X
বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

চালের নাম জামাই আদুরি, বছরে ১০০ কোটি টাকার বিক্রি

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৯:০১আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৯:৩৩

শেরপুরের পাঁচটি উপজেলায় প্রায় সব ধরনের কৃষি ফসল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে অন্যতম ঐতিহ্য সুগন্ধি তুলসীমালা চাল। এই চালের পিঠা, পায়েস, খই-মুড়ি, ভাতের সুগন্ধ ও স্বাদ অসাধারণ। গ্রামের প্রতিটি সামাজিক অনুষ্ঠানে এই চাল দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। এই অঞ্চলে এটিকে জামাই আদুরি চাল বলে ডাকা হয়। এককথায় জেলার মানুষের কাছে অতিপরিচিত ও জনপ্রিয় এক নাম জামাই আদুরি চাল।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, শত বছর ধরে তুলসীমালা ধানের আবাদ হচ্ছে। এটি শেরপুরের চাষিদের কাছে অমূল্য। চাল দেখতে যেমন ছোট ও মিহি, এর রয়েছে বাহারি সুগন্ধ। একে জামাই আদুরি বলে ডাকার কারণ হলো; নতুন জামাই এলে শ্বশুরবাড়িতে অবধারিতভাবে রান্না হবে তুলসীমালার পোলাও, খিচুড়ি, পায়েস কিংবা পিঠা। মোহ মোহ সুগন্ধ আশপাশে জানান দেবে এই চালের রান্নার কথা। রান্না খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত হাতে সুগন্ধ লেগে থাকে। আগে জেলার অভিজাত কৃষকরা এই ধান উৎপাদন করতেন। জেলার জমিদাররা এই চালের খাবার খেতেন। জমিদারদের বাড়িতে ইংরেজরা এলে এই চালের বাহারি খাবার পরিবেশন করা হতো। ফিরে যাওয়ার সময় ইংরেজদের খুশি করতে এই চাল গাড়িতেও তুলে দেওয়া হতো। দূরের কিংবা কাছের আত্মীয়দের এই চাল দেওয়ার এই রেওয়াজ এখনও চালু আছে।

কোথা থেকে এলো তুলসীমালা?

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে হাইব্রিড ধানের উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। তবে কমেনি তুলসীমালার চাহিদা; বরং বেড়েছে। উৎপাদন কম হলেও বছরজুড়ে দাম এবং চাহিদা থাকে অটুট। অভিজাত কৃষক ছাড়াও এখন অনেকে আবাদ করেন। তবে এই ধানের জাত কিংবা বীজ কোথা থেকে এলো, তা জানাতে পারেননি কৃষকরা। এমনটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জানা নেই। তবে প্রবীণ কৃষক আলী হোসেন বললেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে আমরা পেয়েছি। এখন জেলার সব কৃষকই জামাই আদুরির বীজ সংরক্ষণ করে রাখেন।’

আবাদের শুরু

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শত বছর আগে শুরুতে নালিতাবাড়ী, নকলা ও শ্রীবরদীর পাহাড়ি এলাকার উঁচু জমিতে অল্প পরিমাণ এই ধান লাগানো হতো। কিন্তু দিন দিন চাহিদা বাড়ায় জেলার সমতল অঞ্চলজুড়ে আবাদ হয়ে থাকে। বর্তমানে শেরপুর সদর, নালিতাবাড়ী, নকলা, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে তুলসীমালা আবাদ হয়।

বিদেশে রফতানি

জেলার অর্ধশতাধিক স্বয়ংক্রিয় চালকলে এই চাল তৈরি করা হয়। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন চাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিদেশে রফতানি হয়। ফলে শেরপুরের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে এই চাল। এ জাতের ধান আবাদ করে ভালো দাম পাওয়ায় খুশি স্থানীয়রা কৃষকরা।

ধানের বৈশিষ্ট্য

এটি আলোক সংবেদনশীল আমন প্রজাতির ধান। চাল চিকন ও সুগন্ধিযুক্ত। ধানগাছের উচ্চতা ১১০-১৮৫ সেন্টিমিটার। সাধারণত নাবিজাত হিসেবে আবাদ করে থাকেন কৃষকরা। আকষ্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এক-থেকে দেড় ফুট গভীর পানিতেও রোপণ করা যায়।

যে মৌসুমে আবাদ হয়

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, আমন মৌসুমে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে এই জাতের ধান আবাদ করা হয়। জেলার ৫০ হাজার কৃষক আমন মৌসুমে সাড়ে সাত হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করেন। এবারও একই পরিমাণ জমিতে আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয় ১৫ হাজার মেট্রিক টন ধান। এই ধানের বিপরীতে ১০ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপন্ন হয়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই চাল বাজারে আসে। প্রতি বছর জেলায় ১০০ কোটি টাকার চাল বেচাকেনা হয়।

চালের ব্যবহার ও যে কারণে জনপ্রিয়

এই চাল সুগন্ধিযুক্ত, চিকন ও সুস্বাদু। পোলাও, বিরিয়ানি, পায়েস, খিচুড়ি, ভাত, পিঠা, ফ্রায়েড রাইসসহ অন্যান্য খাবার তৈরি হয়। উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন এই চাল অ্যান্টি-অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ। ঈদ, পূজা-পার্বণ, বিয়ে, বউ-ভাতসহ বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে পোলাও, বিরিয়ানি, মিষ্টান্ন তৈরিতে তুলসীমালা ব্যবহার হয়। সুগন্ধি ও স্বাদের কারণে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয়।

মণ ৪৫০০ টাকা

জেলা চালকল মালিক সমিতি ও ধান-চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তুলসীমালা ধানসহ ময়মনসিংহের দুর্গাপুর, গৌরীপুর, ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার থেকে চালকল মালিকরা সুগন্ধি আতপ ধান কিনে থাকেন। উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা সাধারণত প্রতি মণ ধান দুই হাজার টাকা দামে বিক্রি করেন। ৬৮ কেজি ধানে এক মণ চাল পাওয়া যায়। সে হিসাবে এক মণ চালের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। আর চালকল থেকে প্রতি মণ তুলসীমালা চাল বিক্রি হয় তিন হাজার ৮০০ টাকায়। তবে গত মৌসুমের শেষ ভাগে এসে দুই-তিন মাস ধরে তুলসীমালা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ চার হাজার ৪০০ টাকা থেকে চার হাজার ৫০০ টাকায়। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন তুলসীমালা চাল শেরপুর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিদেশে রফতানি করা হয়।

যেভাবে বেড়েছে উৎপাদন

কৃষকরা বলছেন, প্রথমত অন্যান্য ধানের চেয়ে এর বাজার দর দ্বিগুণ। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এই চাল ব্যবহার হওয়ায় এবং ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা নিজ উদ্যোগে আবাদ শুরু করেছিলেন। এরপর একে-অন্যের কাছ থেকে বীজ কিনে উৎপাদন বাড়ান। মূলত দাম ও চাহিদা দেখে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হন। ধীরে ধীরে আবাদ বেড়ে যায়। তবে ফসলটি আমন মৌসুমেই হয়। ভিন্ন জাতের চিকন ধানের সঙ্গেও চাষ করা যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, সাধারণত প্রতি মৌসুমে কিছু বীজ কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে কৃষি বিভাগ। এরপর একটি তালিকা তৈরি করে তা প্রকৃত কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। দীর্ঘদিন এভাবে বিতরণের ফলে জেলার সব উপজেলায় তুলসীমালার চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।

বাজারজাত ও রফতানি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, প্রতি মৌসুমের শুরুতে যারা প্রকৃত কৃষক তাদের ডাটাবেজ তৈরি করা হয়। এর মধ্যে যারা তুলসীমালা আবাদ করেছেন, তাদের তালিকা ধরে ধান সংগ্রহ করা হয়। পরে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তি করে চাল উৎপাদন করা হয়। এরপর জেলার ব্র্যান্ডিং লোগো দিয়ে চাল প্যাকেজিং করে সারাদেশে বাজারজাত এবং বিদেশে রফতানি করা হয়।

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি

গত ২৫ জুন জেলার অন্যতম ঐতিহ্য হিসেবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে তুলসীমালা। একই সঙ্গে ‘পর্যটনের আনন্দে, তুলসীমালার সুগন্ধে’ স্লোগানে এটিকে জেলার অন্যতম ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের আবেদনক্রমে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই স্বীকৃতি আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছেন সদ্য বদলি হওয়া জেলা প্রশাসক সাহেলা আক্তার।

স্বীকৃতি দেওয়ায় তুলসীমালা চালের কদর আরও বেড়ে গেলো উল্লেখ করে সাহেলা আক্তার বলেন, ‌‘এই চাল বহু বছর ধরে সমাদৃত। দেশে-বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখন রফতানি আরও বাড়বে। এতে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জেলার কৃষি ও কৃষকদের সুনাম আরও ছড়িয়ে পড়বে।’

আরও বাড়বে চাষাবাদ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুকল্প দাস বলেন, ‘এই ধান উৎপাদনে কৃষকদের বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করছি আমরা। পাশাপাশি উৎপাদনকারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তুলসীমালা চালের মূল্য সংযোজন ও বাজার সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনি চাল বিপণনে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবেন। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় আবাদে আরও আগ্রহী হবেন কৃষকরা। ফলে আগামীতে এর আবাদ আরও বাড়বে।’

এই ধান ভাঙিয়ে চাল তৈরি করে বাজারজাতের জন্য জেলায় অর্ধশতাধিক চালকল রয়েছে বলে জানালেন জেলা চালকল মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম হোসেন। তিনি বলেন, ‘চালকল মালিকরা এই চাল তৈরি করে সারাদেশে এবং বিদেশে রফতানি করে থাকেন। তুলসীমালা অত্যন্ত উন্নত মানের চাল। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে সুগন্ধি চালের সবচেয়ে বড় আড়ত শেরপুরে। প্রতি বছর জেলায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার তুলসীমালা চাল বেচাকেনা হয়। উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন এবং কৃষকরাও স্বাবলম্বী হচ্ছেন। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। এজন্য এ বছর চালের দাম সবচেয়ে বেশি। প্রতি মণ চাল চার হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’

এবারও সাড়ে সাত হাজারের বেশি হেক্টর জমিতে আবাদ

চলতি মৌসুমে সাড়ে সাত হাজারের বেশি হেক্টর জমিতে তুলসীমালা ধান আবাদ করেছেন কৃষকরা। এর মধ্যে দুই একর জমিতে আবাদ করেছেন সদর উপজেলার কৃষক কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘গত ছয় বছর ধরে এই ধান আবাদ করি। এবারও ভালো ফলনের আশা করছি। বাজারে দাম বেশি পাওয়ায় লাভবান হচ্ছি। আগে আমার এলাকার কিছু মানুষ চাষ করতো না। এখন প্রায় সবাই চাষ করেন।’

শ্রীবরদী উপজেলার রূপারপাড়া গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম চার একর জমিতে তুলসীমালা আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘গত বছর দুই একর জমিতে আবাদ করেছিলাম। ফলন ভালো হয়েছিল। ধানের দাম ভালো পেয়েছিলাম। তাই এবার দ্বিগুণ জমিতে আবাদ করেছি। আশা করছি, এবারও লাভবান হবো।’

/এএম/
সম্পর্কিত
নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে রঙিন ফুলকপি
নোনাপানি ঠেকিয়ে স্বপ্নের ফসল চাষ
ওপরে ভিনদেশি ফল নিচে ফুলের বাগান, শখ থেকে স্বাবলম্বী
সর্বশেষ খবর
ভারত গেছেন পররাষ্ট্র সচিব
ভারত গেছেন পররাষ্ট্র সচিব
পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি
পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি
মৃত্যুর ৬ মাস পর কবর থেকে তোলা হলো আ.লীগ নেতার মরদেহ
মৃত্যুর ৬ মাস পর কবর থেকে তোলা হলো আ.লীগ নেতার মরদেহ
মস্কোতে হামাস-ফাত্তাহ বৈঠক, আলোচনায় ফিলিস্তিনি ঐক্য
মস্কোতে হামাস-ফাত্তাহ বৈঠক, আলোচনায় ফিলিস্তিনি ঐক্য
সর্বাধিক পঠিত
ডাল খেলে গ্যাস্ট্রিক হচ্ছে? জেনে নিন ৫ টিপস
ডাল খেলে গ্যাস্ট্রিক হচ্ছে? জেনে নিন ৫ টিপস
তবে কি হারিয়ে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিজড়িত ফার্মগেটের আনোয়ারা পার্ক?
তবে কি হারিয়ে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিজড়িত ফার্মগেটের আনোয়ারা পার্ক?
বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাবে জানালো বিসিবি
বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাবে জানালো বিসিবি
বিদ্যুতের বর্ধিত দাম কার্যকর হবে ফেব্রুয়ারি থেকেই
বিদ্যুতের বর্ধিত দাম কার্যকর হবে ফেব্রুয়ারি থেকেই
কেন চালু হচ্ছে না ফাইভ-জি?
কেন চালু হচ্ছে না ফাইভ-জি?