জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ 

রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৩০আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:০৭

সাময়িক বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে পে-অর্ডারের দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। মহানগরের কোনাবাড়ি প্রিমিয়ার ব্যাংকের শাখা থেকে ওই টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর কোনও হিসাব সিটি করপোরেশনের হিসাব বিভাগে লিপিবদ্ধ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের হোল্ডিং ট্যাক্স, প্ল্যান অনুমোদনের জন্য যেসব পে-অর্ডার করেছিল, এমন পাঁচটি পে-অর্ডার ব্যাংকের ওই শাখায় জমা করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যাংক হিসাবটি প্রচলিত নিয়ম মেনে খোলা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের যেকোনও অ্যাকাউন্ট সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রিমিয়ার ব্যাংকের অ্যাকাউন্টটি বরখাস্ত মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম তার নিজ নাম ও স্বাক্ষরে পরিচালনা করতেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে না পেয়ে এক বছর পর হিসাবটি বন্ধও করে দেয়। কিন্তু ততদিনে পে-অর্ডারের মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের কোনাবাড়ি শাখায় ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নামে একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। সাময়িক বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ওই হিসাবটি (নম্বর: ০৩৫১১১০০০০০৫৭৮) খোলেন। 

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ওই হিসাবে ইস্পাহানি ফুড লিমিটেডের পক্ষে ৪০ লাখ ২৫ হাজার, ফিন বাংলা অ্যাপারেলসের পক্ষে ৫০ লাখ, হানিওয়েল গার্মেন্টস লিমিটেড ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৪০৫, জিএমএস কম্পোজিট নিটিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পক্ষে দুটি পে-অর্ডারের একটি ৬৭ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯০ এবং অপরটি ৮৫ লাখ টাকা জমা হয়।

পাঁচটি পে-অর্ডারের বিপরীতে মোট ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৫ টাকা জমা হয়। এরপর ছয়টি চেকের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এর কোনও হিসাবই সিটি করপোরেশনের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।

ব্যাংক হিসাবের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, সেখানে মো. জাহাঙ্গীর আলম তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর এবং ঠিকানা হিসেবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন উল্লেখ করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অবশ্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার জন্য মো. জাহাঙ্গীর আলমকে বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। কিন্তু এক বছরেও জাহাঙ্গীর আলম নথিপত্র ব্যাংককে সরবরাহ করেননি। তিনবার করোনার অজুহাত দেখিয়েছেন। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এক বছর মেয়াদ অতিক্রম হওয়ার পর ৩ মার্চ ২০২১ সালে হিসাবটি বন্ধ করে দেন।

ফিন বাংলা অ্যাপারেলস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ ও হিসাব) সাইফুল আলম বলেন, এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড গরিবে নেওয়াজ শাখা থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে মেয়র গাজীপুর সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স হিসেবে ৫০ লাখ টাকার পে-অর্ডার মেয়রের হাতে দেওয়া হয়।

ইস্পাহানি ফুড লিমিটেডের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের নির্বাহী গোলাম রব্বানী বলেন, কারখানার প্ল্যান অনুমোদনের জন্য ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে মেয়র, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অনুকূলে ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকার পে-অর্ডার করা হয়। পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে পে-অর্ডার দিয়ে রিসিভ কপি সংগ্রহ করা হয়।

 পে-অর্ডারের টাকা তিনবারে ৩০ লাখ করে ৯০ লাখ, একবার এক কোটি, ৫০ লাখ এবং ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। জাহাঙ্গীর আলম, তার বাড়ির কেয়ারটেকার শহীদুল, পলো চাকমা এবং জনৈক শামীম হোসাইন চেকের মাধ্যমে টাকাগুলো উত্তোলন করেন।

কোনাবাড়ি শাখার প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপক এম মোর্শেদ খান বলেন, হিসাবটি চালু ও বন্ধের সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের হিসাব অবশ্যই দুজন একত্রে পরিচালনা করবেন, এককভাবে কোনও অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করার সুযোগ নেই। হিসাবটি খোলার জন্য সিটি করপোরেশনের কোনও রেজ্যুলেশনও হিসাবের নথিতে পাওয়া যায়নি। মূলত এসব কারণেই ব্যাংক হিসাবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সিটি করপোরেশনের নামে বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের একক স্বাক্ষরে কোনাবাড়ি প্রিমিয়ার ব্যাংক শাখায় একটি অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। আমরা জানতে পারি ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। ব্যাংক থেকে আমরা অ্যাকাউন্ট ও লেনদেন সংক্রান্ত কাগজপত্র পেয়েছি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত দল তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আশা করছি তদন্ত কার্যক্রম শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

দুদকের সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান আশিক বলেন, সিটি করপোরেশনের কয়টি ব্যাংকে কয়টি হিসাব, কার নামে কীভাবে পরিচালিত হয়েছে বা হচ্ছে সেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাছাড়া গাজীপুরের কোনাবাড়িতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিটি করপোরেশনের নামে জাহাঙ্গীর আলম একক স্বাক্ষরে অ্যাকাউন্ট খুলে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাময়িক বরখাস্ত মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মোবাইল ফোনে এই বিষয়ে জানতে একাধিকবার কল করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।  

 

/টিটি/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গাজীপুর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা, জায়গা হয়নি জাহাঙ্গীরের
গত দুই নির্বাচনে ‘কামডা’ আমরাই কইরা দিছিলাম: জাহাঙ্গীর আলম
গাজীপুর থেকে এমপি হতে চান জাহাঙ্গীর আলম
সর্বশেষ খবর
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী