সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায়, কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে—নাগরিকদের সেই অভিজ্ঞতা এক জায়গায় তুলে ধরতে চালু হয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। গত ২১ আগস্ট চালুর পর মাত্র নয় দিনে ওয়েবসাইটটিতে নাম-পরিচয় গোপন রেখে ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। রবিবার (৩০ আগস্ট) বিকাল পর্যন্ত এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ ৩৩০ কোটি টাকার বেশি। আরও কয়েক হাজার রিপোর্ট পেন্ডিং রয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
দুই বন্ধু সাইফ কবীর ও শাহেদ শরীফ আহমেদ যৌথভাবে এই ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। তাদের ভাষ্য, সরকারি বিভিন্ন দফতরে ঘুষ চাওয়ার বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় এনে নাগরিকদের জন্য একটি উন্মুক্ত রেকর্ড তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য। চালুর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়েবসাইটটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এখন এটি নিয়ে চলছে আলোচনা।
উদ্যোক্তাদের একজন শাহেদ শরীফ আহমেদ ব্রিটিশ কাউন্সিলে এ লেভেলে পড়াশোনা করছেন। অপর উদ্যোক্তা সাইফ কবীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী।
যে কারণে ‘ঘুষ.সাইট’
শাহেদ শরীফ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি দফতরে সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই এ উদ্যোগের কথা ভাবি আমরা। আমার মা আমিনা বেগম একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। অসুস্থ হয়ে ২০২২ সালে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে যাই। তখন আমাদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। আমার বাবা ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় সেই টাকা তুলতে পারিনি আমরা।’
এ ছাড়া নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও তাকে দুই হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল বলে জানান শাহেদ। এসব অভিজ্ঞতা তাকে ভাবিয়ে তোলে। পরে বন্ধু সাইফ কবীরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির উদ্যোগ নেন তারা।
শাহেদ বলেন, ‘দেশের প্রতিটি অফিসে কাজ করতে গেলে ঘুষ ছাড়া কিছুই হয় না—এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এই ঘুষ-দুর্নীতির চিত্রটি সামনে আনতেই আমরা উদ্যোগটি নিয়েছি।’
অনুপ্রেরণা বিদেশি ওয়েবসাইট থেকে
উদ্যোক্তারা জানান, একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট থেকে তারা মূল ধারণাটি পেয়েছেন। পরে সেই ধারণার ভিত্তিতে বাংলাদেশে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করা হয়।
এ ব্যাপারে সাইফ কবীর জানান, শাহেদ তাকে একটি ভিডিও পাঠানোর পর তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন। এরপর দ্রুত ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়। চালুর পরপরই এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক অভিযোগ জমা হতে থাকে।
সাইফ বলেন, ‘আমরা মূল অনুপ্রেরণা নিয়েছি ভারতের একটি ওয়েবসাইট থেকে। নয় দিনের মধ্যে আমরা ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ পেয়েছি। এসব রিপোর্টে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ ৩৩০ কোটি টাকার বেশি।’
যেভাবে কাজ করে ‘ঘুষ.সাইট’
ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দফতরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল—এ ধরনের তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ জানাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন হয় না।
তবে কোনও ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ রাখা হয়নি। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং কোন সরকারি দফতর বা সেবা ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরাই তাদের লক্ষ্য।
অভিযোগ জমা দেওয়ার পর তা সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা নীতিমালা লঙ্ঘন করে—এমন অভিযোগ বাদ দেওয়া হয়। এরপর অভিযোগ প্রকাশ করা হয়।
অভিযোগ মানেই প্রমাণ নয়
‘ঘুষ.সাইট’-এ জমা পড়া অভিযোগকে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাবি করছেন না উদ্যোক্তারা। তাদের ভাষ্য, ওয়েবসাইটটি কোনও তদন্ত সংস্থা নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্পও নয়।
সাইটে প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে ‘আনভেরিফায়েড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ৩৩০ কোটি টাকার ঘুষের অভিযোগের অর্থ এই নয় যে ওই পরিমাণ অর্থ বাস্তবে লেনদেন হয়েছে। এটি ব্যবহারকারীদের দেওয়া অভিযোগে চাওয়া অর্থের মোট পরিমাণ।
পেন্ডিং আরও অনেক অভিযোগ
উদ্যোক্তারা জানান, নয় দিনে ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। বিপুলসংখ্যক অভিযোগের কারণে আরও অনেক রিপোর্ট এখনও পেন্ডিং রয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই ও মডারেশনের পর প্রকাশ করা হবে। তাদের দাবি, অভিযোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ওয়েবসাইটটির পরিধিও বাড়ছে।
সরকারি সহযোগিতা চান উদ্যোক্তারা
উদ্যোক্তাদের মতে, শুধু অভিযোগের তথ্য সংরক্ষণ করাই তাদের শেষ লক্ষ্য নয়। সরকারি সহযোগিতা পেলে এসব তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করেন।
সাইফ কবীর বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পেলে আমরা এসব তথ্য নিয়ে লিগ্যাল অ্যাকশনের দিকে যেতে পারবো।’
শাহেদ শরীফ আহমেদও সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে উদ্যোগটি চালু রাখতে পারলে ঘুষ-দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রাখা সম্ভব। তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে। আমরা যদি সরকারের কাছ থেকে কোনও সাপোর্ট পাই তাহলে এটা দিয়ে আমরা একটা লিগ্যাল অ্যাকশন নিতে পারবো।’
নিজেদের অর্থেই পরিচালনা
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ‘ঘুষ.সাইট’ এখন পর্যন্ত নিজেদের অর্থেই পরিচালিত হচ্ছে। কোনও এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই এবং বাইরের কোনও অর্থায়নও নেওয়া হয়নি। সাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগ রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, তাদের লক্ষ্য শুধু একটি ওয়েবসাইট চালু করা নয়; বরং সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতাগুলো নথিভুক্ত করে একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার তৈরি করা। নাগরিকরা যাতে অন্যদের অভিজ্ঞতা দেখে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কী ধরনের ঘুষের অভিযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে ধারণা পেতে পারেন—সেটিই তাদের কাছে এই উদ্যোগের সাফল্য।









