‌খুলনায় কিছুতেই কমছে না জনসমাগম

Send
হেদায়েত হোসেন, খুলনা
প্রকাশিত : ১৮:২৪, এপ্রিল ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৪, এপ্রিল ১০, ২০২০

খুলনা শহরের রাস্তায় মানুষের সমাগম'ভাই এত জ্ঞান দিয়েন না তো। আপনি বাইরে কেন? আমার হয় হোক, আপনার যেন না হয়। আমার চিন্তা বাদ দিয়ে একটু নিজের চিন্তা করেন। আর নিজেকে বাঁচান। আমার আল্লাহ আছে। মারলে তিনিই মারবেন, বাঁচালে তিনিই বাঁচাবেন। পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘরে থাকলে চলে না।' করোনাভাইরাস রোধে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার বিষয়ে প্রশ্ন তুললে খুলনা মহানগরীর রূপসা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বাসিন্দারা এভাবেই উত্তর দিচ্ছেন। করোনা ঝুঁকির বিষয়টি এসব মানুষকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না।

করোনার প্রকোপ সামাল দিতে অবুঝ জনতার জন্য হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। জরিমানা করেও এ চাপ সামাল দিতে পারছেন না তারা। সরকার ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে সাধারণ ছুটি বাড়িয়েই যাচ্ছে। দফায় দফায় বাড়িয়ে তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু খুলনার অবুঝ লোকজনের কারণে সামাজিক দূরত্ব তত্ত্ব বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ জন্য পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি কাজ করছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। এরপরও মানুষ বেরিয়ে আসছে রাস্তায়। আড্ডা দিচ্ছে, চায়ের দোকানগুলো অর্ধেক ঝাপ খোলা রাখছে। নানা বাহানায় মুদির দোকানে কিংবা বাজার, পাড়ার মোড়ে আড্ডায় মাতছে তারা।

গত ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ পেয়ে খুলনায় কর্মরত অনেক মানুষ গ্রামে ছুটে যান। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বেড়ে গেছে জনসমাগম।

খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় এখন বেকার শ্রমিকের চেয়ে উৎসুক জনতার সমাগম বেশি। উৎসুকরা বের হচ্ছেন, পণ্য কেনার বাহানা নিয়ে।

জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে এবং সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে নগরীর নিউমার্কেট, বয়রা বাজার, সোনাডাঙ্গা, পিটিআই মোড়, রয়েল মোড়, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, ডাকবাংলো মোড়, খালিশপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে নগরীর নতুন বাজার, নতুন বাজার চরবস্তি, রূপসা ওয়াপদা, লঞ্চঘাট, কাস্টমঘাট, রূপসা ট্রাফিক মোড়, রূপসা ফেরিঘাট, কাঠগোলা, লবণচরা বান্দাবাজার, রূপসা ব্রিজের নিচ, লবণচরা আমতলা, টুটপাড়া মহিরবাড়ি বড় খালপাড়, খ্রিস্টানপাড়া বালুর মাঠ, পশ্চিম টুটপাড়া, মাওলার বাড়ি মোড়, ডি আলী স্কুল মোড়, করের বাজার, জেলখানা ঘাট, কাছারীবাড়ি ঘাট, ৫ নম্বর বিআইটিএ ঘাট, রকেট ঘাট, পুরাতন রেলস্টেশন এলাকায় ক্রমেই ভিড় বাড়ছে। এসব এলাকায় চলছে আড্ডা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং দলাদলি। সন্ধ্যা ৭টার পর দোকানপাট বন্ধ করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

রূপসা ফেরিঘাট থেকে কাস্টমঘাট এলাকায় ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদকচক্র। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শরে বরাতের রাতে যেমন ভিক্ষুকদের সমাগম বাড়ে, কে কোথায় বসে ভিক্ষা করবে, সেই পরিস্থিতি হয়; এ এলাকায় একইভাবে কে কত ত্রাণ পেলো, কোথায় পেলো, আগামীকাল কোথায় যাবে সেই আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। সকালটা যেনতেনভাবে কেটে গেলেও বিকাল হলেই এসব এলাকায় নতুন প্রাণ ফিরে পায়। এভাবে চলতে থাকলে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খুলনা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতা ফোরামের নেতারা।

জানা গেছে, শহরের দিকে পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনী থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকায় তারা যাওয়ার সময় পাচ্ছেন না। বিকাল হলে সবাই রাস্তা, মোড় এবং খোলা মাঠে আড্ডাবাজি করছে। একজন কিছু বলতে গেলে ১০ জন তাকে জবাব দিচ্ছে।

অনেক ঘরে বাজিতে তাস, দাবা, লুডু খেলার প্রতিযোগিতা চলছে। সে খেলা দেখতেও জনসমাগম থাকছে। কেউই সামাজিক দূরত্ব মানছে না।

রূপসার ওয়াপদা রোডের মো. জামান জানান, কাউকে ঘরে থাকতে বললে উত্তর দেয়, আমার হয় হোক। আপনার যেন না হয়। সেদিকে দেখেন। পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘরে থাকলে চলে না। ফলে কিছু বলার থাকে না।'

বয়স্ক শ্রমিক জসীম উদ্দীন বলেন, 'কত আর বাসায় থাকা যায়। তাই একটু বের হলাম।'

খুলনা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতা ফোরামের সভাপতি এবং মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, 'এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। অনেকেই সরকারের প্রথম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হোম কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। কিন্তু কিছু মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যেতে পারে। প্রশাসন কঠোর না হলে কোনোভাবেই করোনার ভয়াবহতা থেকে আমরা রক্ষা পাবো না।'

খুলনার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মিজানুর রহমান বলেন, 'সবাইকে নিজ দায়িত্বে সতর্ক হতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে প্রশাসন কঠোর হতে বাধ্য হবে।'

খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাব রোধে সামাজিক দূরত্ব না মানায় খুলনায় গত দুদিনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৬৭ ব্যক্তিকে ৫৩ হাজার ৯শ' টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত ৮ ও ৯ এপ্রিল এ অভিযান চলে।'

খুলনা সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ জানান, সবাইকে সামাজিক দূরত্ব মানতে হবে। সরকারের নির্দেশ না মানলে করোনা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
উল্লেখ্য, সরকারের আইইডিসিআর-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪২৪ জন। এদের মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

/আইএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