করোনায় মানবেতর জীবনযাপন হিজড়া সদস্যদের

Send
হেদায়েত হোসেন, খুলনা
প্রকাশিত : ২২:৩১, এপ্রিল ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩১, এপ্রিল ৩০, ২০২০

ত্রাণ দেওয়া হয়েছে কয়েকজন হিজড়া সদস্যকেকরোনাভাইরাস সংক্রমণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খুলনায় হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত ৩৪ দিনে তারা সরকারি-বেসরকারিভাবে সামান্য ত্রাণ পেয়েছেন। নিজেদের পেশার কাজে বাইরে বের হতে না পারায় তাদের রোজগার বন্ধ। এই অবস্থায় তারা প্রত্যাশিত খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম সংকটে রয়েছেন খুলনার হিজড়ারা।

খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নক্ষত্র মানবকল্যাণ সোসাইটির সভাপতি পাখি দত্ত হিজড়া বলেন, 'করোনাভাইরাসের প্রভাবের পর আমাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও আয় রোজগার নেই। মানবেতর জীবনযাপন করছি আমরা। খুলনায় ২২০ জন হিজড়া আছেন। সমাজসেবা থেকে ৭০ জন হিজড়া একবার ত্রাণ পেয়েছেন। এছাড়া বন্ধু সংগঠন থেকে কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। আমার সংগঠন থেকেও কিছু ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই সমান্য ত্রাণ দিয়ে হিজড়াদের সংকট দূর করা কঠিন হচ্ছে।'

নক্ষত্র মানবকল্যাণ সোসাইটির সঙ্গে মিলে কাজ করেন সাদিয়া। তিনি খালিশপুর হাউজিং এস্টেট নিউ কলোনি এনএইচ-৬/২ নং বাসার ভাড়াটিয়া। মা ও বোনের কাছেই থাকেন তিনি। তার রোজগারেই চলতো পুরো পরিবার। মা খালিশপুর জুট মিলে কাজ করেন। সাদিয়ার পেশাও এখন বন্ধ। প্রতিমাসে ১০-১২ হাজার টাকা আয় ছিল তার। ওই টাকা দিয়েই কলেজ পড়ুয়া বোনের লেখাপড়ার খরচসহ সংসার খরচ চালাতেন।

খুলনার কয়েকজন হিজড়া সদস্যসাদিয়া বলেন, 'সরকারের পক্ষ থেকে কিছু হিজড়াকে সাহায্য করা হয়েছে। প্রথম দফার সাহায্য আমি পাইনি। তবে পরের কিস্তিতে আমাকে সাহায্য দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। আমাদের টিম লিডার হিসেবে রয়েছেন পাখি দত্ত।'

সাদিয়ার মা রীনা বেগম জানান, করোনা প্রভাবের পর থেকে এ পর্যন্ত তার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তিনি বলেন, 'হিজড়ারা না পারে কাউকে কষ্টের কথা বলতে, না পারে সাহায্য চাইতে। তাই তারা না খেয়ে ঘরে ধুকে ধুকে জীবন কাটাচ্ছেন।'

খালিশপুরে হিজড়াদের গুরুমা শিমলা হিজড়া বলেন, 'আমার অধিনে ১৪ জন হিজড়া আছেন। সবাইকে আমি দেখভাল করি। কিন্তু করোনার প্রভাবে তাদের আয় রোজগার বন্ধ। তারা আর্থিক সংকটে ভুগছেন। মানবেতর জীবনযাপন করছেন।'

সমাজসেবা অধিদফতর খুলনার উপপরিচালক খান মোতাহার হোসেন বলেন, '১ এপ্রিল খুলনার ১৫০ জন মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ৮০ জন হিজড়া সদস্য ছিলেন। বাকিরা দলিত সম্প্রদায়ের সদস্য। এরপর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মিলে আরেক দফায় আরও ৮৫ জনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে হিজড়াদের জন্য সহায়তা দেওয়া হবে।'

কয়েকজন হিজড়াকে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছেখুলনার হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে বন্ধু সংগঠনের সাফায়াত রহমান তন্ময় বলেন, 'তারা বন্ধু সংগঠন থেকে খুলনার ১২০ জনের মতো হিজড়াকে ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। তাদের দেওয়া প্রতিটি প্যাকেটে চাল, ডাল, তেলসহ ৮শ' টাকার পণ্যসামগ্রী ছিল। বন্ধু সংগঠন সারা দেশে হিজড়াদের মাঝে ২৪ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে।'

খুলনার হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা ছিন্নমূল মানবকল্যাণ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন বলেন, 'এখন পর্যন্ত অসহায় হিজড়াদের সহযোগিতায় পাশে দাঁড়াতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যহত রয়েছে।'

তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে জাতীয়ভাবে কাজ করা সংগঠন ‘বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র ডেপুটি ম্যানেজার (পাবলিক অ্যাডভোকেসি) মো. মশিউর রহমান জানান, কোভিড-১৯ এর আগ্রাসী ভূমিকার ফলে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যরা বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ জনগোষ্ঠীর মূল আয় নাচ গান করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ চেয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এবং এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসা সংস্কৃতি। কিন্তু বর্তমানে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা কোনোভাবেই কোনও কিছুতে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। তিনি বন্ধুর সহযোদ্ধাদের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হিজড়া সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

/আইএ/

লাইভ

টপ