নদীর ওপারেই দেশের অন্যতম বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সেই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। অথচ কেন্দ্রটির একেবারে পাশের জনপদেই বিদ্যুতের নিশ্চয়তা নেই। সন্ধ্যা নামলেই অনেক ঘরে জ্বলে সৌর প্যানেলের আলো।
বাগেরহাটের রামপাল ও চালনার সীমান্তবর্তী পশুর নদের পাড়ে কৈগরদাসকাঠি চরের পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকায় এখন সৌরশক্তি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। বিদ্যুৎ সংকট, সংযোগ নিতে কয়েক হাজার টাকা খরচ, নদীতে মাছের সংকট এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চরবাসীর জীবন যেন এক নির্মম বৈপরীত্যের ছবি।
চরবাসীর প্রশ্ন, যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলো দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায়, সেই কেন্দ্রের এত কাছে থেকেও তাদের ঘর কেন অন্ধকারে থাকবে?
“ওই যে দেখেন, নদীর ওপারে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কতটুকু দূর হতে পারে বলেন। সারা দেশে ওটা বিদ্যুৎ দেয়। আমরা এই নদীর এপারে অন্ধকারে। আমাদের অপরাধ কী? বিদ্যুৎ কেন পাই না? সৌর প্যানেল দিয়েই চলতে হচ্ছে আমাদের। অথচ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই আমরা নদীতে মাছ পাচ্ছি না। আমাদের সংসার চলে না।”
কথাগুলো বলছিলেন কৈগরদ্দাসকাঠি চরের জেলে আল আমিন ফকির। রামপালের গৌরম্ভা ইউনিয়নের আওতাধীন এই চরে তার মতো প্রায় ৮০০ জেলে পরিবারের বসবাস। তাদের অনেকের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গরম পানি নদীতে ছাড়ার কারণে নদীতে মাছ কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি থেকেও তাদের ঘরে আলো জ্বলে সৌর প্যানেলে, আর জীবিকার জন্য নদীতে জাল ফেলেও মিলছে না আগের মতো মাছ।
বন্ধের সময় না জেনে নদীতে গিয়ে মার খেয়েছি
জেলে আল আমিন ফকির বলেন, “এখন বন্ধ ঘোষণা হলে মাইকিং করা হয়। ৬-৭ বছর আগে মাইকিং করা হতো না। তখন না জেনে বন্ধের মধ্যে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে প্রশাসনের হাতে বেদম মার খেতে হয়েছিল। সেই থেকে অসুস্থ। আজও ঠিকমতো কাজ করতে পারি না।” নদীতে মাছ কমে যাওয়া এবং মাছ ধরায় বিভিন্ন সময়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের আয় আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
নদীতে জাল টেনেও মাছ নেই, ঘরে সোলার
চরের বাসিন্দা তানিয়া বেগম জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আগে তার স্বামী সাগরে গেলে তিনি নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাতেন। এখন নদীতে সারাদিন জাল টেনেও আগের মতো মাছ পান না।
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন ছিল না, সে সময় আমার স্বামী সাগরে গেলে আমি এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা চালাতাম। এখন এই নদীতে সারাদিন জাল টানলেও মাছ পাই না। আর বন্ধের সময় সরকারি সহায়তাও পাই না। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র এতটা কাছে থাকার পরও এখানে জেলেদের সোলার প্যানেল কিনে আলো জ্বালাতে হয়। বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে সেটিই এখন সুফল দিচ্ছে।”
সুন্দর ঘর দিয়েছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ঠিকমতো পাই না
চম্পা বেগম বলেন, “সরকার কত সুন্দর করে ঘর দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ দিলেও ঠিকমতো পাই না। আমরা সোলার এনে আলো জ্বালাই। পাকা টয়লেট দিয়েছে। কিন্তু সেপটিক ট্যাঙ্ক বালু ভরা। পানির চাপ বাড়লে ময়লা ঘরে ভেসে ওঠে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাইয়ে ঘরের চাল ভরে যায়। বৃষ্টিতে ধুয়ে আবার চাল পরিষ্কার হয়।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেকেই বিকল্প হিসেবে সোলার প্যানেল ব্যবহার করছেন। আবার আবাসিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন খরচ বাবদ ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হওয়ায় দরিদ্র অনেক পরিবার সেই খরচ বহন করতে পারছে না। তাদের কেউ কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সোলার প্যানেল ব্যবহার করছেন।
টাকা দিতে না পারায় বিদ্যুৎ আনতে পারিনি
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনের এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন, “বিদ্যুৎ পেতে বিদ্যুৎ বিভাগে কথা বলেছিলাম। ওরা বলে আগে টাকা লাগে। আমি সে টাকা দিতে পারবো না বলে আর বিদ্যুৎ আনতে পারিনি। গত বছর একটি এনজিও থেকে ৫০ ওয়াটের একটি সোলার দিয়ে যায়। এটি দিয়েই রাতে আলো পাই।”
বাগেরহাট পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের লাইনম্যান আব্দুল আহাদ বলেন, “বিদ্যুৎ লাইন নিতে আবাসিক পর্যায়ে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ৪৬৫ টাকা হিসেবে জামানত লাগে। একটি বাড়িতে লাইন টানা, মিটার খরচসহ ৩ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।”
জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে সোলারই বিকল্প
গৌরম্ভা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও রামপাল পল্লী উন্নয়ন সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান জানান, রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনের বসতিগুলোতে জলাবদ্ধতা বেশি থাকে। ফলে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, “তাই এনজিওর সহায়তায় ও নিজস্ব উদ্যোগে লোকজন সোলার প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে তারাই উপকৃত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ এখন সোলার নিয়ে ভাবছে।”
সৌরশক্তিতে আয় করছেন নারীরা
শুধু ঘরে আলো জ্বালানো নয়, সৌরশক্তি এখন স্থানীয় নারীদের আয়-রোজগারের মাধ্যমও হয়ে উঠছে। ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা, বিশেষ করে সৌরভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নারীদের জ্বালানি উদ্যোক্তা ও কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
আইআরভির নির্বাহী পরিচালক মেরিনা যুথী জানান, সৌরশক্তিচালিত ইনকিউবেটরের মাধ্যমে মুরগির ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি করছেন স্থানীয় নারীরা। এতে ঘরে বসেই তাদের আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলায় নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দুটি উপজেলায় আটটি সৌরচালিত ইনকিউবেটর দেওয়া হয়েছে। সৌরচালিত ইনকিউবেটরের মাধ্যমে মুরগির ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি করে আয় করছেন স্থানীয় নারীরা।”
পাশাপাশি নারীদের সংগঠিত করে দেওয়া হয়েছে সাতটি সৌরচালিত পানির পাম্প। এসব পাম্প ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচের ব্যবস্থা করছেন নারীরা। এতে কৃষি উৎপাদন সচল রাখার পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়ছে।
সৌর আলোয় ‘গ্রিন বিদ্যাপীঠ’
মেরিনা যুথী বলেন, “শুধু জীবিকা নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও সৌরশক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। চাপাতলা গুচ্ছগ্রামের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে সৌরচালিত ‘গ্রিন বিদ্যাপীঠ’। বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।”
তার ভাষ্যমতে, একই সঙ্গে ছোট বয়স থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।
মেরিনা যুথী বলেন, “ভবিষ্যতে সৌরশক্তির মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সৌরচালিত এ ধরনের উদ্যোগের সংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এতে প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সবুজ অর্থনীতির বিকাশেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি বলেন, “সৌরশক্তির এই উদ্যোগ নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নারীদের শুধু সুবিধাভোগী নয়, বরং পরিবর্তনের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। তাদের নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি প্রণোদনাসহ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া জরুরি।”
বিদ্যুৎকেন্দ্রের বক্তব্য: নদীতে গরম পানি ছাড়া হয় না
চরবাসীর অভিযোগের অন্যতম বিষয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানি নদীতে ফেলার বিষয়টি। তবে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের পরিচালক আনোয়ারুল আজিম এ অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, “এই প্ল্যান্ট থেকে কোনও ধরনের গরম পানি নদীতে ছাড়া হয় না। গরম পানি চৌবাচ্চাতে সংরক্ষণ করা হয়। যা শীতল হওয়ার পর আবার প্ল্যান্টে ব্যবহার করা হয়।”
বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টে ৬৬০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রকল্পটি প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে। ভারত সরকারের রেয়াতি অর্থায়ন প্রকল্পের আওতায় ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডের (বিএইচইএল) জন্য বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) প্রকল্পটি নির্মাণ করেছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত কেন্দ্রটিতে ফ্লু গ্যাস নির্গমনের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু—২৭৫ মিটার—চিমনি রয়েছে। কয়লার জন্য অগ্রিম জাহাজ আনলোডার, সম্পূর্ণ ঘিরে রাখা স্টক ইয়ার্ড এবং কম ছাই ও সালফারযুক্ত উচ্চ গ্রেডের কয়লা ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে বিকল্প শক্তির নতুন বাস্তবতা
রামপালের চরাঞ্চলের বাস্তবতা দেখাচ্ছে, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সংযোগের প্রাথমিক খরচ, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তিকে বেছে নিচ্ছে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে সৌরভিত্তিক মিনি-গ্রিড, সৌরচালিত পানির পাম্প ও ঘরোয়া সোলার সিস্টেম আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু সুবিধাভোগী না রেখে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত করা হলে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা—দুটিই বাড়তে পারে।
নারী ও তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় কারিগরি দক্ষতা তৈরি করাও জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির পাশাপাশি সরকারি বাজেট, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রত্যন্ত এলাকায় ছোট আকারের সৌর প্রকল্প ও কমিউনিটি মালিকানাভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষ শুধু বিদ্যুতের সুবিধা নয়, এর মালিকানার অংশীদারও হতে পারেন। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে স্থানীয়, টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
রামপালের কৈগরদ্দাসকাঠির চরবাসীর কাছে তাই সৌর প্যানেল এখন শুধু বিদ্যুতের বিকল্প নয়—অন্ধকার ঘরে আলো, নারীর আয়, কৃষিতে সেচ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনারও নতুন ভরসা।









