X
শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
১৪ মাঘ ১৪২৯

তেল-বিদ্যুৎ ছাড়াই অটোকলে অবিরাম পানি

শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর
১২ নভেম্বর ২০২২, ০৮:০০আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২২, ০৮:০০

শেরপুরের পাহাড় বেষ্টিত সীমান্ত এলাকায় সারা বছরই থাকে সুপেয় পানির সংকট। তবে ‘জাদুর কল’ বা ‘অটোকলের’ সুবিধায় শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চার গ্রামের মানুষের পানির কষ্টে ভুগতে হয় না। অটোকলের পানি পান ছাড়াও গৃহস্থালির কাজসহ ফসল ফলাতেও ব্যবহার করছেন তারা। ১০ বছর আগেও যে গ্রামে পানির অভাবে চাষাবাদ হতো না সেখানে এখন কোনও খরচ ছাড়াই সেচের পানি পাচ্ছেন চাষিরা। এতে বছরে কয়েক কোটি টাকার সেচ খরচ বেঁচে গেছে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই পানির সুষ্ঠু ব্যবহারে আশপাশের অনাবাদি আরও হাজারো একর জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব বলে মত দিয়েছেন গ্রামবাসী, আদিবাসী নেতা এবং বিশেষজ্ঞরা। 

শেরপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের অবস্থান। ভারতের মেঘালয় রাজ্য ঘেঁষা এই প্রত্যন্ত এলাকায় রাঙ্গাজান, বালিজুরি, খ্রিস্টানপাড়া ও অফিসপাড়া গ্রাম। গ্রামগুলোতে পাঁচ থেকে ছয় হাজার লোকের বসবাস। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কৃষি কাজের ওপরই নির্ভরশীল। ওই চার গ্রামের পাশ দিয়েই অর্ধবৃত্তাকারে বয়ে গেছে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি সোমেশ্বরী নদী। ওই নদীতে এক সময় চৈত্র মাসেও পানি থাকতো। প্রায় এক যুগ আগেও ওই পানি দিয়েই ওই চার গ্রামসহ আশপাশের আরও অনেক গ্রামের মানুষ বোরো-আমন আবাদ এবং অন্যান্য মওসুমের সবজি আবাদসহ বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করতো। 

যেভাবে এলো অটোকল
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এক সময় সোমেশ্বরীর পানি কমতে থাকে, শীতে শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়। চাষাবাদের পরিমাণও কমতে শুরু করে গ্রামগুলোতে। এরইমধ্যে এক যুগ আগে রাঙ্গাজান গ্রামের মানুষ টিউবওয়েল স্থাপনের সময় ৬০ থেকে ৮০ ফুট বোরিং করেই পানির দেখা পান। নলকূপ স্থাপনের জন্য করা গর্ত থেকে অনবরত পানি উঠতে শুরু করে। গ্রামবাসী তখন বিষয়টিকে আল্লাহর দান ভেবে টিউবওয়েল স্থাপন না করেই উঠতে থাকা পানি পান এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার শুরু করেন। ধীরে ধীরে অফিসপাড়া, খ্রিস্টানপাড়া ও বালিজুরি গ্রামেও এই ব্যবস্থাপনায় পানি উত্তোলন ও ব্যবহার শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে ওই পানির লাইনের নাম হয়ে যায় ‘অটোকল’। তবে গ্রামের অনেকেই এটাকে জাদুর কলও বলেন। 

তেল-বিদ্যুৎ ছাড়াই অটোকলে অবিরাম পানি ফসলে কমেছে খরচ
অটোকলে বছরজুড়ে পানির প্রবাহ একই রকম থাকায় গ্রামবাসী ওই পানি ব্যবহার করে জমিতে প্রথমে ধান চাষ ও  সবজি ফলানো শুরু করেন। গত প্রায় ১০ বছরে ওই চার গ্রামের কয়েকশ’ মানুষ অটোকলের সুবিধা ভোগ করছেন। বর্তমানে গ্রামের প্রায় ৬০ ভাগ বাড়ি ও ফসলের মাঠের পাশে এই অটোকলে দেখা মেলে। ধান কাটার সময় অটোকলের পানির ধারা ড্রেন কেটে পার্শ্ববর্তী নদী ও খালের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া হয়। প্রতিটি অটোকল বসাতে গভীরতা ভেদে শুধু মিস্ত্রি খরচ বাবদ দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কারণ পাইপ দিয়ে বোরিং করার পর ওই পাইপ তুলে কয়েক হাত বাঁশ এবং প্লাস্টিকের পাইপ বসিয়ে দিলেই অনবরত পানি উঠতে থাকে। তবে খাবারের জন্য বসানো বাড়ির কলগুলোতে ফিল্টার বসানো হয়েছে এবং আর্সেনিক পরীক্ষাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 

