ঈদের দিন মাদারীপুরে প্রীতিভোজ অনুষ্ঠিত হয় জেলা পুলিশের সব ইউনিটে

Send
মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২২:০৫, মে ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৬, মে ২৭, ২০২০

ঈদের দিন মাদারীপুর সদর থানায় প্যান্ডেলে খাটিয়ে প্রীতিভোজ আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান। সঙ্গে ছিলেন সাবেক ও বর্তমান জন প্রতিনিধিসহ কয়েকজন বিশিষ্টজন। পেছনের তিনজন পুলিশের কর্মকর্তা।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে সারা দেশের মতো মাদারীপুরেও সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন না করার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা ছিল জেলা প্রশাসনের। তবে পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞা মানেনি জেলার পুলিশ বিভাগ। মাদারীপুর সদর থানায় প্যান্ডেল টানিয়ে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। তাতে অংশ নেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান। এছাড়াও একই ধরনের আয়োজন করা হয় জেলা পুলিশের সব ইউনিটে। সেখানেও অংশ নেন অতিরিক্ত ও সহকারী পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি প্রকাশ করার পর সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে জেলার পুলিশ বিভাগের ওপর দিয়ে।

জেলা পুলিশের এই আয়োজনের ছবি পোস্ট করা হয়েছে খোদ জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সার্কেল কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের ফেসবুক পেজে। আর এতে জেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়োজনের দায়ভারও স্বীকার করেছেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান।

মাদারীপুর সদর থানায় প্যান্ডেল খাটিয়ে বিশাল আয়োজন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাস রোধে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় ঈদের দিন কোনও সামাজিক আয়োজন না করার সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে সে নির্দেশনা নিজেরাই না মেনে ঈদের দিন প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয় মাদারীপুর জেলা পুলিশের অন্তর্গত বিভিন্ন ইউনিটে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর পুলিশ লাইন্স, সদর থানায়, কালকিনি, শিবচর, রাজৈর ও ডাসার থানাসহ জেলা পুলিশের আওতাধীন সব পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও পুলিশ ইউনিটে এমন প্রীতিভোজ  অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা পুলিশের ফেসবুকে পেজে মাদারীপুর সদর মডেল থানায় প্রীতিভোজ আয়োজনের ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, ‘সচেতন হোন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদ থাকুন, নিরাপদ রাখুন।’

সদর থানায় জেলা পুলিশের এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল হান্নান, সদর থানার ওসি কামরুল ইসলাম মিঞাসহ সব পুলিশ সদস্য। তবে এখানে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন মাদারীপুরের পৌর মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদ, মাদারীপুর জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাফিজুর রহমান যাচ্চু খান, মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান খান, মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম বাবু চৌধুরীসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।

মাদারীপুর মডেল সদর থানায় ঈদের দিনে পুলিশ সদস্যদের প্রীতিভোজ

এদিকে কালকিনির ডাসার থানা ভবনের মধ্যে এই আয়োজনে মাদারীপুর থেকে অংশগ্রহণ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) বদরুল আলম মোল্লা, যিনি মাদারীপুর সদর মডেল থানা ও কালকিনি উপজেলার ডাসার ও কালকিনি থানার তদারক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।

মাদারীপুর সদর থানার ১নং পুলিশ ফাঁড়ি, ২নং পুলিশ ফাঁড়ি, চরমুগরিয়া পুলিশ ফাঁড়ি, আঙ্গুলকাটা তদন্ত পুলিশ কেন্দ্র ও শ্রীনদী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের অংশগ্রহণ ও তদারকি করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মনিরুজ্জামান ফকির। রাজৈরে থানা ভবনের মধ্যে প্রীতিভোজের আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন সহকারী পুলিশ সুপার (শিবচর সার্কেল) আবির হাসান। তিনি রাজৈর ও শিবচর থানা এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় পুলিশ লাইন্সের ক্যান্টিনে। এখানে মাদারীপুরের গোয়েন্দা পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সসহ পুলিশ লাইন্সের সব সদস্য অংশগ্রহণ করেন।

মাদারীপুর পুলিশ লাইন্সে করা হয় প্রীতিভোজের সবচেয়ে বড় আয়োজন। এখানে অংশ নেন গোয়েন্দা পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সসহ পুলিশ লাইন্সের সকল সদস্য।

তবে করোনার কারণে সারা দেশে কোনও ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মাদারীপুর পুলিশের এই আয়োজন এবং সদর থানায় বিশাল আকৃতির প্যান্ডেল বানিয়ে উৎসব নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে চারদিকে। আবার এই আয়োজন পুলিশ সদস্যদের জন্য হলেও সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের যেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়েছে তাতে সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি বলেও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও বেশ কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তি কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই দাওয়াতে অংশ নিলেন তা নিয়েও অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

মাদারীপুর পুলিশ লাইন্সে কর হয় সবচেয়ে বড় আয়োজন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে এমনটিই নির্দেশনা রয়েছে। তবে পুলিশ লাইন, পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও ফাঁড়িতে সার্বক্ষণিক যেসব পুলিশ সদস্য থাকেন এবং দায়িত্ব পালন করেন তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব মেনে পুলিশি দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। জেলার সদর মডেল থানার মধ্যে খেতে বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় একটি প্যান্ডেল করা হয়েছে। যেখানে পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন। অন্য সব জায়গায় যেমন রাজৈর, কালকিনি, ডাসার, শিবচর থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে কোনও প্যান্ডেল করা হয়নি। সেসব জায়গায় একটি কক্ষের মধ্যেই খাওয়ার আয়োজন ছিল। পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন তদন্ত কেন্দ্র ও ফাঁড়িতে স্বাভাবিক সময়ে যেসব কক্ষে সবাই মিলে খায় সেখানেই ঈদের দিন সবাই খাবার খেয়েছেন। ঈদের দিন হওয়ায় খাবারের মেন্যু একটু আলাদা ছিল এই আর কী। সদর থানায় প্রীতিভোজ অনুষ্ঠান এই কথাটি না লিখলে আর প্যান্ডেল না টানালে আর কোনও ঝামেলা থাকতো না। আসলে এসপি মহোদয় এসেছিলেন বলে সেখানে সবার একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

রাজৈর থানায় প্রীতিভোজের আয়োজন

ওই পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, সদর মডেল থানার আয়োজনে পুলিশ সদস্যদের বাইরে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি কেন অংশ নিলেন, তাদের সঙ্গে কেন দু’একজন নেতাকর্মী বা সহযোগীরা এসেছেন, বসেছেন, এতেই এই আলোচনা-সমালোচনা। এসব নিয়ে আমরা কোনও কথা বলতে চাই না। তাই বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন সবাই নীরব অবস্থানে রয়েছেন।

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম মিঞা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদের দিন নিজেদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য সব সদস্যকে নিয়ে প্রীতিভোজের আয়োজন করি। তবে জেলা শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি থানায় আমাদের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন। খাওয়ার আয়োজনে তাদেরও আমরা অংশগ্রহণ করতে বললে তারা অংশগ্রহণ করেছেন।’

দাশের থানায় প্রীতিভোজের আয়োজন

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এর দায়ভার জেলা পুলিশ সুপারের অর্থাৎ আমার।’ পুলিশের প্রীতিভোজ আয়োজনে বাইরের ও বিতর্কিত লোকজন অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আমরা সবার কাছে গুরুত্ব ও ভাবগাম্ভীর্য হারিয়েছি। শীঘ্রই তা ফিরিয়ে আনতে হবে।’

উল্লেখ্য, দেশের প্রথম করোনা আক্রান্ত ও প্রথম লকডাউন হওয়া জেলা মাদারীপুর। এ জেলায় শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন কঠোর পরিশ্রম ও দায়িত্ব পালন করে স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছে।

 

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