ভিসির অপসারণ চান কুয়েটের শিক্ষার্থীরা, বিপক্ষে অবস্থান শিক্ষক সমিতির

খুলনা প্রতিনিধি
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৮:২৮আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৮:২৮

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) সংঘর্ষের ঘটনায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরিফুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চিঠি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল শুক্রবার রাতে শিক্ষার্থীরা প্রধান উপদেষ্টা বরাবর এই চিঠি পাঠান। এতে দ্রুত নতুন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগের দাবি জানান তারা।

একই দিন শিক্ষার্থীদের দাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে কুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতারা বলেছেন, ‘এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকদের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণসহ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের পদত্যাগে বাধ্য করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা ক্যাম্পাসের শিক্ষা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করবে।’

প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া চিঠিতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা কুয়েটের সব শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৩তম জরুরি সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাম্পাসে সকল ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। অথচ ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েট ছাত্রদলের সদস্যরা ফরম বিতরণ শুরু করলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মিছিলের ডাক দেন। কিন্তু হঠাৎ করে ছাত্রদলের কর্মীরা মিছিলের ওপর হামলা চালিয়ে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেয়, যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সহায়তায় ছাত্রদল ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী হামলা চালায়, যা চার ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে। এই ন্যক্কারজনক হামলায় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনও ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই মর্মে আমরা সব শিক্ষার্থী ভিসি ও প্রো-ভিসির পদত্যাগসহ ছয় দফা দাবি উত্থাপন করি। আল্টিমেটাম দেওয়ার পরও আমাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় ভিসির অপসারণ দাবি করা হচ্ছে।’

এ ছাড়া চিঠিতে ভিসির অপসারণে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো- রাজনীতি মুক্ত কুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনীতি অনুপ্রবেশের অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদলের সন্ত্রাসী কর্তৃক আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া, দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার পরও ব্যর্থতার দায় অস্বীকার করা, যথোপযুক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও চিহ্নিত কুয়েট ছাত্রদল এবং স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন কর্তৃক সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে স্বীকার না করা এবং ভিসির কাছে সেই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রদানকৃত ছয় দফা দাবি পূরণের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পরও দাবি সম্পূর্ণরূপে মেনে না নেওয়া।

শিক্ষার্থীরা চিঠিতে উল্লেখ করেন, অভিভাবকহীন ও অনিরাপদ কুয়েট ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় চলমান করার জন্য অতিদ্রুত নতুন ভিসি এবং প্রো-ভিসি নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। যারা আমাদের পাঁচ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে অভিভাবকের দায়ভার নেবেন। 

কুয়েটের পাঁচ ব্যাচের ১৬টি বিভাগের প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী এই চিঠিতে সই করেছেন বলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

অপরদিকে, শুক্রবার শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. সাইদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. ফারুক হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে উদ্বেগের কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায়, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ছাড়া কিছু শিক্ষার্থী ভাইস-চ্যান্সেলরসহ কয়েকজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে এবং তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে কোনও শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা এমন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, বরং এর পেছনে কুচক্রী মহল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চক্রান্ত কাজ করছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সেদিন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হলেও তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সহযোগিতা করেনি। এজন্য তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানাই আমরা। সেইসঙ্গে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায় শিক্ষক সমিতি। রাজনীতিমুক্ত কুয়েট ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে ২০০৩ সালের কুয়েট আইন এবং সিন্ডিকেট কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসহযোগিতার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, যা পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।

গত বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসের ভাস্কর্য দুর্বার বাংলার পাদদেশে দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ সমাবেশ করে কুয়েট প্রশাসনসহ সব রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনকে লাল কার্ড দেখান শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রীসহ সব রাজনৈতিক সংগঠনকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন। একইসঙ্গে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন তারা।

গত বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ৯৩তম সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কুয়েটে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকবে। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সম্পৃক্ততা পেলে শিক্ষার্থীদের আজীবন বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কোনও ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না।

গত মঙ্গলবার ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে কুয়েটে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা তদন্তে কমিটি করা হয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এম এম এ হাসেমকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বুধবার রাতে খান জাহান আলী থানায় অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছে কুয়েট প্রশাসন।

/এএম/
সম্পর্কিত
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
আদাবরে ঢাবি শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনায় গ্রেফতার ৯
তোপের মুখে অফিস ত্যাগ করলেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক
সর্বশেষ খবর
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি