খরচ বেশি হওয়ায় এবং ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিন দিন পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার চাষিরা। প্রতি বছর লোকসান গুণছেন তারা। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে পানের আবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন। নতুন করে পানের বাজারে বড় দরপতনে আবারও চাষ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলায় অনুকূল আবহাওয়ার কারণে প্রচুর পান চাষ হয়ে থাকে। তুলানামূলক উচু জমিতে পান আবাদ ভালো হওয়ায় যুগ যুগ ধরে চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানের আবাদ করে আসছেন চাষিরা। পানকে জেলার প্রধান অর্থকারী ফসল বলা হলেও তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
এক সময়ে পানের আবাদকে কেন্দ্র করেই জেলায় ঘুরেছে অর্থনীতির চাকা। ধীরে ধীরে সে চাকার গতিও কমে আসছে। পানের চাষ পরিবর্তন করে অনেকেই শুরু করেছেন ভুট্টা ও ধানসহ নানা ধরনের ফসলের আবাদ।
কৃষি বিভাগ বলছে, পানের তুলনায় অন্য ফসলে ভালো লাভ হচ্ছে। তাই অন্য আবাদে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। পাঁচ বছর আগে চুয়াডাঙ্গায় এক হাজার ৭৭৪ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছিল। এ বছর আবাদ কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৩৩ হেক্টরে। প্রতিবছরই কোনও না কোনও কারণে জেলায় পান বরজের সংখ্যা কমছে। ২০১৮ সালে চাষাবাদ হয় ১৭৭৪ হেক্টর, ২০১৯ সালে ১৭৩০ হেক্টর, ২০২০ সালে ১৬৭০ হেক্টর, ২০২১ সালে ১৬০৯ হেক্টর এবং ২০২২ সালে ১৬৩৩ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে।
সম্প্রতি আলমডাঙ্গা উপজেলার খাদিমপুর ইউনিয়নের পানের বাজারে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রির জন্য চাষিরা পান নিয়ে এসেছেন। বাজারে ক্রেতা তুলনামূলক কম। আগের মতো বাইরের বড় ক্রেতা আসেননি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পান কিনছেন। ছোট আকারের পান প্রতিপণ (এক পণে ৮০ পান) ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বড় আকারের পান বিক্রি হচ্ছে প্রতিপণ ৬০ টাকা।
পানচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের জন্য চুয়াডাঙ্গা বেশ উপযোগী। এ কারণে কয়েক যুগ ধরে এই অঞ্চলে পানের আবাদ করা হয়। জেলার চার উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পান চাষ হয়ে থাকে। এই অঞ্চলে সাধারণত দুই জাতের মিষ্টি পান ও সাচি পানের আবাদ হয়।
সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে পানের বাজারেও দরপতন হচ্ছে। প্রতি হাটেই কমছে পানের দাম। বাড়ছে পানচাষিদের হতাশা। প্রতিটি পানের বরজে যে খরচ হয় তা তুলতেই হিমশিম খেতে হয় চাষিদের। আবার বড় দরপতন কীভাবে সামাল দেবেন, তা নিয়েও দুঃশ্চিন্তায় পানচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
পানচাষি রবিন আলী বলেন, ‘চলতি বছর এক একর জমিতে পানের আবাদ করেছি। আবাদও ভালো হয়েছে। কিন্তু দাম একেবারে কমে গেছে। যে পান গত সপ্তাহে বিক্রি করেছি প্রতিপণ ১০০ থেকে ১১০ টাকা, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কমে বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।’
পানচাষি ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমাদের পানের বরজে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে দাম পাচ্ছি না। এসব কারণে হাল ছেড়ে দিয়েছি। এই বছরেই বরজ ভেঙে ফেলবো।’
আরেক কৃষক মজনু মিয়া বলেন, ‘পান চাষ করে প্রতি বছরই আমাদের লোকসান হচ্ছে। এভাবে টিকে থাকা কষ্টকর।’
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, পানের তুলনায় অন্যান্য ফসলে ভালো লাভ পাওয়ায় সেদিকে ঝুঁকছেন অনেকে। তবে আমরা চাষিদের পান চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। আধুনিক পদ্ধতিতে পানের আবাদে আগ্রহী করে তুলতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।









