যশোরের বিখ্যাত ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন আন্দোলনের আপসহীন নেতা এবং ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালি চিরবিদায় নিয়েছেন। ভবদহের চার দশকের দুঃখ এখনও কাটেনি। কবে কাটবে তাও কারও জানা নেই। এর মধ্যে চলে গেলেন ভবদহের সংগ্রামী এই নেতা।
গত বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে যশোরের অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামে নিজবাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা রাজনীতিক ইকবাল কবির জাহিদ তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এদিন সন্ধ্যায় নওয়াপাড়া মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এর আগে লাল পতাকায় আবৃত পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও রেড স্যালুটের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন রাজনীতিক সামাজিক অঙ্গনের নেতাকর্মীরা।
ভবদহের চারদিকে শুধুই পানি। জেগে আছে একমাত্র বড় রাস্তা। বাড়ির বারান্দা থেকে রাস্তার সঙ্গে সংযোগে ভরসা বাঁশের সাঁকো। উঠানে শ্যাওলা ভাসা কোমরপানি। তলিয়ে গেছে রান্নাঘর, শোবারঘর, গোয়ালঘর। এমন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন অভয়নগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের ৬০ বছরের সুভাষ চন্দ্র মল্লিক। তিনি বললেন, এ অঞ্চলে মানুষ, গবাদি পশুপাখি কেউই ভালো নেই। দীর্ঘদিন জলমগ্ন এই অঞ্চলে বাড়ছে চর্মরোগের প্রকোপ। একরাশ ক্ষোভ নিয়ে তার আক্ষেপ, তাদের এই দুঃখ কি কোনোদিন শেষ হবে না?
সুভাষ মল্লিকের মতো যশোরের দুঃখখ্যাত ভবদহপাড়ের চার লক্ষাধিক মানুষের এমন দুর্দশা। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। পলি পড়ে এই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্য হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নামছে না। এ অঞ্চলে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। ক্ষেতের ফসল, ঘেরের মাছ সবই কেড়ে নিয়েছে এই পানি। কেড়ে নিয়েছে মানুষের থাকার জায়গাটুকুও। এসব মানুষের জন্য চার দশক ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন রণজিৎ বাওয়ালি।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই সকালে বাড়িতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন। এরপর প্রথমে অভয়নগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে সংগ্রাম কমিটির নেতাদের পরামর্শে তাকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে বাড়ি নেওয়া হয় গত ১৪ জুলাই। রণজিৎ বাওয়ালি গত এক বছর ধরে অন্ধ। সারাক্ষণ আন্দোলন সংগ্রামে ব্যস্ত থাকায় ছেলের অকাল মৃত্যু শোক ভুলে থাকলেও দুই মাস আগে স্ত্রীকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্যসচিব চৈতন্য পাল বলেন, ‘রণজিৎ বাওয়ালির বাড়ি যশোরের দুঃখ ভবদহ অঞ্চলে। তার বাড়িতেও এখনও জলবদ্ধতা। দীর্ঘদিন ধরে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানিবন্দি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন তিনি। আমৃত্যু এ অঞ্চলের মানুষের মুক্তির লড়াই চালিয়ে গেছেন। জীবনের শেষ সময়ে এসেও স্থায়ী কোনও সমাধান দেখে যেতে না পারার সেই গভীর আক্ষেপ ও বুকভরা বেদনা নিয়েই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে হলো। তার মৃত্যুতে ভবদহ অঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।’
রণজিৎ বাওয়ালি ছোটবেলা থেকেই বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রথমে তিনি নিজ এলাকায় কমরেড নুরুজ্জামান সরদারের সহযোগী হিসেবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এরপর পার্টির নির্দেশে কমরেড মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে কেশবপুর এলাকায় যুদ্ধ করেন। ১৯৮৫ সালে ভবদহে জলাবদ্ধতা দেখা দিলে তৎকালীন আহ্বায়ক অমূল্য রতন বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের মাঝে জনমত গড়ে তোলেন। ২০০৫ সালে ফের জলাবদ্ধতা দেখা দিলে সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। রণজিৎ বাওয়ালি ছিলেন একজন চারণ কবি, গীতিকার ও সুরকার। অসংখ্যা গান লিখেছেন। তার দুটি কাব্য প্রকাশিত হয়েছে যার একটি বাংলা, একাডেমি প্রকাশ করে। চারণ কবি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা কমরেড তসলিম-উর-রহমান, সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হামিদ, সদস্যসচিব চৈতন্য কুমার পাল, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য জিল্লুর রহমান ভিটু।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করা এই আজীবন বিপ্লবী পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে। ভবদহের দুঃখ ঘোচানোর স্বপ্ন বুকে নিয়েই বিদায় নিলেন। তবে তার রেখে যাওয়া স্লোগান আর আন্দোলনের চেতনা শোষিত মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল বলে মনে করেন ভবদহবাসী।









