মিথ্যা তথ্যে আ.লীগের মনোনয়ন পাওয়ার অভিযোগ, তৃণমূলে ক্ষোভ

Send
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত : ১৭:২৭, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৯, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০

 

গোলাম হায়দার, বেলাল, নুরুল হক ও শৈবাল দাস (বাম পাশ থেকে)

আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু। মনোনয়ন বোর্ড ঘোষিত কাউন্সিলর প্রার্থী তালিকায় তার দলীয় পরিচয় লেখা হয়েছে চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। তবে তিনি ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা নন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা। ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাফর আহমদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গোলাম হায়দার মিন্টু কখনও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। এমনকি দলের সাধারণ সদস্যও ছিলেন না। অথচ তিনি মনোনয়ন ফরমে নিজেকে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। আমরা তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করে সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
জাফর আহমদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘চকবাজার ওয়ার্ডে কখনও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়নি। তাহলে তিনি কীভাবে উপদেষ্টা হয়েছেন? যে ব্যক্তি কখনও জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেনেনি, তিনি প্রার্থী হিসেবে দলীয় সমর্থন পেয়েছেন। অথচ ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, আমি অনেক আগে থেকে উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে আসছি। তাহলে এতদিন কীভাবে পরিচয় দিয়ে আসলাম? দ্বিতীয়ত, আমি যেহেতু মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আসছি, তাহলে আমি এখন যা বলবো সেটিও তো মিথ্যা বলতে পারি।’  তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনও কার্যকরী কমিটিতে ছিলাম না, ঠিক আছে। কিন্তু আমার সদস্য পদ আছে। আমি নিজ থেকেই কোনও পদ-পদবি নিইনি।  প্রয়াত নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও হান্নান ভাই আমাকে বারবার বলেছিলেন পদ নেওয়ার জন্য। আমি সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি। আমি তো কাউন্সিলর হিসেবে আছি। তাহলে দলের পদ-পদবি দরকার কী? যদি দলের পদ চাই, তাহলে তো মানুষ বলবে আমি ক্ষমতালোভী। তাই আমি কখনও পদ নেইনি।’
শুধু সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু নন। তার মতো আরও কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থী মিথ্যা তথ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় নেতাকর্মীদের। দলীয় কোনও পদ-পদবিতে না থেকেও নগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিচয় ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হাজী নুরুল হক। নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কোনও পদে না থেকেও সদস্য পরিচয় দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল হাসনাত বেলাল। একইভাবে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য পরিচয় দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী শৈবাল দাশ সুমন। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এসব কাউন্সিলর প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছে ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

লালখান ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিদ্দিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন শুরুর আগে ওয়ার্ড ও থানা আওয়ামী লীগ সভা করে লালখান বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের নাম সুপারিশ করেছিলাম। মাসুম দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছেন। আমাদের প্রত্যাশা ছিল তার মতো একজনকে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড সিলেক্ট করবে। কিন্তু দলীয় মনোনয়নের তালিকায় দেখলাম ভিন্ন চিত্র। সেখানে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আবুল হাসনাত বেলালকে। তিনি ওয়ার্ডের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের কোনও পদ-পদবিতে না থেকেও তিনি সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়টি আমরা আমাদের নেতাদের জানিয়েছি, আমরা আশা করছি দলীয় মনোনয়ন বোর্ড এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’
নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২১ সদস্য বিশিষ্ট বর্তমান নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে আবুল হাসনাত বেলালের কোনও পদ নেই। এই কমিটিতে ১৭ সদস্য আছেন, কমিটি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ওই ১৭ জনই সদস্য আছেন। এর বাইরে কাউকে সদস্য করা হয়নি।’  জিয়া উদ্দিন আরও বলেন, ‘আবুল হাসনাত নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে পদ-পদবি না পেলেও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের একজন কর্মীও বলতে পারেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সব কর্মসূচিতে অংশ নেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হাসনাত বেলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি হঠাৎ করেই স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতি করছি না। আমি ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। লালখান বাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগ, নগর ছাত্রলীগের গ্রন্থনা সম্পাদক ছিলাম, সিটি কলেজের নির্বাচিত এজিএস ছিলাম। বিয়ে করার পর আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে অব্যাহতি নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগে যোগদান করি। তখন থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ করে আসছি। এতদিন এটি নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠেনি। অথচ যেই মনোনয়ন পেয়েছি, তখনই ষড়যন্ত্রকারীরা আমার বিরুদ্ধে এই বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার করছে।’
হাজী নুরুল হকের বিষয়ে নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাজী নুরুল হক নামে মহানগর আওয়ামী লীগের কোনও উপদেষ্টা নেই। কেউ যদি উপদেষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি মিথ্যা পরিচয় দিয়েছেন।’ এ সম্পর্কে জানতে হাজী নুরুল হকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তার বড় ছেলে কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৩ সালের আওয়ামী লীগের কমিটি দেওয়া হয়। ওই কমিটিতে ৭ জনকে উপদেষ্টা করা হয়। সেখানে নুরুল হক নামে একজন ছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার বাবাকে বলেছিলেন উপদেষ্টা পদে নুরুল হক তোমার নাম। কিন্তু এখন শুনছি এটি হালিশহর এলাকার আলহাজ নুরুল হক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার তো নেত্রী পদ দেখে মনোনয়ন দেননি। তিনি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এলাকায় কার জনপ্রিয়তা কতটুকু এসব বিষয় মাথায় রেখে মনোনয়ন দিয়েছেন। তাহলে এ বিষয়টি নিয়ে কেন এত বিতর্ক।’
শৈবাল দাশ সুমনের বিষয়ে জানতে চাইলে জামালখান ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শৈবাল দাশ সুমন জামালখান ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটির কোনও পদে নেই। দলীয় মনোনয়ন পেতেই তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য পরিচয় দিয়েছেন। আমরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এ বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় সংগঠনকে অবহিত করেছি। আমরা আশা করছি কেন্দ্রীয় নেতারা তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে শৈবাল দাশ সুমনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি বারবার কল কেটে দিয়েছেন।

/এমআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