জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বর্তমানে দেশের প্রায় সবকটি জেলার ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার কোনও কোনও ফিলিং স্টেশনে দুই-তিন দিন পর পর তেল দেওয়া হয়। ফলে ওই দিনগুলোতে স্টেশন বন্ধ রাখেন মালিকরা। যখন তেল পাওয়া যায় তখন চালু করা হয়।
ফিলিং স্টেশনের মালিকরা বলছেন, রেশনিংয়ের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তাতেও কোনও কাজ হচ্ছে না। সংকট থেকেই যাচ্ছে। রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই সংকট কাটবে বলে মনে হয় না। পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ পাওয়া গেলে তখনই সংকট কাটবে।
চট্টগ্রামের ৩৮৩ ফিলিং স্টেশনের অর্ধেকেই মেলে না তেল
নগরের পাঁচলাইশ থানার হাটহাজারী রোডের হামজারবাগ এলাকায় অবস্থিত এম আই বি সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, তেল দেওয়া হচ্ছে না। শুধুমাত্র গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। পাম্পটির কর্মচারীরা জানিয়েছেন, রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার এই পাম্পে অকটেন-ডিজেল বিক্রি করা হয়নি। সর্বশেষ গত শনিবার কয়েক ঘণ্টার জন্য বিক্রি করা হয়েছিল। ডিপো থেকে গাড়ি না আসায় তেল বিক্রি করা যাচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভাগের ৩৮৩টি পাম্পের মধ্যে বেশিরভাগই দিনের অর্ধেক সময় বন্ধ থাকছে। নগরের টাইগারপাস এলাকায় অবস্থিত এজেন্সিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মেশিনের ওপরে লিখে রাখা হয়েছে অকটেন নেই। কর্মচারীরা জানান, যমুনা অয়েল লিমিটেডের ডিপো থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার তেল আসার কথা রয়েছে। সেটি পৌঁছালে বিক্রি শুরু করা হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, বিভাগে পাম্প আছে ৩৮৩টি, এজেন্ট ডিস্টিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন এবং প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ২৫৫ জন। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম নগরে পাম্প আছে ৬২টি। অর্ধেকের বেশি দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। কোনও পাম্প সকালে বন্ধ থাকলে আবার বিকালে তেল পাওয়ার পর চালু করা হয়।
পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বেশ কিছু পাম্পে গত একমাস ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মিলছে না। দিনের বেশিরভাগ সময় অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকছে। কোনও কোনও পাম্পে অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। আবার কোনও পাম্পে ডিজেল থাকলেও নেই অকটেন। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
দেশে তেল আমদানির দায়িত্বে রয়েছে বিপিসি। আর সরবরাহ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অনেক ফিলিং স্টেশন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ চাহিদা দিচ্ছে। এতে চাপ তৈরি হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৬২টির মতো পাম্প আছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের ঘাটতি বেশি। তেল যা পাওয়া যায় তাতে চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।’
বরিশালেও একই অবস্থা
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় মোট পেট্রোল পাম্প রয়েছে ৫৭টি। এর মধ্যে বরিশালে ৩০টি, ঝালকাঠিতে আটটি, পিরোজপুরে পাঁচটি, ভোলায় ছয়টি, পটুয়াখালীতে আটটি ও বরগুনায় তিনটি। তেল সংকটের পর থেকে বেশিরভাগ সময় পাম্পগুলোতে তেল থাকে না। এতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যানবাহন ও নৌযান চালকদের। বিশেষ করে ডিজেল সংকটে সাগরে বা নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না জেলেরা। তবে কিছু সংখ্যক জেলে অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনে ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে যাচ্ছেন।
পোর্ট রোডের আড়তদার জহির শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক ব্যারেল (২০০ লিটার) ডিজেলের সরকারি মূল্য ২১ হাজার টাকা। তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকায়। তাও আবার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে একপ্রকার মাছ শিকার বন্ধই রয়েছে জেলেদের।’
