‘১০ বছর ধরে এই এলাকায় এমন অবস্থা দেখছি। বুধবার সকালে রান্নাঘরে পানি ঢুকে হাঁড়িপাতিলও ভেসে গেছে, এরপর থেকে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। চার দিন ধরে টানা বৃষ্টি। ঘর থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থা নেই। চার পাশে পানি। আশপাশের সবার একই অবস্থা। এ অবস্থায় ঘরে সাপ-পোকার আতঙ্ক নিয়ে সন্তানদের নিয়ে দিনরাত না খেয়ে কাটাতে হচ্ছে। কষ্টের শেষ নেই আমাদের,’ কথাগুলো বলেছেন সাতক্ষীরা সদরের মাঝখোলা গ্রামের গৃহবধূ রহিমা বেগম। টানা বৃষ্টিতে গত চার দিন পানিবন্দি হয়ে কষ্ট ও দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন তিনি।
একই অবস্থা এই এলাকার অন্যদেরও। টানা বৃষ্টিতে পানিবন্দি হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ, কিস্তির দুশ্চিন্তা হঠাৎ এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকরা। টানা বৃষ্টির কারণে তিন-চার দিন ধরে বাইরে বের হতে পারছেন না তারা।
ভ্যানচালক ভোলা মিয়া দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃষ্টির জন্য ভ্যান নিয়ে বের হতে পারছি না, রাস্তায় কোনও মানুষও নেই। প্রতিদিনের চাল-ডাল কেনাই বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে এনজিওর কিস্তি কীভাবে দেবো, সেই চিন্তায় মাথা কাজ করছে না।’
একই সংকটের কথা জানিয়ে দিনমজুর আখতারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিন দিন ধরে ঘরে বসে আছি। পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচবো বুঝতে পারছি না।
সাতক্ষীরায় আবহাওয়া অফিসের সব পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙে ২৪ ঘণ্টায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা জেলার ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ। রাতভর এই রেকর্ড ভাঙা টানা বর্ষণে তীব্র জলাবদ্ধতায় পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা সাতক্ষীরা। পৌরসভাসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী ও কৃষকেরা।
তলিয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতর
টানা বৃষ্টিতে পৌর সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পানিতে থইথই করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, কলেজ মাঠ, জেলা হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতরের আঙিনায় এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড থেকে শুরু করে মাঝখোলা এলাকার বাসিন্দারা। এসব এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। নষ্ট হচ্ছে রান্নাঘর, টয়লেট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী অমিত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পানির কারণে কলেজে যাওয়া যাচ্ছে না। নোংরা পানি পার হতে গিয়ে পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। টিউবওয়েলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।’
অপরিকল্পিত নগরায়ন ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বছরের পর বছর ধরে এই কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
কলেজ রোডের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হাসান আলী গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০ বছর ধরে এই এলাকায় আছি। আগে সামান্য বৃষ্টিতেই যা হতো, এখনও তাই হচ্ছে। তাহলে উন্নয়নটা হলো কোথায়? নতুন সরকার এসেছে, এখন আল্লাহ জানে কোনও স্থায়ী কাজ হবে কিনা।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, খুব দ্রুতই বৃষ্টির এই প্রভাব কমে আসবে।
অন্যদিকে, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্ত। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন সরকারের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন খাল ও নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে দ্রুত স্লুইসগেটগুলো খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শহরের প্রাণসায়ের খালে পানি নিষ্কাশনের জন্য সকল ড্রেন সচল করে খালের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে এলাকাবাসীর আশঙ্কা, বৃষ্টিপাত যদি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করবে।









