৩ বছর ধরে কোমায় ভাই, অভাবের তাড়নায় বোনের আত্মহত্যা

Send
হিলি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৩:৫৪, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৪, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০

কোমায় থাকা রানা বাবুঅভাব অনটনের সংসারে সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে বিদেশে পাড়ি জমান দিনাজপুরের বিরামপুরের রানা বাবু (২৬)। সেখানে যাওয়ার দেড় মাসের মাথায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। এরপর থেকেই তিনি কোমায়। বর্তমানে নিজ বাড়িতেই চলছে তার চিকিৎসা। ছেলের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বাবা-মা। অভাবের তাড়নায় বছর খানেক আগে বোন আত্মহত্যা করেছেন। রানার উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন তার হতদরিদ্র বাবা-মা।

তিন বছর ধরে কোমায় থাকায় রানা কথা-বার্তা বা নড়াচড়া করতে পারেন না। নলের মাধ্যমে চলে তার খাবারসহ যাবতীয় কিছু।

বিরামপুর উপজেলার পারভবানীপুর গ্রামের ভটভটি চালক আলম হোসেনের একমাত্র ছেলে রানা।

আলম বলেন,  অভাব অনটনের সংসারে সচ্ছলতা আনতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে শেষ সম্বল জমি বন্ধক রেখে, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে ২০১৭ সালের ১৫ মে ছেলেকে ওমানে পাঠাই। যাওয়ার আগে বলা হয়েছিল ছেলে কারওয়াশের কাজ করবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ দেওয়া হয় তাকে। যাওয়ার কিছুদিনের মাথায় সে ফোনে বিষয়টি আমাকে জানায়। আর বলে ওই কাজ সে করতে পারবে না। সেই কথা চেয়ারম্যানকে বললে ছয় মাস পর কাজ পরিবর্তন করে দেওয়া হবে বলে জানান। যাওয়ার এক মাস ১৩ দিনের মাথায় ছেলের কোনও খোঁজ খবর পাচ্ছিলাম না। পরে লোক মারফত জানতে পারি সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্নকভাবে আহত হয়েছে সে। সেখানেই বিভিন্ন হাসপাতালে ১০ মাসের মতো চিকিৎসাধীন ছিল সে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে ও সরকারি সহায়তায় ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল রানাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। দেশে আসার পর প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সেখানে রেখে ছেলের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় ওই বছরের ১৪মে ঢাকা থেকে বাড়িতে আনা হয়। এখন বাড়িতেই চলছে তার চিকিৎসা। সে বিদেশে দুর্ঘটনায় আহত হলেও সেসময় কোম্পানির পক্ষ থেকে ৩২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ও ইন্সুরেন্সের টাকা দেওয়ার কথা বললেও আজ পর্যন্ত কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি। বর্তমানে মানুষের কাছ থেকে ধার-দেনা, যাকাত-ফিতরার টাকা দিয়ে ছেলের চিকিৎসা করে যাচ্ছি। নিজেরা না খেয়ে তাকে খাওয়াচ্ছি। আশায় আছি আবারও আমাদের ছেলে সুস্থ হয়ে বাবা বলে ডাকবে। কিন্তু চাহিদা মতো ওষুধপত্র বা চিকিৎসা করাতে পারি না।

ছেলের সেবা করছেন মা-বাবা

রানার মা মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার দু’টি সন্তান। এক ছেলে এক মেয়ে। গত বছর মেয়েটি আমার মারা গেছে। ছেলেটি বেঁচে থেকেও মৃত। ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্ট করে কোনোরকমে চলি। আমাদের তো আর কেউ নেই। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে চাইতে এখন আর তেমন কেউ আমাদের খোঁজ-খবর নেয় না। এমনকি আমার বাবা-মাও আর আসেন না। ডাক্তার বলেছেন, তাকে ভারতে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হবে। কিন্তু আমাদের পক্ষে এত টাকা দিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব না। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সমাজের বিত্তবানরা যদি আমাদের দিক একটু মুখ তুলে তাকাতো তাহলে আমাদের জন্য খুব ভালো হতো।’

স্থানীয় নুরে আলম জানান, যে কাজ দেওয়ার কথা বলে রানাকে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল সেখানে যাওয়ার পর তাকে অন্য কাজ দেওয়া হয়। এরপর দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিন বছর ধরে কোমায় পড়ে রয়েছে সে। চিকিৎসা করতে গিয়ে পরিবার পুরোপুরি নিঃস্ব। আমরা চাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ তার চিকিৎসার জন্য সেই কোম্পানির নিকট থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা.আরিফুজ্জামান মিলন বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসা পেলে রানার কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে পুরোপুরি সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম। তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় সেল ড্যামেজ হয়ে গেছে। এটাকে আমরা ভেজেটেবজ স্টেজ বলি। এটার পরিণতি খুব একটা বেশি ভালো নয়। ছেলেটা বেঁচে থাকবে কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ থাকবে না। পরিবারের ইচ্ছে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার। উন্নত চিকিৎসা পেলে কিছুটা ঠিক হবে তবে আশানুরূপ হবে বলে মনে হয় না।’

 

 

/এসটি/

লাইভ

টপ