বরিশাল পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আকবর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পাম্পে তেল থাকে না। তবে কোনও পাম্প বন্ধ রাখা হয় না। তেল না থাকলে মেশিনের ওপর নাই শব্দটি কাগজে লিখে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সবাইকে। রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ক্রেতার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে হচ্ছে পাম্প মালিকদের। কর্মচারীরা ক্রেতার হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন।’
রাজশাহীর ৪৬টি পাম্পের ৩৬টিতেই নেই তেল
রাজশাহী জেলা ও মহানগর মিলে নিবন্ধিত জ্বালানি তেলের ফিলিং স্টেশন আছে ৪৬টি। এর মধ্যে প্রতিদিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০টিতে। বাকিগুলো থাকছে বন্ধ। যেগুলোতে তেল বিক্রি হচ্ছে সেগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কেউ কেউ রাত থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। তেলের সংকটে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। অনেক কৃষক শ্যালো ইঞ্জিন নিয়ে তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে আসছেন।
জেলার ১০টি পাম্পে তেল সরবরাহ করতে দেখা গেছে। বাকিলো ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে সচল পাম্পগুলোতে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের জন্য কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ ব্যক্তি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
এদিকে তেলের জন্য জমিতে সেচ দিতে পারছেন না চাষিরা। ফিলিং স্টেশনগুলোতে বোরো চাষিরা তেল নিতে শ্যালো মেশিন নিয়ে আসছেন।
এক মাস ধরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে রেলওয়ের ডিপোতে জ্বালানি তেল আসছে না। আগে ওয়াগনে আসা তেল রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ডিপো থেকেই নিতে পারতেন ফিলিং স্টেশনের মালিকরা। এখন এখানে তেল না থাকায় সড়কপথে আনতে হচ্ছে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে। এতে খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) খুলনার দৌলতপুর ডিপো থেকে আর তেল দিচ্ছে না। তাই তারাও তেল আনছেন না।
বাগমারার হাটগাঙ্গোপাড়ায় অবস্থিত মেসার্স গাঙ্গোপাড়া ফিলিং স্টেশনের মালিক সারোয়ার জাহান সবুর জানান, ওয়াগনে তেল এলে তারা রেলস্টেশন লাগোয়া ডিপো থেকে নিতেন। এতে খরচ কম হতো। এখন লরিতে করে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে সড়কপথে আনতে হয়। এতে খরচ বেড়েছে তিন গুণ।’
সরকারি তেল কোম্পানি পদ্মা অয়েলের রাজশাহীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আগে পাম্পগুলোতে যে তেল সরবরাহ করা হতো, এখনও প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এ সংকটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দৌলতপুর ডিপো থেকে তেল দিতে পারছে না। আমরাও আর ওয়াগনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারছি না। এখন ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে।’
একই কথা বলেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিপিসি সরবরাহ দিচ্ছে না বলেই খুলনা থেকে রেলপথে তেল আসছে না। তবে বিপিসির সঙ্গে ভারতের আলাপ হচ্ছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর দিয়ে ভারত তেল দেবে। সেটি হলে পার্বতীপুর থেকে ওয়াগনে তেল আনা হবে। তখন বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের ডিলাররা সুবিধা পাবেন।’
রাজশাহী পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মমিনুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেল উত্তোলনকারী কোম্পানি বা ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের হাতে তেল নেই। তাই আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের কিছুই করার নেই।’
