জুলাই আন্দোলনকারীকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার, পুলিশ চালান দিলো ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ নামে

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি
১০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১১আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১১

ঢাকার সাভারে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া এক আন্দোলনকারীকে একটি ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। পরিবারের দাবি, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রভাবে তাকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না মিললে অভিযোগপত্র থেকে তার নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

গ্রেফতার হওয়া তরুণের নাম মেহেদী হাসান রিয়াজ (২৫)। তিনি সাভার নিউমার্কেটের ভূগর্ভস্থ তলায় ‘আদিল এক্সপোর্ট’ নামে একটি কাপড়ের দোকানে কয়েক বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৩ জুলাই বিকালে কর্মস্থল থেকে জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলার ঘটনায় তাকে আটক করে সাভার মডেল থানা পুলিশ। পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতের নথি অনুযায়ী, সাভার মডেল থানার ০৪/২৪ নম্বর হত্যা মামলায় রিয়াজকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকালে সুমন নামের এক ব্যক্তি নামাবাজারে যাওয়ার পথে সাভার রেজিস্ট্রি অফিস মোড়ে পৌঁছালে এজাহারভুক্ত আসামিরা দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালান। এতে সুমনের কোমর ও পিঠে গুলি লাগে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এজাহারে রিয়াজের নাম রয়েছে ১১৯ নম্বর আসামি হিসেবে। সেখানে তার রাজনৈতিক পরিচয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আদালতে পাঠানো পুলিশি চালান নথিতে তার নামের পাশে লেখা হয়েছে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’।

অন্যদিকে আন্দোলনের সময়কার একাধিক ছবি, ভিডিও ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে রিয়াজের সক্রিয় অংশগ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে। সহযোদ্ধাদের দাবি, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাভারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন।

রিয়াজের পরিবার বলছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেই নয়, বরং পুরোনো একটি ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

রিয়াজের বোন বলেন, ‘আমরা দুই ভাই-বোনই পরিবারের অমতে সাভারের আন্দোলনে গিয়েছিলাম। ১৯ জুলাই যখন সাভারে হামলা চালানো হয় তখনও আমার ভাই রাজপথে ছিল। ও সম্পূর্ণ নির্দোষ। ওর উপার্জনের টাকা দিয়েই আমাদের পড়ালেখা ও অসুস্থ বাবার ডায়াবেটিসের চিকিৎসা চলতো। টাকার লোভে আমার ভাইটাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।’

আন্দোলনে রিয়াজের সঙ্গে থাকা মেহেদী হাসান মুন্না বলেন, ‘১৪, ১৬ ও ১৮ জুলাই যখন সাভারে বেপরোয়া গুলি ও টিয়ারশেল চালানো হচ্ছিল, রিয়াজ আমাদের সঙ্গে সামনের সারিতে ছিল। টিয়ারগ্যাসের প্রভাব কমাতে সে কাঠ-খড় জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে সাহায্য করেছিল। যে ছেলেটা জীবন বাজি রেখে লড়লো, তাকে কীভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যাকারী বানানো হয়।’

পরিবারের অভিযোগ, মামলার পেছনে রাজনৈতিক নয়, মূলত ব্যবসায়িক বিরোধ কাজ করেছে।

রিয়াজের বাবা বেলাল উদ্দিন মনা বলেন, ‘সাভার পৌরসভার সাবেক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও কারাবন্দি আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে রিয়াজের ফুফা। আত্মীয়তার সুবাদে রিয়াজের বাবা আগে রাজ্জাকের কিছু ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। তবে রিয়াজ বা তার পরিবার কখনও কোনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বর্তমানে রাজ্জাক কারাবন্দি হয়ে মারা যাওয়ার পর  তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ভাগ হয়ে যায়। পরে একটি অংশ দেখাশোনার দায়িত্বে পান রিয়াজের বাবা বেলাল উদ্দিন । সেই দায়িত্ব ও পরিচালনা ব্যহত করতেই প্রতিপক্ষ দলের সদস্যরা বেলাল উদ্দিনের দুই ছেলেকে জড়িয়ে জুলাই হত্যা মামলায় নাম ডুকিয়ে দেয়। সে সুবাদে অর্থের বিনিময়ে রিয়াজকে কর্মস্থল থেকে গ্রেফতার করা হয়।’

রিয়াজের কর্মস্থল ‘আদিল এক্সপোর্ট’-এর মালিক ইব্রাহিম বলেন, ‘রিয়াজ গত সাত-আট বছর ধরে আমার দোকানে কাজ করছে। সে ভীষণ ভালো ও নিরীহ একটা ছেলে। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কখনও যুক্ত ছিল না। ঘটনার দিন বিকালে দোকান থেকেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাভার মডেল থানার এসআই চম্পক বড়ুয়া বলেন, ‘মেহেদী হাসান রিয়াজ এজাহারনামীয় আসামি হওয়ায় নিয়মিত অভিযানে তাকে গ্রেফতার করে চালান দেওয়া হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে।’

সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, ‘তৎকালীন সময়ে বিস্তারিত তথ্য তার জানা ছিল না। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে চালানের কপি ও আন্দোলনকারী হওয়ার প্রমাণ জমা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হবে। কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন।’ কোনও কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘যদি সে সত্যিই জুলাইযোদ্ধা হয়ে থাকে এবং তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়ে থাকে, তবে তা দুঃখজনক। আইনের নতুন যে সংশোধনী এসেছে, তার মাধ্যমে এই ধরনের হয়রানি থেকে তাকে আইনি রেহাই দেওয়া উচিত।’

/এফআর/
সম্পর্কিত
বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুট, ‘মূল পরিকল্পনাকারী এক নারী’
হাসপাতালে ইয়াবাসহ চিকিৎসক গ্রেফতার, চেম্বারে বসেই করতেন সেবন
খুলনায় খাদ্য কর্মকর্তাকে কুপিয়ে জখম
সর্বশেষ খবর
বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুট, ‘মূল পরিকল্পনাকারী এক নারী’
বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুট, ‘মূল পরিকল্পনাকারী এক নারী’
হাসপাতালে ইয়াবাসহ চিকিৎসক গ্রেফতার, চেম্বারে বসেই করতেন সেবন
হাসপাতালে ইয়াবাসহ চিকিৎসক গ্রেফতার, চেম্বারে বসেই করতেন সেবন
টিভিতে আজকের খেলা (১০ আগস্ট, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা (১০ আগস্ট, ২০২৬)
সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে, এক গ্রামেরই চার জন
সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে, এক গ্রামেরই চার জন
সর্বাধিক পঠিত
নাম বদলাচ্ছে র‌্যাব, পুরো নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে এক বাহিনীর কাছে
নাম বদলাচ্ছে র‌্যাব, পুরো নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে এক বাহিনীর কাছে
আগারগাঁওয়ের ভাতের হোটেলের ‘ভাইরাল মিজান’ গ্রেফতার
আগারগাঁওয়ের ভাতের হোটেলের ‘ভাইরাল মিজান’ গ্রেফতার
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা
ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
দুই নেতা আলোচনায় বসলে সব সমস্যার সমাধান হবে: ভারতের হাইকমিশনার
দুই নেতা আলোচনায় বসলে সব সমস্যার সমাধান হবে: ভারতের হাইকমিশনার