উপকারভোগী কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, বর্তমানে ওই চার গ্রামের প্রায় এক হাজার একর জমিতে বোরো আবাদ করা হচ্ছে। এতে তাদের কেবল সার ও কীটনাশক ছাড়া আর কোনও খরচ হয় না। 

অটোকলের পানির সুষ্ঠু ব্যবহার চান স্থানীয়রা
হারিয়াকোনা গ্রামের আদিবাসী নেতা প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, প্রায় দুই যুগ আগেও আমাদের এই পাহাড়ি এলাকায় অনেক ঝর্ণা ছিল। সে ঝর্ণা দিয়ে বছরের সব সময় পানি প্রবাহিত হয়ে পাশের সোমেশ্বরী নদীতে বয়ে যেতো। কিন্তু এখন তা স্বপ্নের মতো মনে হয়। সেই ঝর্ণাও নেই, নদীতে পানিও নেই। গত প্রায় ২০ বছর ধরে চৈত্র মাস আসার আগেই ওই নদীর পানি শুকিয়ে যায়। ফলে আমরা প্রায় গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফসল ফলাতে পারিনি। তবে গত প্রায় ১০ বছর ধরে এই অটোকলের সাহায্যে আমরা ফসল ফলাতে পারছি। তবে সরকারিভাবে এই পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করলে আশপাশের আরও অনেক গ্রামের মানুষ উপকার পাবে।

স্থানীয়রা বলছেন, অটোকলের পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে উপজেলার অন্য গ্রামেও চাষের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে কল দিয়ে ওঠা অনবরত পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব। যে সব গ্রামে অটোকল নেই, সেখানে ক্যানেল বা খাল খনন করে পানি জমিয়ে পরে দেশীয় পদ্ধতি সেচের মাধ্যমে আরও প্রায় কয়েক হাজার একর জমিতে বোরোসহ বিভিন্ন ফসল ফলানো সম্ভব। তবে এতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে একটি এনজিও খ্রিস্টান পাড়ায় অটোকলের পানি জমিয়ে রাখতে বেশ কয়েকটি চৌবাচ্চা বা ট্যাংক তৈরি করে দিয়েছে। 

 যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা 
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে অপচয় হওয়া পানি আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে যদি পানি সরবরাহ করা যায় তাহলে আরও অধিক জমিতে অল্প খরচে ফসল ফলানো যাবে। তাতে সীমান্তবর্তী ওই সব অঞ্চলের মানুষ কম খরচে এবং কম পরিশ্রমে অধিক ফসল ফলাতে পারবেন। এতে তাদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন হবে।

জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গছে, শ্রীবরদী উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর ফসলের জমি রয়েছে। এসব জমিতে উফশী, বোরো, আমনসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ করা হয়।

জেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের শ্রীবরদী উপজেলার প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, আসলে এই ধরনের পানির লেয়ার পাহাড়ের পাদদেশে অনেক সময় বের হয়, সেটা আসলে স্প্রিং লেয়ার। এটাকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে ওই জনপদে সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

 

/টিটি/
সর্বশেষ খবর
বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরির লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলো জেসিআই ঢাকা মাভেরিক্স
বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরির লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলো জেসিআই ঢাকা মাভেরিক্স
‘প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র’
‘প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র’
নতুন আন্দোলন শুরু: মির্জা ফখরুল
রাজধানীতে নীরব পদযাত্রা বিএনপিরনতুন আন্দোলন শুরু: মির্জা ফখরুল
আমরা সংখ্যালঘু ধারণায়  বিশ্বাস  করি না: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী
আমরা সংখ্যালঘু ধারণায়  বিশ্বাস  করি না: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
খাবারের দাম দ্বিগুণ, বাস মালিক-হাইওয়ে হোটেলগুলোর সিন্ডিকেট
খাবারের দাম দ্বিগুণ, বাস মালিক-হাইওয়ে হোটেলগুলোর সিন্ডিকেট
মধ্যরাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ছাত্রীদের অবস্থান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়মধ্যরাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ছাত্রীদের অবস্থান
যে জুটি কখনও ব্যর্থ হয়নি
যে জুটি কখনও ব্যর্থ হয়নি
চলতি বছরেই ট্রেন যাবে কক্সবাজার
চলতি বছরেই ট্রেন যাবে কক্সবাজার
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার