যে রোগের কারণে গরু দুধ কম দিচ্ছে, খামারিদের বড় ক্ষতি হচ্ছে

বাকৃবি প্রতিনিধি
২৪ জুলাই ২০২৬, ১৯:৩০আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৯:৩০

বাংলাদেশে গবাদিপশুর ব্রুসেলোসিস রোগ শুধু দুগ্ধ খামারের অর্থনীতিতেই বড় আঘাত হানছে না, বরং খামারিদের অজান্তেই কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষকের দীর্ঘ দুই বছরের গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত একটি গাভী সুস্থ গাভীর তুলনায় দৈনিক গড়ে ১.০১ লিটার এবং কোনও বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই সুপ্ত বা লুকিয়ে থাকা রোগে আক্রান্ত গাভী দৈনিক গড়ে ০.৫৩ লিটার কম দুধ দেয়। এর ফলে দেশের বড় ডেইরি খামারগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অ্যানিমেল ডিজিজ-এ প্রকাশিত এ গবেষণায় দেখা যায়, গাভী বাচ্চা প্রসবের পর ফুল না পড়া বা ‘রিটেইন্ড প্লাসেন্টা’ ব্রুসেলোসিসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।

গবেষণাটির সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন এর প্রধান গবেষক বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান।

অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আরও ছিলেন- একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান ও অধ্যাপক ড. এম আরিফুল ইসলাম। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মো. শফিউল আলম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন- নাজমুল ইসলাম, বিশ্ব জ্যোতি অধিকারী, শান্তা ইসলাম, আর এস মাহমুদ ও মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান।

এ ছাড়া রোগ শনাক্তের আধুনিক গাণিতিক পদ্ধতি নিয়ে এই দলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন গ্রিসের থেসালি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিশেষজ্ঞ লেফটেরিস মেলেটিস ও পলিক্রোনিস কস্তুলাস। সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) অর্থায়নে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এই গবেষণা মাঠপর্যায়ে সম্পন্ন হয়।

২০২৩-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৪-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চলের ১৭টি বড় বাণিজ্যিক ডেইরি খামার থেকে মোট ২,৬৯৬টি দুগ্ধবতী গাভীর তথ্য ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক ল্যাব পরীক্ষা এবং উন্নত গাণিতিক পদ্ধতি (বায়েসিয়ান মিক্সড-ইফেক্টস মাল্টিনোমিয়াল রিগ্রেশন) ব্যবহার করে গাভীগুলোকে সুস্থ, সুপ্ত সংক্রমণ এবং সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।

সাধারণত ব্রুসেলোসিস আক্রান্ত গরুকে কেবল ‘সুস্থ’ কিংবা ‘আক্রান্ত’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো সুপ্ত সংক্রমণকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক আনিস বলেন, ‘ব্রুসেলোসিস সবসময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অনেক গরুর শরীরে রোগটি লুকিয়ে বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও ওই গরুর দুধ উৎপাদন কমছে এবং পরে এই রোগ সক্রিয় হতে পারে।’

অন্যদিকে সক্রিয় রোগে আক্রান্ত গরুর ক্ষেত্রে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া এবং প্রজনন ব্যর্থতার মতো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়। জীবাণুটি গাভীর জরায়ু ও গর্ভফুলের ক্ষতি করার কারণে গাভী সময়মতো গরম হয় না এবং দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দুধ উৎপাদনে।

গবেষণার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় ডেইরি খামারগুলোতে ব্রুসেলোসিসের কারণে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লক্ষ টাকার ক্ষতি হতে পারে, যার সিংহভাগই আসে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে।

ড. আনিস বলেন, খামারিরা সাধারণত গাভীর গর্ভপাত হলেই ব্রুসেলোসিসের কথা ভাবেন। কিন্তু লক্ষণহীন সুপ্ত রোগের কারণেও প্রতিদিন গাভীপ্রতি প্রায় আধা লিটার দুধ কমছে। সক্রিয় রোগ হলে ক্ষতি এক লিটার বা তারও বেশি। ফলে খামারিরা বুঝতে না পেরেই প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই খামারে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া, গাভী গরম না হওয়া বা বারবার প্রজনন ব্যর্থতা দেখলে দেরি না করে ভেটেরিনারিয়ানদের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ব্রুসেলোসিস মানুষের জন্যও একটি বিপজ্জনক জুনোটিক রোগ। আক্রান্ত গরুর কাঁচা দুধ পান করা বা সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এই গবেষণায় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার খরচ ও লাভের হিসাবও করা হয়েছে। অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত গণটিকাদানই হলো সবচেয়ে লাভজনক ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে গড়ে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে, আক্রান্ত গরু শনাক্ত করে খামার থেকে বাদ দেওয়ার পদ্ধতিটি সরকারি ক্ষতিপূরণ না থাকলে সাধারণ খামারিদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল।’

বাংলাদেশে ব্রুসেলোসিস নিয়ন্ত্রণে উচ্চ ঝুঁকির গাভী দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত রোগ নজরদারি এবং প্রজননস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করার পাশাপাশি বড় খামারের মতো দেশের ছোট ছোট খামারগুলোতেও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

/এফআর/
সম্পর্কিত
প্রেমের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে আহত ১৩
‘শিক্ষিত তরুণরা খামার ব্যবস্থাপনায় এলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মজবুত হবে’
ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, মরে গেছে খামারের মুরগি, আমার সব শেষ
সর্বশেষ খবর
মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যত বিতর্ক
মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যত বিতর্ক
আর কতদিন বঙ্গভবনে থাকতে পারবেন মো. সাহাবুদ্দিন
আর কতদিন বঙ্গভবনে থাকতে পারবেন মো. সাহাবুদ্দিন
সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন
সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন
ঢাকার বড় পর্দায় একসঙ্গে চলছে আন্তর্জাতিক ৪ সিনেমা
ঢাকার বড় পর্দায় একসঙ্গে চলছে আন্তর্জাতিক ৪ সিনেমা
সর্বাধিক পঠিত
দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, দেখালেন নতুন পথ
দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, দেখালেন নতুন পথ
একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি, জামায়াতপন্থিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি, জামায়াতপন্থিদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধে রেলওয়ের ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধে রেলওয়ের ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি
আমাকে তিনবার বয়কট করা হয়েছে: রুনা লায়লা
আমাকে তিনবার বয়কট করা হয়েছে: রুনা লায়লা
অবশেষে আলোচিত সেই প্রকৌশলী দম্পতিকে দুই সিটিতে বদলি
অবশেষে আলোচিত সেই প্রকৌশলী দম্পতিকে দুই সিটিতে বদলি