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেলের জন্য আমরা ফুয়েল কার্ড চালু করছি। যাদের তেল প্রয়োজন তারা পাবেন। রাজশাহীর বাইরে থেকে অনেকে এসে তেল নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকে তেল থাকা সত্ত্বেও নিচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করছি আমরা। আশা করছি, প্রয়োজন অনুযায়ী সবাই তেল পাবেন।’
ময়মনসিংহে দিনের কিছু সময় খোলা, বেশিরভাগ সময় বন্ধ
ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহে ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১১৫টি। এর মধ্যে সাতটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে আছে। বাকি বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন খোলা থাকলেও তেল সংকটের কারণে দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে তেল সরবরাহ না করায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে এ অবস্থা দেখা দিয়েছে। যেগুলো দিনের কিছু সময় খোলা থাকছে সেগুলোতে তেলের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন চালকরা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেলের চালকরা। কোনও একটি ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল কিংবা অকটেন পাওয়া যাচ্ছে খবর শুনলে চারদিক থেকে সেখানে এসে চালকরা হাজির হয়ে দীর্ঘ লাইন দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন। এর মধ্যে কেউ পাচ্ছেন, কেউ খালি ফিরে যাচ্ছেন।
ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, চাহিদার অর্ধেক ডিপো থেকে সরবরাহ করায় তেল সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে যানবাহন চালকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছেন না তারা।
বিভাগের শেরপুর জেলায় ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে একটি বন্ধ আছে। বাকিগুলো খোলা থাকলেও তেল সংকটে দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে।
শেরপুর জেলা পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও বাবর ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শেরপুর জেলায় ১১টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ১০টি সচল আছে। সদরের সাপমারি এলাকার আবুল হাসেমের মালিকানাধীন এসএস ফিলিং স্টেশন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর থেকে বন্ধ হয়ে আছে। এরপর থেকে ওই ফিলিং স্টেশনটি আর চালু করা হয়নি। বাকি ফিলিং স্টেশনগুলো দুই-তিন দিন পরপর ডিপো থেকে জ্বালানি তেল এনে সরবরাহ করছে।’
নেত্রকোনায় ফিলিং স্টেশন রয়েছে ১৮টি। সবগুলোই সচল আছে। নেত্রকোনা পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সজীব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলার ১৮টি পেট্রোল পাম্পের সবগুলো সচল আছে। তবে ডিপো থেকে সময়মতো তেল না পাওয়ায় মাঝেমধ্যে বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ রাখতে হয়। আবার তেল পাওয়ার পর সেগুলো সচল হয়। এ কারণে যে পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয়, সেখানে চালকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। যতক্ষণ তেল থাকে আমরা চালকদের মাঝে ততক্ষণই সরবরাহ করে থাকি। ডিজেলের সংকট তেমন একটা না থাকলেও পেট্রোল এবং অকটেনের সংকট রয়েছে বেশি।’
জামালপুর জেলায় ফিলিং স্টেশন ২০টি। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে তিনটি বন্ধ। সদরের এমএস ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী সোলায়মান হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় ২০টি ফিলিং স্টেশন আছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। বাকি ১৭টি ডিপো থেকে তেল পেলে সচল রাখা হয়। না পেলে বন্ধ রাখা হয়। সরকারের নির্দেশনা মেনে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আসছেন পাম্প মালিকরা।’
এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলায় ফিলিং স্টেশন রয়েছে ৬৬টি। এর মধ্যে তিনটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ময়মনসিংহ জেলা পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় ৬৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৬৩টি স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কিন্তু তিনটি দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় মুক্তাগাছার মারুফ ফিলিং স্টেশনে ভাঙচুর এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে বন্ধ আছে। আরেকটি ফিলিং স্টেশন ময়মনসিংহ নগরীর রহমতপুর এলাকায় আগুন লেগে পুড়ে যাওয়ায় তা বন্ধ আছে। অপরটি নান্দাইল উপজেলায় মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে পাম্প পরিচালনা করতে না পারায় স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রেখেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেট্রোল পাম্প মালিকরা আগে ডিপো থেকে যে পরিমাণ তেল পেতেন গত ১৫-২০ দিন ধরে তার অর্ধেকও পাচ্ছেন না। যা পাওয়া যায়, তাও আবার দুই থেকে তিন দিন পর পর। তবে ডিজেলের খুব একটা সংকট নেই। ডিপো থেকে পেট্রোল এবং অকটেন পাওয়ার সাপেক্ষে সরবরাহ করা হয়। তবে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারায় প্রত্যেকটি পাম্পেই ভিড় দেখা যায় চালকদের। তাদের মাঝে তেল সরবরাহ করতে গিয়ে পেট্রোল পাম্প কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হয়।’
খুলনায় তেল পেলে চালু, না হয় বন্ধ
খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ও ফরিদপুরে ২৬০টি ফিলিং স্টেশন আছে। এর মধ্যে সবগুলো সচল। তবে দুই-তিন দিন পর পর জ্বালানি তেল পাচ্ছে স্টেশনগুলো। ফলে যেদিন তেল পায় না, সেদিন বন্ধ রাখতে হয়।
খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার তালিকা অনুযায়ী খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ২৬০টি ফিলিং স্টেশন সচল রয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ২৯টি, যশোরে ৬৩টি, বাগেরহাটে ২২টি, কুষ্টিয়ায় ৩১টি, চুয়াডাঙ্গায় ২১টি, সাতক্ষীরায় ২৭টি, মাগুরায় ১১টি, নড়াইলে ১০টি, মেহেরপুরে ১৫টি, ঝিনাইদহে ৩১টি। এ ছাড়াও সমিতির আওতায় গোপালগঞ্জে ১৫টি, রাজবাড়ীতে ১০টি ও ফরিদপুরে ৩৩টি ফিলিং স্টেশন আছে। সেগুলোও সচল আছে। তবে তেল না পেলে বন্ধ রাখতে হয়।
খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, ‘কিছু দিন ধরে সবগুলো স্টেশনে তেলের সংকট চলছে। সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কিছু দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এখনও সংকট নিরসন হয়নি। কবে নাগাদ হবে, তা জানি না।’
কেসিসি পেট্রোলিয়ামের সুপারভাইজার মো. মুজিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৭ এপ্রিল আট হাজার লিটার তেল পেয়েছি। কেসিসির প্রয়োজনীয় তেল রেখে বাকিটা বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু রাত ৯টায়ও বন্ধ থাকা অবস্থায় পাম্পে দেড় শতাধিক মোটরসাইকেল অপেক্ষায় আছে।’
খুলনা ট্যাংকলরি মালিক সমিতির সদস্য মুরাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেলের সংকট কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের অস্থিরতা উদ্বেগ ও মানসিকতা তেলের চেয়েও বেশি সংকটময়। তারা তেল নিয়ে ঘরে মজুত করতে তৎপর। অনেকে খোলা বাজারে বিক্রি করছেন। করোনার সময় এর চেয়েও বেশি সংকট ছিল। কিন্তু তখন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এখন মানুষ অধৈর্য হয়ে উঠেছে। এজন্য যানবাহন চালকদের মানসিকতার পরিবর্তন সবার আগে দরকার।’
রংপুরে মিলছে না চাহিদার অর্ধেক তেল
রংপুর বিভাগের সব জেলায় বর্তমানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। পেট্রোল ও অকটেনের অভাবে বিভাগের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। কিছু পাম্প খোলা থাকলেও সেখানে পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না, শুধুমাত্র সিএনজি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
অপরদিকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ না করায় কৃষকরা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আট জেলায় ফিলিং স্টেশন আছে ৩৫০টি। এর মধ্যে ২০টি বাদে বাকিগুলা সচল আছে। আট জেলার যানবাহন ও সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন ১০ লাখ লিটার। সেখানে বিভিন্ন ডিপো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে আট লাখ থেকে নয় লাখ লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন ডিজেলের সংকট থাকছে এক থেকে দুই লাখ লিটার।
পেট্রোলের চাহিদা প্রতিদিন পাঁচ লাখ ১০ হাজার লিটার। ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে দুই থেকে সোয়া দুই লাখ লিটার। একইভাবে অকটেনের চাহিদা দুই লাখ ৭৫ হাজার লিটার হলেও ডিপো থেকে দেওয়া হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার লিটার। ফলে কোনোভাবেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের সংকট নেই। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঠিকমতো সরবরাহ করা হচ্ছে। এরপরও তেলের সংকটের কথা বলে যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভাগের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আফজাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জ্বালানির তীব্র সংকট আছে। একটি তেলবাহী লরিতে নয় হাজার লিটার জ্বালানি নেওয়া যায়। সংকটের আগে ট্যাংকলরি ভর্তি তেল সরবরাহ পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন চাহিদার অর্ধেক কখনও তারও কম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের চাহিদা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।’
নগরীর শাপলা চত্বরের ইউনিক ট্রেডার্স ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার রিপন জানান, ডিপোগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাওয়া যায় না। আবার সময়মতো না আসায় কখন বিতরণ শুরু হবে তাও আগাম জানানো যাচ্ছে না চালকদের। ট্যাংকলরি সকালে আসার কথা থাকলেও দুপুরে আসে, আবার আসে না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মোটরসাইকেলে ২০০ আর প্রাইভেটকারে ১ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।
সিলেটে সংকট সীমিত
সিলেটে জ্বালানি তেলের তেমন সংকট না থাকলেও লজিস্টিক সাপোর্টের সংকটে ভুগছে উপজেলা পর্যায়ের ফিলিং স্টেশনগুলো। ডিপো থেকে উপজেলা পর্যায়ের ফিলিং স্টেশনগুলোর জন্য নির্ধারিত পরিমাণ তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তেল পরিবহনের খরচ জোগান দিতে না পারায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন মালিকরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ামের ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট ও পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রিয়াশাদ আজিম হক আদনান বলেন, ‘সিলেট বিভাগে ১১৮টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে ৭৭, মৌলভীবাজারে ২৫, হবিগঞ্জে ৩৪ ও সুনামগঞ্জে ২৩টি।’
তিনি বলেন, ‘সিলেট নগরীতে বর্তমানে জ্বালানি তেল নিয়ে কোনও সমস্যা দেখা যাচ্ছে না। তবে উপজেলা পর্যায়ের পাম্প মালিকরা কিছু সমস্যার মধ্যে আছেন। উপজেলা পর্যায়ে একটি পাম্পের জন্য এক হাজার লিটার তেল বরাদ্দ করা হলে পরিবহন খরচ নিয়ে মালিকরা পোষাতে পারছেন না। ছোট পাম্পগুলোর তেল পরিবহনের নিজস্ব লরি নেই। তাদের পুঁজিরও সংকট আছে। লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে পাম্পগুলো সমস্যায় রয়েছে। সেখানে পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা তেমন থাকে না, সেসব পাম্পে কেবল ডিজেলের চাহিদা থাকে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বরাদ্দ করা ডিজেল বিক্রি করে অনেকে পোষাতে পারছেন না।’
কোম্পানীগঞ্জের পাড়ুয়া ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী আলকাছ আলী বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে ড্রামে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে কৃষিকাজের জন্য প্রতিদিন ২০-২৫টি ড্রামে তেল বিক্রি করার অনুমতি আছে। পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় তেল বিক্রি নিয়ে আমাদের তেমন কোনও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট মহানগরীর পাশাপাশি সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ শহরের পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় বেশি লাগলেও তেমন সমস্যা পোহাতে হচ্ছে না।
বাংলা ট্রিবিউনের চট্টগ্রামের প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন রকি, বরিশালের সালেহ টিটু, রাজশাহীর দুলাল আবদুল্লাহ, সিলেটের মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, ময়মনসিংহের আতাউর রহমান জুয়েল, রংপুরের লিয়াকত আলী বাদল ও খুলনার হেদায়েৎ হোসেনের পাঠানো প্রতিবেদন।








