিবার (৮ নভেম্বর) বিকাল সোয়া ৪টার দিকে দাগনভূঞা পৌর শহরের সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজের সামনে থেকে র্যালিটি বের হয়। এতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, র্যালিটি সরকারি আতাতুর্ক আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের ফটক এলাকায় পৌঁছালে নিউ সুলতান মার্কেট ও জিরো পয়েন্টে কয়েক দফায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। র্যালি শেষে নেতাকর্মীরা কলেজ রোডের দিকে যাওয়ার সময়ও আবার বিস্ফোরণ হয়। তাদের দাবি, র্যালির আগে ও পরে অর্ধশতাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। বিকট শব্দে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় আশপাশের এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আতঙ্কিত পথচারীদের ছোটাছুটি করতে দেখা যায়।
র্যালির নিরাপত্তায় হলুদ রঙের বিশেষ পোশাক, মাথায় হেলমেট ও মুখে মাস্ক পরা দুই শতাধিক ব্যক্তিকে লাঠি হাতে অংশ নিতে দেখা যায়। তাদের কারও কারও হাতে ব্যাগও ছিল। ব্যাগে কী ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রকাশ্য সড়কে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির এমন পোশাক ও লাঠি হাতে অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে।
এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন জেলা বিএনপির নেতারাও। জেলা বিএনপির অন্যতম সদস্য মাহবুল হক রিপন বলেন, বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মতো কর্মসূচিতে এ ধরনের অপতৎপরতা ও মহড়া সাধারণ মানুষের কাছে খারাপ বার্তা দিয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে।
জেলা বিএনপির সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের সামনেই শোভাযাত্রায় কিছু লোক হলুদ গেঞ্জি পরে ব্যাগভর্তি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে। এ ঘটনায় আমরা শঙ্কিত ও আতঙ্কিত। দাগনভূঞার মানুষের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অস্ত্রের প্রদর্শনী কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জেলা বিএনপির সদস্য কাজী সাইফুর রহমান স্বপন বলেন, আমরা শান্তি চাই। এ ধরনের মহড়ায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জনগণের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাওয়ার পরিবর্তে ভীতি ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।
র্যালি শেষে জিরো পয়েন্টে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন বলেন, দাগনভূঞার মাটিতে কোনও সন্ত্রাসীর স্থান হবে না। বিএনপি বড় দল হওয়ায় অনেক কর্মী-সমর্থক নেতৃত্বের অপেক্ষায় আছেন। সব মান-অভিমান ভুলে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তবে ককটেল বিস্ফোরণ ও বিশেষ পোশাকধারীদের মহড়া নিয়ে তিনি আলাদা কোনও বক্তব্য দেননি।
দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়জুল আজিম নোমান বলেন, বিএনপির কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণ কারা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তার জানা নেই।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দাগনভূঞা বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছে। গত ২ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও পুলিশসহ অন্তত ৪৫ জন আহত হন। এর আগের বছর ৫ আগস্ট দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ৩০ জন। এসব ঘটনায় দায়ের করা পৃথক দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন।
দলীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন এবং বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা জামশেদুর রহমান ফটিকের পক্ষের মধ্যে অর্ধশতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিনের এই বিরোধের মধ্যে নতুন করে র্যালিকে কেন্দ্র করে ককটেল বিস্ফোরণ ও লাঠি হাতে মহড়ার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।